পৌষ সংক্রান্তি আর মৌলভীবাজারের শেরপুরের মাছের মেলা যেন একই সুতোয় গাঁথা। পৌষ সংক্রান্তি এলেই কুশিয়ারা নদীর পাড়ে যেন উৎসবের আমেজ ফুটে উঠে।
প্রতি বছরের মতো এ বছরও গত ১২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই মাছের মেলা। তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এই মেলা শেষ হবে আজ বুধবার।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১৫০ বছর আগে থেকে কুশিয়ারা নদী পাড়ের মনুমুখে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে মাছের মেলার আয়োজন শুরু হয়। নদী ভাঙনে মনুমুখের একাংশ বিলীন হয়ে গেলে সেই মেলা স্থানান্তরিত হয় শেরপুর মৌজায়।
বর্তমানে শেরপুর বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ধান খেতে মেলার আয়োজন করা হয়।
সম্প্রতি মেলায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল আকারের সব মাছ নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে মেলায় এসেছেন বিক্রেতারা। বিক্রেতাদের হাঁক ডাক ও ক্রেতা-বিক্রেতার দরদামে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের পাশেই এই শেরপুর বাজার। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার মাঝামাঝিতে অবস্থান হওয়ায় চার জেলার মানুষের কাছে এ মেলা ভীষণ জনপ্রিয়।
মেলায় আসা বড় আকারের মাছের প্রতিই ক্রেতাদের বাড়তি আগ্রহ থাকে।
কুশিয়ারা নদী থেকে ধরা বিশাল আকৃতির দুটি বাঘাইড় মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন মৌলভীবাজারের সরকার বাজার সরাপপুর গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী জুবেল আহমদ। একটির ওজন ৮০ কেজি, অন্যটির ৫৬ কেজি।
দ্য ডেইলি স্টারকে জুবেল বলেন, ‘বড় বাঘাইড়টির দাম চাচ্ছি আড়াই লাখ টাকা, অন্যটির দাম দেড় লাখ টাকা। তবে এখন পর্যন্ত বড় মাছটির সর্বোচ্চ দর উঠেছে ৭০ হাজার টাকা, ছোটটির দাম উঠেছে ৫০ হাজার টাকা। ন্যায্য দাম পেলে বিক্রি করে দিবো।’
তিন প্রজন্ম ধরে মেলায় মাছ বিক্রি করছেন আরবেশ মিয়া। ৫৫ বছর বয়সী এই মাছ বিক্রেতা বলেন, ‘দাদুর সঙ্গে এসে মেলায় মাছ বিক্রি করেছি। বাবার সঙ্গেও মাছ বিক্রি করেছি। এখন নিজে বিক্রি করছি। এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।’
আরবেশ মিয়া জানান, এবার তিনি ১০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন। এরই মধ্যে ৩ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। দুই মণ ওজনের একটি বাঘাইড় মাছ তিনি মেলায় এনেছিলেন। মাছটির দাম তিনি চাইছেন ৩ লাখ টাকা।
বিক্রি না হলেও মাছটিকে ঘিরে ক্রেতাদের ভীষণ আগ্রহ দেখা যায়। আরবেশ বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষই ছবি তুলছে। অবশ্য অনেকে দামও বলছে। ভালো দাম পেলে বিক্রি করবো।’
আরেক মাছ বিক্রেতা মুহিবুর রহমান বলেন, ‘মানুষ কিনছে কম। সেলফি তুলছে বেশি।’
মেলায় মাছ বিক্রি করতে আসা তিন ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী দোলন আহমদ বলেন, ‘চলতি বছর মেলায় বিক্রির জন্য প্রায় ৫৫ লাখ টাকার মাছ কিনেছি। এর মধ্যে প্রায় ২১ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে। বাকি মাছ বুধবারের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যাবে।’
তিনি জানান, বিক্রির জন্য নিয়ে আসা মাছ তিনি সুরমা ও কুশিয়ারা নদী, হাকালুকি হাওর এবং মেঘনা নদী থেকে সংগ্রহ করেছেন।
২ হাজার টাকায় মেলা থেকে ৮ কেজি ওজনের একটি বিগহেড মাছ কিনেছিলেন মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, ‘বিক্রেতা ৮ হাজার টাকা দাম চেয়েছিল। দর কষাকষি করে ২ হাজার টাকায় কিনেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিক্রেতারা মাছের অস্বাভাবিক দাম হাঁকছেন। একটি বাঘাইড় মাছের দাম ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলেছিলাম। কিন্তু বিক্রেতা ৯০ হাজার টাকার কমে বিক্রি করবেন না।’
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা থেকে মেলায় ৫৫ কেজি ওজনের একটি বোয়াল নিয়ে এসেছেন ইমরান হোসেন। মাছটির দাম তিনি হাঁকছিলেন আড়াই লাখ টাকা।
তার কয়েক দোকান দূরেই ৩৫ কেজি ওজনের একটি বোয়াল নিয়ে এসেছেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলা গ্রামের মাছ বিক্রেতা দুলন মিয়া। বোয়ালটির দাম তিনি চাইছেন ৮৫ হাজার টাকা।
গতকাল মঙ্গলবার মাছ ব্যবসায়ী বাহাউদ্দীন বলেন, ‘চিতল, রুই, কাতলা, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে মেলায় এসেছি। এখন পর্যন্ত বেচাকেনা আশানুরূপ হয়নি।’
তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার মেলায় ব্যবসা বেশ ভালো হচ্ছে বলে জানান মেলা উদযাপন কমিটির কোষাধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর খান।
তিনি বলেন, ‘এবার ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি ভালো। আমাদের আশাবাদ, এবারের মেলায় অন্তত ১২ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হবে।’
মাছের মেলা হলেও একে কেন্দ্র করে বসেছে নানা ধরণের অস্থায়ী দোকান—যেখানে বিক্রি হচ্ছে রকমারি খাবার থেকে গৃহস্থালির নিত্য প্রয়োজনীয় নানান পণ্য, শিশুদের খেলনা, কাঠ, বাঁশ ও বেতের সামগ্রী।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত মেলার প্রথম দিন দুপুরে মাছ বিক্রি শুরু হয়। প্রথমদিন কেবল পাইকারি মাছ বিক্রি চলে। পাইকারি মাছ বিক্রির জন্য এবার শেরপুর বাজারে অন্তত ২০টির মতো অস্থায়ী মোকাম খুলেছিলেন পাইকারেরা।
সেখানেই গতকাল কথা হয় হামরকোনা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী নছির আলীর সঙ্গে। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘মেলায় প্রথম দিনে ২০টি মাছের অস্থায়ী আড়তে অন্তত ৪-৫ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেই সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত ১৮ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছি। বুধবার সকাল পর্যন্ত ৫০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি।’
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমদ বলেন, ‘এ বছর ৭ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যে মেলার ইজারা বিক্রি করা হয়। মেলার পরিবেশ ঠিক রাখতে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে।’

