সাগরে নাবিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যেসব রহস্যের আজও ব্যাখ্যা মেলেনি

সাগরের গভীরে যেমন অজানা অসংখ্য রহস্য লুকিয়ে আছে, উপরেও রয়েছে নানা অদ্ভুত কাহিনি। এগুলো লোককথার অংশ হয়ে এসব গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।

‘ফ্যান্টম শিপ’ নামে পরিচিত এসব জাহাজ এমন অবস্থায় পাওয়া গেছে, যেখানে প্রাণের কোনো চিহ্ন ছিল না এবং এর কারণ বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করতে পারেননি।

নাবিকদের মুখে মুখে ফেরে ফ্লাইং ডাচম্যান ও মেরি সেলেস্তের মতো ভূতুড়ে জাহাজগুলোর নাম।

মেরি সেলেস্তে

১৮৭২ সালের ৭ নভেম্বর। একজন ক্যাপ্টেন, তার স্ত্রী, তাদের দুই বছরের মেয়ে ও সাত নাবিক মেরি সেলেস্তে জাহাজে করে নিউইয়র্ক থেকে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। এক মাস পর তাদের সেখানে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ব্রিটিশ জাহাজ ডেই গ্রাতিয়া আটলান্টিকে ভাসতে থাকা আমেরিকান জাহাজটিকে দেখতে পায়। সাহায্যের প্রস্তাব দিতে ডেই গ্রাতিয়ার নাবিকেরা মেরি সেলেস্তেতে ওঠেন, কিন্তু জাহাজটি পুরোপুরি ফাঁকা দেখতে পান।

ছয় মাসের খাবার ও নাবিকদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তখনো জাহাজে ছিল, কিন্তু লাইফবোটটি ছিল না। জাহাজের তলায় তিন ফুট পানি জমে ছিল, তবে এমন না যে জাহাজটি আর মেরামত করা সম্ভব না।

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল এই জাহাজটিকে তার ছোটগল্প ‘জে. হাবাকুক জেফসনের স্টেটমেন্ট’ এর অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

কীভাবে সবাই নিখোঁজ হলো, তা নিয়ে নানাজন নানা মত দিয়েছে। কেউ বলেছেন জলদস্যুরা ধরে নিয়ে গেছে, কেউ বলেছেন তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার। তবে সমুদ্রের এই অমীমাংসিত রহস্যের প্রকৃত কারণ হয়তো পৃথিবী আর কখনো জানতে পারবে না।

ক্যারল এ. ডিয়ারিং

কার্গো জাহাজ ক্যারল এ. ডিয়ারিং এবং এর ১০ সদস্যের নাবিকদল ১৯২০ সালে সফলভাবে রিও ডি জেনিরো পৌঁছেছিল। যদিও জাহাজটির মূল ক্যাপ্টেন অসুস্থ হয়ে পড়ায় ক্যাপ্টেন পরিবর্তন করতে হয়েছিল। কিন্তু ভার্জিনিয়ায় ফেরার পথে ঘটে অদ্ভুত ঘটনা।

নর্থ ক্যারোলিনার একজন লাইট হাউস কর্মী জানান, একজন নাবিক বলেছিলেন যে জাহাজটির নোঙর হারিয়ে গেছে; সে সময় বাকি নাবিকেরা সন্দেহজনকভাবে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন।

পরদিন আরেকটি জাহাজ আউটার ব্যাংকসের কাছে ক্যারল এ. ডিয়ারিংকে দেখতে পায়—এমন একটি এলাকায়, যেখানে ভার্জিনিয়ার নরফোকের উদ্দেশে রওনা হওয়া কোনো জাহাজের অবস্থান করার কথা না। পরদিন একটি জাহাজডুবির খবর পাওয়া যায়, কিন্তু বিপজ্জনক আবহাওয়ার কারণে তদন্তকারীরা চার দিন সেখানে যেতে পারেননি।

তারা জাহাজে উঠে দেখেন, খাবার এমনভাবে সাজানো ছিল যেন নাবিকেরা খেতে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও লাইফবোটগুলো ছিল না।

জিয়ান সেং

কিছু জাহাজের ঘটনা এতটাই রহস্যময় যে সেগুলোর পেছনের গল্পও প্রায় অজানা। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ান কোস্টওয়াচ সমুদ্রে ভাসমান একটি পরিত্যক্ত জাহাজ খুঁজে পায়। জাহাজটির টো করার দড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল, যা থেকে ধারণা করা হয়েছিল যে এটিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

জাহাজটির গায়ে ‘জিয়ান সেং’ নাম লেখা ছিল, এবং তদন্তকারীদের হাতে সেটিই ছিল একমাত্র সূত্র। জাহাজটি শনাক্ত করার মতো আর কিছুই ছিল না। বিপৎসংকেত বা এসওএস কলের কোনো রেকর্ড নেই, পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নেই, এমনকি কোনো নিখোঁজ নৌযানের প্রতিবেদনও নেই। জাহাজটির মালিক কে বা এটি কোথা থেকে এসেছিল, সেটিও তারা বের করতে পারেননি।

বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে জোরালো ধারণা, সম্ভবত এটি মাছ ধরার নৌকায় খাবার ও জ্বালানি সরবরাহ করতো। কিন্তু টো করার দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার পর কেউ কেন এটি উদ্ধারের চেষ্টা করেনি, তার উত্তর মেলেনি।

হাই এইম নম্বর ৬

২০০২ সালের মাছ ধরার নৌকা হাই এইম নম্বর ৬ হ্যালোউইনের উদ্দেশে তাইওয়ান ছেড়ে যায়। কিন্তু ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ান নৌবাহিনী যখন নৌকাটির সন্ধান পায়, তখন ইঞ্জিন পূর্ণ গতিতে চলছিল এবং মূল জ্বালানি ট্যাংক খালি ছিল; যদিও সহায়ক জ্বালানি ট্যাংকগুলো পূর্ণ ও অক্ষত ছিল। ১০ টন বোনিটো টুনা ঠান্ডা অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল, কিন্তু নৌকায় কোনো নাবিককে পাওয়া যায়নি।

এই পেছনের কারণ অবশ্য পরবর্তীতে জানা গিয়েছিল। তবে কিছু প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি।

ইন্দোনেশীয় এক জেলে গ্রেপ্তারের পর স্বীকার করেন যে নাবিকেরা জলদস্যুদের সঙ্গে মিলে জাহাজটির ক্যাপ্টেন ও প্রধান প্রকৌশলীকে হত্যা করেছিলেন। তবে এর পেছনে তাদের উদ্দেশ্য বা কারণ এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।

নিনা

২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মাঝামাঝি সাগর থেকে নিনা ইয়টের নাবিকেরা আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তবে এরপর আর কোনো সাড়া দেননি। তারা বিপজ্জনক আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।

ধরে নেওয়া হয়েছিল, ঘণ্টায় ৭০ মাইল বেগে বাতাস এবং ২৬ ফুট উঁচু ঢেউ নিয়ে আসা ঝড় পেরিয়ে যেতে পারেনি নৌকাটি। উদ্ধার অনুসন্ধানও ব্যর্থ হয়। এই কাহিনি এখানেই শেষ হয়ে যেত, একটি রহস্যময় এসএমএস ঘটনা পাল্টে দেয়।

যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর একটি আবহাওয়াবিদের কাছে একটি এসএমএস পৌঁছায়। তাতে লেখা ছিল, গত রাতে ঝড়ে পাল ছিঁড়ে গেছে, এখন খুঁটিগুলো খালি। নৌকায় থাকা ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীর পরিবার এসএমএসের কথা জানার পর ধরে নিয়েছিল তিনি এখনো বেঁচে আছেন।

তবে আবহাওয়াবিদদের মতে, এসএমএসটি কোনো কারণে দেরিতে এসে পৌঁছায়।

ব্যক্তিগতভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে ইয়টের আরোহী আট জনের পরিবারের সদস্যরা স্যাটেলাইটের কিছু ছবি পান। তাদের ধারণা ছিল, সেগুলো নিখোঁজ নিনা ইয়টের ছবি হতে পারে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, সেগুলো আসলে একটি বড় ঢেউয়ের ছবি। আজও নিনার কাহিনি সবচেয়ে অদ্ভুত অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি হয়ে আছে।

এমভি জয়িতা

১৯৫৫ সালে বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি জয়িতা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে দুই দিনের যাত্রায় রওনা হয়। তবে এটি আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি।

জাহাজটির রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেক সন্ধান করেও চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এক মাসেরও বেশি সময় পর আরেকজন ক্যাপ্টেন আংশিক ডুবে থাকা জাহাজটি দেখতে পান। তবে ২৫ জন যাত্রী ও নাবিকের কাউকে পাওয়া যায়নি। এর কোনো ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি।

সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো, একটি পাইপ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ায় জাহাজটি ডুবে যায়।

মমি ঘোস্ট শিপ

এটি কোনো প্রাচীন রহস্য নয়, একেবারে একবিংশ শতাব্দীর ঘটনা। ২০১৬ সালে পরিত্যক্ত মনে করে ফিলিপাইনের জেলেরা একটি ইয়টে ওঠেন। তারা কল্পনাও করেননি, এমন দৃশ্য দেখতে হবে! সেখানে ছিল এক জার্মান নাবিকের মমি। মানফ্রেড ফ্রিৎস বাজোরাত প্রায় ২০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে নৌযাত্রা করছিলেন।

তাকে সর্বশেষ ২০০৯ সালে দেখা গিয়েছিল, যদিও তার এক বন্ধু জানান, ২০১৫ সালে ফেসবুকে বাজোরাতের কাছ থেকে তিনি বার্তা পেয়েছিলেন।

বাজোরাতকে হত্যা করা হয়েছে বা তিনি আত্মহত্যা করেছেন—এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। প্রথমে ধরে নেওয়া হয়েছিল, উষ্ণ ও লবণাক্ত বাতাসে এক বছরে দেহটি মমিতে পরিণত হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ময়নাতদন্তে জানা যায়, সম্ভবত তার মৃত্যু হয়েছিল মাত্র এক সপ্তাহ আগে।

কাজ টু

২০০৭ সালের এপ্রিলে দুই ভাই ও একজন স্কিপার অস্ট্রেলিয়ার চারপাশে দুই মাসের ইয়টযাত্রায় বের হন। মাত্র তিন দিন পর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের কাছে কাজ টু-কে পাওয়া যায়—জাহাজে ছিল অর্ধেক খাওয়া এক কাপ কফি, খোলা একটি সংবাদপত্র এবং মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ছুরি, কিন্তু কোনো মানুষ ছিল না।

ধারণা করা হয়, অনভিজ্ঞ নাবিকদের একজন জাহাজ থেকে পড়ে গিয়েছিলেন এবং তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে অন্য দুজন ডুবে মারা যান। কিন্তু এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই; এটি কেবল একটি তত্ত্ব।

সাম রাতাউলাঙ্গি

পিবি ১৬০০ মালবাহী জাহাজ সাম রাতাউলাঙ্গিকে ২০১৮ সালের আগস্টে মিয়ানমারের উপকূলে দেখা যায়। জাহাজে না ছিল কোনো মানুষ, না ছিল পণ্য।

এর কিছুক্ষণ পর মিয়ানমারের নৌবাহিনী জানতে পারে, একটি টাগবোট মালবাহী জাহাজটিকে ভেঙে ফেলার জন্য একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে নিয়ে যাচ্ছিল। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে টাগবোটের সঙ্গে সংযুক্ত তারটি ছিঁড়ে যায়।

জেনি

এই অপ্রমাণিত কাহিনির উৎস একটি তিমি শিকারি জাহাজের অজ্ঞাত ব্যক্তির বর্ণনা। কেবল তার নাম জানা গিয়েছিল, ‘হোপ’। কিংবদন্তি অনুযায়ী, ১৮৪০ সালে হোপ অ্যান্টার্কটিক ড্রেক প্যাসেজে জেনি নামে একটি স্কুনারের সন্ধান পায়। সেটি তখন পুরোপুরি বরফে জমে ছিল।
নাবিকেরা তখনো জাহাজে ছিলেন, তবে বরফে জমে মারা গিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন তার ডেস্কে বসে থাকা অবস্থায় জমে গিয়েছিলেন, আর খোলা লগবুকে শেষ লেখা ছিল: ‘৪ মে, ১৮২৩। ৭১ দিন ধরে কোনো খাবার নেই। আমিই একমাত্র জীবিত।’

এটি সম্ভবত অতিরঞ্জিত কিংবদন্তিগুলোর একটি, তবে এর পেছনে সত্যের কোনো ভিত্তি থাকতেও পারে।

ফ্লাইং ডাচম্যানের কিংবদন্তি

জাহাজে রহস্যময় ঘটনার তালিকা করতে গেলে ফ্লাইং ডাচম্যানের কথা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। কিংবদন্তি অনুযায়ী, ফ্লাইং ডাচম্যান ছিল ১৭ শতকের একটি জাহাজ, যার ক্যাপ্টেন ছিলেন একজন ডাচ নাগরিক।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জাহাজটি ব্যবহার করতো। অন্য সমুদ্রযাত্রীরা দাবি করেন, তারা বেশ কয়েকবার জাহাজটিকে কেপ অব গুড হোপের কাছে দেখেছেন।

ওই ডাচ নাবিক প্রতিকূল আবহাওয়াকে পাত্তা না দিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে সমুদ্র পাড়ি দিতে পারতেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করতো, তিনি শয়তানের সঙ্গে যোগসাজশ করেছিলেন অথবা নিরাপদে যাত্রার বিনিময়ে নিজের আত্মা বিক্রি করেছিলেন। কাহিনিগুলোতে শেষ পর্যন্ত তিনি ঈশ্বরের অভিশাপে পড়েছিলেন অথবা চিরকাল সমুদ্রে ভেসে বেড়ানোর জন্য অভিশপ্ত হয়েছিলেন বলে প্রচলিত আছে।

গবেষকদের ভাষ্য, ১৮০০ দশকের গোড়ার দিকে ইংরেজ নাবিকদের মুখ থেকে এই কাহিনি তৈরি হয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, সে সময় ডাচদের সুনাম ভালো ছিল না। সে থেকেই হয়তো এই গল্পের জন্ম হয়েছিল।

তবে এর বাস্তব অনুপ্রেরণা হিসেবে ডাচ ক্যাপ্টেন বারেন ফোকেসজের নাম উল্লেখ করা হয়, যিনি অন্য নাবিকদের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে নেদারল্যান্ডস থেকে ইন্দোনেশিয়ায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন।

অবশ্য, এটিও সম্ভব যে জাহাজটি ‘ফাতা মরগানা’ নামে পরিচিত এক ধরনের মরীচিকা ছিল, যেখানে বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির কারণে দিগন্তে জাহাজের মতো অবয়ব দেখা যায়।

খারাপ আবহাওয়ায় এই ভূতুড়ে জাহাজটি দেখা যায় বলে কথিত আছে, আর যারা এর পাশ দিয়ে যায় তাদের জন্য এটিকে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করা হয়। ফ্লাইং ডাচম্যান দেখার সবচেয়ে বিখ্যাত বর্ণনাটি রাজা পঞ্চম জর্জের। কথিত আছে, অস্ট্রেলিয়ার উপকূল ধরে বাস প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি জাহাজটিকে ‘পুরোপুরি আলোকিত’ অবস্থায় দেখেছিলেন। এরপর থেকে জাহাজটি সাহিত্য, শিল্প ও চলচ্চিত্রে একটি সুপরিচিত অনুষঙ্গে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের চলচ্চিত্র ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান: ডেড ম্যানস চেস্ট’-এও জাহাজটি দেখানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনার একটি হলো ক্যারোলি। ২০২৫ সালের আগস্টে এটি সংবাদের শিরোনাম হয়। মাছ ধরার নৌকাটি ৭০ বছর বয়সী জোয়েল কাওয়াহারার নেতৃত্বে ওয়াশিংটন থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় কোস্টগার্ড নৌকাটিতে ওঠার পর কাউকেই দেখতে পায়নি।

এসএস ওরাং মেডান

কিংবদন্তি অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের কাছে কার্গো জাহাজ এসএস ওরাং মেডান থেকে বিপৎসংকেত পাঠানো হয়েছিল, যাতে বলা হয়েছিল: ‘ক্যাপ্টেনসহ সব কর্মকর্তা মৃত, চার্টরুম ও ব্রিজে পড়ে আছেন। সম্ভবত পুরো নাবিকদলই মৃত।’ সাহায্য পৌঁছানোর আগেই রেডিওতে দ্বিতীয় একটি বার্তা আসে, যাতে মাত্র তিনটি শব্দ ছিল: ‘আমি মারা যাচ্ছি।’

উদ্ধারকারীরা জাহাজে উঠে দেখতে পান, নাবিকেরা সত্যিই মৃত। তাদের দেহ ছিল অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো এবং হাত দুটো এমনভাবে প্রসারিত ছিল যেন তারা কোনো আক্রমণকারীকে ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন—তবে তাদের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল না। পরবর্তীতে ইঞ্জিনরুমে আগুন লাগায় জাহাজটি পরিত্যক্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ডুবে যায়।

১৯৪৮ সালের একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এক জীবিত ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়, জাহাজটিতে থাকা সালফিউরিক অ্যাসিড ছড়িয়ে পড়ায় নাবিকদের মৃত্যু হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাহাজের সনদ দেওয়া প্রতিষ্ঠান লয়েডস রেজিস্ট্রিতে এসএস ওরাং মেডানের কোনো রেকর্ড নেই। ফলে কেউ কেউ মনে করেন, এই ভূতুড়ে জাহাজের গল্পটি পুরোপুরি বানানো।

১৩৯ বছর নিখোঁজ, মাত্র ২ ঘণ্টায় সন্ধান

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কিংবদন্তি প্রচলিত ছিল যে লেক মিশিগানের ঠান্ডা গভীরে কোথাও একটি হারিয়ে যাওয়া জাহাজ ডুবে আছে। জেলেরা দাবি করেছিলেন, তাদের জালে জাহাজটির কিছু অংশ উঠে এসেছিল এবং এক লাইট হাউস কর্মী দাবি করেছিলেন, তিনি পানির ওপর জাহাজটির মাস্তুল উঠতে দেখেছেন।

তবে কেউই জাহাজটির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারছিল না। জাহাজটি ধীরে ধীরে ‘ভূতুড়ে জাহাজ’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

এবার সেই রহস্যের সমাধান হয়েছে। ১৩৯ বছর পর ১৯ শতকে ডুবে যাওয়া কাঠের স্কুনার এফ.জে. কিং এর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেছে। বছরের পর বছর ব্যর্থ চেষ্টার পর মাত্র দুই ঘণ্টায় এটি খুঁজে পাওয়া গেছে।

এফ.জে. কিং ১৮৬৭ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং কার্গো জাহাজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

১৮৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিশিগান থেকে শিকাগোতে লৌহ আকরিক নিয়ে যাওয়ার সময় ডোর পেনিনসুলার কাছ দিয়ে যাওয়ার পথে এফ.জে. কিং প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পড়ে।

প্রবল বাতাসে কাঠের জাহাজের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জাহাজের ভেতরে পানি জমতে শুরু করে। ক্যাপ্টেন মাঝরাতে জাহাজটি পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং সব নাবিককে উদ্ধার করা হয়।

এগুলোকে ‘ভূতুড়ে জাহাজ’ বলা হলেও এসব ঘটনার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত কোনোকিছুর সম্পৃক্ততা নেই বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনবিসি নিউজ।

Related Articles

Latest Posts