কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে তখন আলো ঝলমল সন্ধ্যা। বিশ্বকাপের মঞ্চে স্কটল্যান্ড নামছে খেলতে, যে ম্যাচে থাকার কথা ছিল টাইগারদের। সবুজ জার্সির গর্জন, লাল-সবুজ পতাকার ঢেউ, ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ ধ্বনি— সবই সেখানে অনুপস্থিত। ঠিক সেই সময়, কয়েকশ কিলোমিটার দূরে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মঞ্চে উঠছে বাংলাদেশের কিংবদন্তি ব্যান্ড মাইলস। ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমাপতন; বাংলাদেশ খেলছে না, অথচ বাংলাদেশের জন্যই গান গাওয়া হচ্ছে, কিন্তু উৎসব তৈরি হয়নি।
এই আয়োজনের পেছনে ছিল ক্ষত ঢাকার চেষ্টা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর বিসিবি বুঝেছিল, দর্শকদের মধ্যে তৈরি হবে শূন্যতা, অভিমান আর হতাশা। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই হুট করে সাজানো হয় একটি টুর্নামেন্ট— ‘অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপ’। ক্রিকেটের সঙ্গে গান, মাঠের সঙ্গে মঞ্চ। ভাবনাটা ছিল, মাঠে খেলা হবে, গ্যালারিতে মানুষ ফিরবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলল। কারণ কিছু ক্ষত থাকে, যেগুলো সময় ছাড়া আর কিছুতেই শুকায় না।
মিরপুর স্টেডিয়াম সাধারণত মানুষের আওয়াজে নিজেকে চেনে। এখানে নীরবতা অস্বস্তিকর। কিন্তু সেদিন ২৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার গ্যালারিতে নীরবতাই ছিল সবচেয়ে দৃশ্যমান। ফাঁকা সারিতে বসে থাকা চেয়ারগুলো যেন অপেক্ষা করছিল কেউ এসে বসবে, কিন্তু কেউ আসেনি। হাতে গোনা কিছু দর্শক, কিছু সাংবাদিক আর মাঠে থাকা খেলোয়াড়রা মিলেই পুরো স্টেডিয়াম। আলো ছিল, সাজ ছিল, আয়োজনের কমতি ছিল না; তবু প্রাণ ছিল না। কারণ প্রাণ আসে মানুষের মন থেকে, আর সেই মন তখনো বিশ্বকাপের শূন্যতায় আটকে।
এই নীরবতার মাঝেই মাইলস গান শুরু করল। নব্বইয়ের দশক থেকে যে ব্যান্ড শহরের জীবনের ভেতর ঢুকে পড়েছিল নিঃশব্দে। ক্যাসেট, সিডি, রেডিও পেরিয়ে যারা হয়ে উঠেছিল একাধিক প্রজন্মের অনুভূতির ভাষা। মাইলসের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো জায়গা নেই। আজও তাদের গান মানুষ শোনে, গায়, নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। সেদিন মানুষের না আসা তাই কোনোভাবেই মাইলসের ব্যর্থতা নয়। বরং এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যেখানে জনপ্রিয়তা আর উপস্থিতির মাঝে অদ্ভুত এক ফাঁক তৈরি হয়েছিল।
এই ফাঁক তৈরি হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল তাড়াহুড়ো। আয়োজনটি হয়েছিল হুট করে। প্রচারের সময় ছিল অল্প, পরিকল্পনার সুযোগ সীমিত। দর্শকদের মনে এই টুর্নামেন্ট কোনো অপেক্ষা তৈরি করতে পারেনি; কোনো দিন গুনে রাখার উত্তেজনা তৈরি হয়নি। তার ওপর ছিল বিশ্বকাপে না যাওয়ার ক্ষত। যেখানে থাকার কথা ছিল, সেখানে না থাকার বেদনা তখনো তাজা। সেই বেদনাকে পাশে রেখে মানুষ অন্য কোনো উৎসবে নিজেকে সঁপে দিতে পারেনি।
এই ছবি শুধু মাইলসের দিনেই নয়, আগের দিনগুলোতেও ছিল একই চিত্র। ওয়ারফেজ এসেছে, মিলা এসেছেন; নব্বইয়ের দশক আর পরের প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পীরা একে একে মঞ্চে উঠেছেন। কিন্তু গ্যালারির শূন্যতা থেকে গেছে একই রকম। এতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, সমস্যাটি গান বা গায়ককে ঘিরে নয়; সমস্যাটি দর্শকের মানসিক অবস্থান। দর্শক যেন নীরবে বলে দিয়েছে— এই আয়োজন আমাদের বিশ্বকাপের বিকল্প হতে পারছে না।
মাইলসের জন্য সেদিনের অভিজ্ঞতা ছিল ব্যতিক্রমী। এত বছরের ক্যারিয়ারে এমন নিঃসঙ্গ মঞ্চ খুব কমই এসেছে। গান যখন শেষ হচ্ছিল, হাততালির শব্দ আসছিল, কিন্তু তা ছড়িয়ে পড়ছিল না; উল্লাস তৈরি হচ্ছিল না। কেবল একটি ব্যান্ড গাইছে, আর একটি স্টেডিয়াম শুনছে। এই দৃশ্যেই ধরা পড়ছিল সময়ের নির্মমতা; জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো শিল্পীও পরিস্থিতির কাছে অসহায় হয়ে পড়েন।
মিরপুরের সেই রাত তাই কোনো ব্যর্থ কনসার্টের গল্প নয়; এটি ছিল এক ব্যর্থ সান্ত্বনার গল্প। বিসিবি যে ক্ষত ঢাকতে চেয়েছিল গান আর ঘরোয়া টুর্নামেন্ট দিয়ে, দর্শক তা গ্রহণ করেনি। কারণ ক্ষতটা টাটকা, বিশ্বকাপে না যাওয়ার বেদনা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের ভেতরে ধুকপুক করছে। সেই বেদনাকে অগ্রাহ্য করে উৎসব বানানো যায় না।

