নির্বাচনী মাঠজুড়ে যখন বড় দলগুলোর ব্যানার-ফেস্টুন, মাইকিং আর বিশাল জনসভা—তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে। কোনো গাড়ির মহড়া নেই, নেই কর্মীবহর। কাঁধে ছোট্ট একটি ব্যাগ, হাতে কাঁচি প্রতীকের লিফলেট। পায়ে হেঁটে গ্রামের পথ মাড়িয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন প্রগতি বর্মণ তমা। তার প্রচারণায় উঠে আসছে কৃষকের অধিকার আর নারীর মর্যাদার কথা।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত এই প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কৃষি সংস্কার ও নারীর অধিকার। কাঁচি প্রতীক নিয়ে লড়ছেন তিনি। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলাই তার লক্ষ্য।
শনিবার সকালে পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী ইউনিয়নের হাতিরামের দীঘি গ্রামে নিজের বাড়ি থেকে প্রচারণায় বের হন প্রগতি। নাশতা বলতে সামান্য বিস্কুট আর এক কাপ চা। সেখান থেকেই শুরু হয় দিনের প্রচারণা। মাঠে কাজ করা কৃষকদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন, শুনছেন তাদের কথা। আবার কখনো উঠান বৈঠকে নারীদের সঙ্গে কথা বলছেন তাদের অধিকার নিয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী প্রগতি একসময় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হলফনামা অনুযায়ী, পেশায় তিনি গৃহশিক্ষক।
প্রগতি বর্মণ তমা জানান, তার নির্বাচনী এলাকা মূলত কৃষিভিত্তিক। কৃষক না বাঁচলে এ অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণেই ইশতেহারে কৃষি ও কৃষককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি।
তার ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে—আলুচাষিদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, ধান-আলুসহ সব ফসলের লাভজনক দাম নির্ধারণ, সরকারি উদ্যোগে হিমাগার নির্মাণ করে বস্তাপ্রতি ভাড়া ১০০ টাকা নির্ধারণ, সার-বীজ-কীটনাশকের দাম কমানো এবং বিনা সুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থা। এ ছাড়া হাটে হাটে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার প্রস্তাবও রয়েছে তার পরিকল্পনায়।
রংপুর-৪ আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে প্রগতি নারীর শ্রমের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতির দাবি তুলেছেন। তিনি মনে করেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরে বন্দী রাখার চিন্তা অবাস্তব এবং অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। তার ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং নারীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রগতির সাবলীল ভাষা আর স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নারী ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। হাতিরাম গ্রামের ভোটার সন্ধ্যা রানী বলেন, ‘প্রগতি বর্মণ খুব সুন্দর ও সাবলীলভাবে কথা বলেন। তিনি নারীদের সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তার মতো একজন নারী সংসদে গেলে নারীদের কল্যাণ হবে।’
সুখানপুর গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, ‘প্রগতি মাঠে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কৃষকদের সমস্যাগুলো তিনি জানেন। কৃষকদের নিয়ে তার চিন্তাভাবনাগুলো আমাদের ভালো লেগেছে।’
ডাকুয়াটারী গ্রামের নাসিমা বেগম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও চাকরি না করে তিনি মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করছেন। প্রগতিকে দেখতে খুব সাধারণ। এ রকম জনপ্রতিনিধিই আমাদের নির্বাচন করা উচিত।’
আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় কর্মী-সমর্থক নিয়ে প্রচারণা চালাতে পারছেন না প্রগতি। তিনি বলেন, ‘আমি একাই দিনে-রাতে ছুটছি। আমার কোনো ভয় নেই। ভয় করলে রাজনীতি করা যায় না।’ মাঝে মাঝে গ্রামের পরিচিত নারীরা অথবা তার বাবা-মা সঙ্গ দেন।
প্রগতির মা মলিনা রায় বলেন, ‘মেয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চায় বলেই চাকরির পথে না গিয়ে রাজনীতি বেছে নিয়েছে। আমি মাঝে মাঝে মেয়ের সঙ্গে যাচ্ছি। বিশেষ করে নারী ভোটাররা ভালো সাড়া দিচ্ছেন।’ বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক পীযূষ কান্তি বর্মণ বলেন, ‘মেয়ের সংগ্রাম দেখে আমি নিজেই বিস্মিত। সে নিজের বলে কিছুই ভাবছে না। শুধু মানুষের কল্যাণের কথা বলে।’
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ লাখ ৯ হাজার ৯০৬ ভোটারের এই আসনে মোট প্রার্থী ৯ জন। প্রগতি বর্মণ তমা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনী পরিবেশে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না থাকার কথা তুলে ধরেন প্রগতি। তিনি বলেন, ‘টাকার দাপটে রাজনীতি হলে বৈষম্য থেকেই যায়। নীতিনৈতিকতা আর যোগ্যতার ভিত্তিতে জনগণকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’

