থাইল্যান্ডের জাতীয় নির্বাচনে জয়ের দাবি করেছেন দেশটির রক্ষণশীল দলের প্রতিনিধিত্বকারী ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল।
আজ রোববার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
থাই টিভি স্টেশনগুলোর পূর্বাভাস মতে, চার্নভিরাকুলের দল জাতীয়তাবাদের জোয়ারে দেশের মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। দলটি সব চেয়ে বেশি আসন জিততে চলেছে বলে দাবি করে স্টেশনগুলো।
ব্যাংককে দলের সদর দপ্তরে গণমাধ্যমের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে চার্নভিরাকুল বলেন, ‘আমরা খুব সম্ভবত নির্বাচনে প্রথম স্থান অধিকার করতে চলেছি।’
‘আজকের এই বিজয় সব থাই নাগরিকের। আপনি আমাদের পক্ষে ভোট দিয়ে থাকলেও, বা না দিয়ে থাকলেও এটা আপনাদের সবার জয়’, বলেন তিনি।
চ্যানেল থ্রি-এর পূর্বাভাস মতে, চার্নভিরাকুলের ভুমজাইথাই পার্টি অন্তত ২০০টি আসন পেতে চলেছে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রগ্রেসিভ পিপলস পার্টি ১০০টির মতো আসন পেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার ফেউ থাই পার্টি থেকে এগিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে।
সর্বশেষ নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছিল ভুমজাইথাই পার্টির। তৃতীয় অবস্থানে থাকা দলটির নেতাকে পার্লামেন্ট গত সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়।
এর আগে পর্যায়ক্রমে ফেউ থাই পার্টির দুই নেতাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে আদালতের নির্দেশে অপসারণ করা হয়।
পিপলস পার্টি দলের নেতা নাত্থাফং রুয়েংপানিয়াউত পরাজয় মেনে নিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে দলটি প্রথম হবে, আমরা আমাদের মূলনীতি অনুযায়ী তাদের সরকার গঠনের অধিকারের প্রতি সম্মান জানাবো।’
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সময় কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তের নাজুক পরিস্থিতি মাথায় রেখেছেন।
চার্নভিরাকুলের নিজের শহর বুরিরামের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন ইউএরনিয়ং লুনবুত (৬৪)। তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন এক শক্তিশালী নেতা প্রয়োজন যিনি আমাদের সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষা দিতে পারবেন।’
‘এই সীমান্ত এলাকায় বসবাস করে আমি উদ্বেগে আছি। যুদ্ধ এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আমাদের এর আগে কখনো ভাবতে হয়নি’, যোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত বছর দুইবার কম্বোডিয়ার সঙ্গে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকার দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়াতে বাধ্য হয় থাইল্যান্ড।
প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের পর চার্নভিরাকুল সেনাবাহিনীকে সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতি অনুযায়ী যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দেন। এসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নেন তিনি।
যার ফলে ডিসেম্বরে সর্বশেষ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে থাই সেনাবাহিনী বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ভূখণ্ডের দখল নেয়। তারপর থেকে ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি চলছে।
অপেশাদার জেট পাইলট চার্নভিরাকুল বলেন, ‘ভুমজাইথাই পার্টির সবার হৃদয়ে জাতীয়তাবাদ রয়েছে।’
উবন রাচাথানি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক তিতিপোল ফাকদিওয়ানিচ এএফপিকে বলেন, ভুমজাইথাই নির্বাচনে আশাতীত ভালো ফল করেছে এবং এর পেছনে ‘জাতীয়তাবাদকে’ আঁকড়ে ধরার কৌশল কাজে লেগেছে।
তিনি বলেন, ‘তারা সেনাবাহিনী ও রাজবংশের প্রতি নিজেদের সমর্থন তুলে ধরেছে। তারা “থাই জাতীয়তাবাদ”-এর প্রচার করেছে, যা ভোটারদের মনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির পরবর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে গতিশীল করা। পর্যটন খাতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধি দেখা দিলেও প্রাক-কোভিড পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার পথ এখনো বহুদূর।
ভুমজাইথাই ৫০০ আসনের নিম্নকক্ষে একক দল হিসেবে সর্বোচ্চ আসন পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে বলে ভাবছেন না বিশ্লেষকরা।
তবে জোট গঠনের আলোচনায় অবশ্যই দলটি এগিয়ে থাকবে।
থাইল্যান্ডে ‘মিশ্র প্রতিনিধিত্ব’ প্রক্রিয়া চালু আছে। ৪০০ পার্লামেন্ট সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। বাকি ১০০ জন পৃথকভাবে ‘পার্টি লিস্টের’ মাধ্যমে নির্বাচিত হন।
তিন বছর আগের সর্বশেষ নির্বাচনে জটিল এই নির্বাচনী ব্যবস্থার বলি হয় পিপলস পার্টি। সে সময় ‘মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি’ নামে পরিচিত দলটি সবচেয়ে বেশি আসন জেতার পরও তাদের প্রার্থীকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি পার্লামেন্ট। এক পর্যায়ে আইনের মারপ্যাঁচে নিষিদ্ধ হয়ে যায় দলটি।
পরবর্তীতে আবারও পিপলস পার্টি নামে আত্মপ্রকাশ করে দলটি।
বিশ্লেষকদের মত, ফেউ থাই পার্টির সঙ্গে জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভুমজাইথাই। আগের সরকারেও দুই দল মিত্র হিসেবে কাজ করে।
তবে সীমান্ত সংঘাতের মোকাবিলার কৌশল নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার সঙ্গে মতভেদ দেখা দেওয়ায় দুই দলের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়।
সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি থাইল্যান্ডে সংবিধান সংস্কার নিয়ে গণভোটেরও আয়োজন করা হয়েছে।
২০১৪ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাশাসকদের তৈরি করা সংবিধান পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রস্তাব নিয়েই মূলত এই গণভোট।
৬০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দেবেন বলে পূর্বাভাষ পাওয়া গেছে। তবে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সংস্থার উদ্যোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।

