হাসপাতাল না ময়লার ভাগাড়!

একটু সুস্থ হওয়ার আশায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া থেকে রবিরবাজারের পৃথিমপাশা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে এসেছিলেন রহেলা বেগম। কিন্তু চিকিৎসা নিয়ে স্বস্তি পাওয়ার বদলে তিনি ফিরে গেছেন বিরক্তি আর অস্বস্তি নিয়ে।

তার অভিযোগ, অসুস্থ শরীর নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর পরই তাকে স্বাগত জানায় পাশেই জমে থাকা পচা আবর্জনার তীব্র দুর্গন্ধ। চিকিৎসাকেন্দ্রের পরিবেশ দেখে তার মনে হয়েছে, এটি যেন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জায়গা নয়, বরং একটি খোলা ডাস্টবিন।

রহেলা বেগমের মতো প্রতিদিন একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন শত শত রোগী। নারী, পুরুষ, শিশু—সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রবেশমুখের কাছেই বছরের পর বছর ধরে জমছে বাজারের নানা ধরনের বর্জ্য। প্লাস্টিক, পলিথিন, হোটেলের উচ্ছিষ্ট খাবারসহ বিভিন্ন আবর্জনার স্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ রোগী, স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের পাশের খোলা জায়গায় নিয়মিতভাবে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। সেখানে তৈরি হয়েছে বড় একটি বর্জ্যের স্তূপ। পচনধরা খাবার ও প্লাস্টিকের মিশ্রণে সৃষ্ট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্র এলাকা এবং আশপাশে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সীমানা নির্ধারণ, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, অবৈধ দখল বন্ধ এবং আবর্জনা অপসারণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

রবিরবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, উপজেলার দক্ষিণাংশের ছয়টি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র এই বাজার। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় এখানে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন পৃথিমপাশা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে। অথচ কেন্দ্রটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত।

এলাকার বাসিন্দা সাদেক হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সরকারি জমির সীমানা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না থাকায় সমস্যা আরও বেড়েছে। এই সুযোগে খালি জায়গাটি কার্যত বাজারের বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত হয়েছে।’

তার ভাষ্য, ‘রবিরবাজারে নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান কিছুটা দূরে হওয়ায় অনেকে সহজ পথ বেছে নিচ্ছেন। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় সেখানে খোলামেলা মলত্যাগের ঘটনাও ঘটে, যা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।’‘

নিয়মিত চেকআপের জন্য মুরইছড়া থেকে আসা হোসনা বেগম বলেন, ‘আমরা এমনিতেই অসুস্থ হয়ে এখানে আসি। বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সময় আবর্জনার দুর্গন্ধে আরও খারাপ লাগে। এই পরিবেশে কীভাবে সুস্থ হওয়া যাবে?’

সীমান্ত এলাকার একটি গ্রাম থেকে মাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা কামাল মিয়ারও একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘অনেক দূর থেকে চিকিৎসার জন্য আসি। কিন্তু হাসপাতালের চারপাশের ময়লা আর দুর্গন্ধ দেখে মনে হয়, এখানে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।’

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার শিরিনা খাতুন বলেন, ‘কেন্দ্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে বর্জ্য ফেলেন না। বাজারের লোকজনই নিয়মিত আবর্জনা ফেলছেন।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ব্যবসায়ী সমিতিকে জানিয়েছি। উচ্চতর কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু সীমানাপ্রাচীর না থাকায় সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

রবিরবাজার গরিব ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাসান আল মাহমুদ রাজু জানান, গত ছয়-সাত বছর ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে অবাধে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এখন সেখানে দাঁড়ানোই কঠিন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের।’

রবিরবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাসুক আহমেদ বলেন, ‘অবৈধভাবে বর্জ্য ফেলা বন্ধে মাইকিংসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ নিয়মিতভাবে নির্দেশনা অমান্য করছেন।’

তার মতে, বাজারে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ সুবিধার অভাবও সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান দূরে হওয়ায় অনেকে নিয়ম না মেনে কাছাকাছি স্থানে ময়লা ফেলছেন।

৩৫ বছর ধরে বাজার কমিটির সঙ্গে যুক্ত মাসুক আহমেদ বলেন, ‘এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পরিবেশ রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।’

তিনি আরও জানান, বাজারের অধিকাংশ সিসিটিভি ক্যামেরা বর্তমানে অকেজো থাকায় দায়ীদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জেরিন আখতার বলেন, ‘সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। সমাধানের জন্য বিভিন্ন সময়ে সিভিল সার্জনের পরিদর্শন, ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে বৈঠক এবং সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে এখানে কর্মরত আছি। অনেক চেষ্টা করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।’

তবে নতুন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষের জন্য যেখানে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে পৃথিমপাশা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের রোগীরা প্রতিদিন লড়াই করছেন দুর্গন্ধ আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সঙ্গে। চিকিৎসার আশায় আসা মানুষদের প্রশ্ন—আর কতদিন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশেই আবর্জনার পাহাড় জমে থাকবে?

Related Articles

Latest Posts