সৌরশক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে বড় কর ছাড়ের পরিকল্পনা

পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে আগামী বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) খাতে বড় ধরনের কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আয়কর ছাড়, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিদ্যুৎ বিলে রেয়াত ও ইভির ওপর কর কমানোর মতো উদ্যোগ থাকতে পারে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর শূন্য শতাংশ আয়কর সুবিধা দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি যেসব গ্রাহক সৌরশক্তি ব্যবহার করেন, তাদের বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করছে সরকার।

এ ছাড়া লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্যাক তৈরির কাঁচামাল আমদানির ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কর মওকুফ করার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যের আমদানিতে মোট করের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় সরকার। সে কারণেই আগামী অর্থবছরের শুল্ক ছাড়ের বড় অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেওয়া হতে পারে।

সবুজ জ্বালানি নীতির অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও নবায়নের সময় নেওয়া অগ্রিম আয়করও কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ইভির ওপর ২ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর নেওয়া হয়। সেটি গাড়ির ক্ষমতা অনুযায়ী কমিয়ে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার এবং ১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ক্ষমতার ইভির জন্য ২৫ হাজার টাকা, ৩০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা, ৪০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা এবং ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি ক্ষমতার গাড়ির জন্য ১ লাখ টাকা কর ধার্য হতে পারে।

সরকার স্থানীয় ইভি যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক, নির্মাতা ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার কথা ভাবছে। পাশাপাশি ই-বাইক ও বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশনের ওপর শুল্ক কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ১১ জুন সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় এসব ঘোষণা দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত মাসে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন।

ইলেকট্রিক স্কুটার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রানার মোটরসের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ফিরোজ কবির প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়েই পরিবেশবান্ধব পরিবহনের দিকে ঝোঁক বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে এখনো চার্জিং অবকাঠামো বা স্টেশন বড় চ্যালেঞ্জ।

তার মতে, বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যবহারকারী বাসায় চার্জ দেন। কিন্তু ইভির ব্যবহার বাড়াতে হলে সারা দেশে নির্ভরযোগ্য চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন খান বলেন, শুধু কর ছাড় দিলেই হবে না, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইভি খাতে সামগ্রিক নীতিগত সংস্কারও প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে সরকার যেখানে শূন্য বা ১ শতাংশ শুল্ক দিচ্ছে, সেখানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে তারা ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কর নিচ্ছে। তার ভাষায়, এটি ‘কর বৈষম্য’।

তিনি দাবি করেন, জ্বালানির ওপর কর নির্ধারণ সাপ্লাই চেইনের ওপর ভিত্তি করে না হয়ে খরচের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত।

গত সপ্তাহে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য একগুচ্ছ কর সংস্কারের প্রস্তাব দেয়। সংস্থাটি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির ওপর অগ্রিম কর প্রত্যাহার, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির শুল্ক কমানো, শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর সম্পূরক শুল্ক বাতিল এবং ইভির কর কমানোর সুপারিশ করেছে।

সিপিডির মতে, বর্তমানে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর থাকায় মোট করের পরিমাণ ২৮ থেকে ৩১ শতাংশে পৌঁছে যায়, যা প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

সংস্থাটি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার এবং এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক তুলে দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে।

ইভির ক্ষেত্রে সিপিডি ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাতিল এবং আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, সবুজ প্রযুক্তির মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি করের চাপ বহন করছে বৈদ্যুতিক গাড়ি।

 

 

 

 

 

 

 

Related Articles

Latest Posts