শেকড় অটুট রেখে বদলের পথে আর্টসেল

বাংলা রক সংগীতের কিছু ব্যান্ড যেন সময়ের পরিচয় হয়ে ওঠে। বহন করে প্রজন্মের থেকে প্রজন্মের স্মৃতিও। আর্টসেল তেমনই একটি নাম।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে তারা নিজেদের আলাদা এক জগৎ তৈরি করেছে। যেখানে ভারী গিটার রিফের সঙ্গে গভীর কথা আর অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ জড়িয়ে আছে। সেই যাত্রায় অবশ্য অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি আর্টসেলকে ঘিরে মানুষের অনুভূতি।

সাম্প্রতিক সময়ে এই পথচলায় এসেছে নতুন এক অধ্যায়ও।

সম্প্রতি চেনা এই ব্যান্ডের আবহকে ধরে রেখে কালো পোশাকে কয়েকজন মানুষ হাজির হয়েছিলেন দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে। তবে অনুপস্থিত ছিলেন জর্জ লিংকন ডি কস্টা, যার কণ্ঠ ও গিটার দুই দশক ধরে আর্টসেলের মৌলিক পরিচয় হয়ে উঠেছিল। আর্টসেলের মতো ব্যান্ডের জন্য এমন পরিবর্তন নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা।

লিংকনের জায়গায় বর্তমানে ভোকাল ও রিফের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ‘বে অব বেঙ্গল’ ব্যান্ডের সাবেক ফ্রন্টম্যান বখতিয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, ‘আর্টসেলের হয়ে গান করাটা আমার জন্য অসাধারণ এক অনুভূতি। ছোটবেলা থেকেই এরা আমার হিরো ছিল।’

বাঁশি বাজানো আর ছবি আঁকাতেও দক্ষ এই শিল্পীর জন্য দায়িত্বটি যেমন সম্মানের, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও।

আর সেই পরীক্ষার প্রথম বড় মুহূর্ত ছিল ১০ জুলাইয়ের শো। ড্রামার কাজী আশেকীন শাজুর কাছেও সেটি ছিল অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা।

তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, শোটা আমার জন্য বেশ স্নায়ুচাপের ছিল। লিংকনকে ছাড়া আমাদের প্রথম শো। তাই আমরা সবাই একটু চিন্তিত ছিলাম।’

তবে সেই দুশ্চিন্তা কেটে যায় দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায়।

‘আমাদের ভক্তরা যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে আমরা অনেকটা স্বস্তি পেয়েছি’, বলেন তিনি।

এরপর ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) মঞ্চেও একই রকম ভালোবাসা পেয়েছে আর্টসেল। প্রতিটি পারফরম্যান্স যেন দেখিয়েছে, ব্যান্ডটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল কিছু গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

তবে লিংকনের অনুপস্থিতি নিয়েও আর্টসেলের সদস্যদের অবস্থান স্পষ্ট।

শাজু বলেন, ‘লিংকন যেখানেই থাকুক না কেন, সবসময় আর্টসেলের সদস্য থাকবে।’

বরং সামনে কানাডা সফরে আবারও একসঙ্গে বাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই সফরে লিংকনের পাশাপাশি থাকবেন সিজানও।

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সফরের প্রস্তাব পেলেও আর্টসেল নিজেদের প্রস্তুতির বিষয়ে বরাবরই সতর্ক। কারণ তাদের কাছে মঞ্চে ওঠা মানেই শুধু পারফর্ম করা নয়, ভক্তদের সামনে নিজেদের সেরাটা তুলে ধরা।

গিটারিস্ট ইকবাল আসিফ জুয়েল বলেন, ‘উত্তর আমেরিকা থেকে আমরা অনেক সফরের প্রস্তাব পাই। কিন্তু আমাদের সেটআপ নিয়ে আমরা বেশ খুঁতখুঁতে।’

তার মতে, যন্ত্রপাতি ও সাউন্ডের মান ঠিক না হলে তারা মঞ্চে উঠতে চান না।

‘আমরা চাই না আমাদের ভক্তরা হতাশ হোক’, বলেন তিনি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের ধরন আর শ্রোতার রুচি বদলেছে। কিন্তু নিজেদের জায়গা থেকে আপস করেনি ব্যান্ডটি।

‘অন্য সময়’ ও ‘অনিকেত প্রান্তর’—এই দুই অ্যালবাম এখনো বহু ভক্তের কাছে বাংলা রক সংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। অনেকের কাছে এগুলো শুধু অ্যালবাম নয়, একটি সময়ের স্মৃতি।

তবে আর্টসেলও জানে, অতীতকে আঁকড়ে ধরে কোনো শিল্পী বা ব্যান্ড দীর্ঘদিন এগিয়ে যেতে পারে না। তাই নতুন অ্যালবাম ‘চতুর্থাংশ’-এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সাউন্ডে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

লিড গিটারিস্ট কাজী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘সব ভক্তের মতামতকেই আমি সম্মান করি। তবে নতুন গানগুলোর সঙ্গে কারও কারও মানিয়ে নিতে সময় লাগার পেছনে নস্টালজিয়ার বড় ভূমিকা আছে।’

তবে এখন নতুন গানেও ভক্তরা গলা মেলাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

স্টেজে ‘অদেখা স্বর্গ’ ও ‘অপসরী’র মতো গান বাজানোর অনুভূতিও তার কাছে বিশেষ।

‘এ ধরনের গান বাজাতে পারাটা আমার জন্য সীমাহীন আনন্দের’, বলেন তিনি।

শুধু নতুন গান তৈরি নয়, নিজেদের ইতিহাস সংরক্ষণের কাজও করছে আর্টসেল। সম্প্রতি চালু করা হয়েছে তাদের নতুন ওয়েবসাইট ‘artcell.band’। যেখানে ব্যান্ডের তথ্য, ইতিহাস ও বিভিন্ন বিষয় সহজে পাওয়া যাচ্ছে।

ওয়েবসাইটে থাকা চ্যাটবটকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, আর্টসেল সবচেয়ে বড় কোন বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন উঠে আসে সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এরশাদ জামানের প্রসঙ্গ।

তবে বর্তমান সদস্যদের কাছে সেটি কোনো বিরোধের গল্প নয়, বরং আর্টসেলের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি অংশ।

শাজু বলেন, ‘এরশাদ দুর্দান্ত একজন গিটারিস্ট। যখনই দেখা হয়, আমরা কুশল বিনিময় করি। তার আর তার গানের জন্য সবসময় আমাদের শুভকামনা থাকবে।’

‘আর্টসেলের ইতিহাসে সে যতটা অংশ, আমরাও ঠিক ততটাই’, বলেন সাজু।

বর্তমান সময়ে অনেক ব্যান্ডই অতীতের সাফল্যের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু আর্টসেলের গল্প কিছুটা ভিন্ন। তারা একদিকে যেমন নিজেদের পুরোনো পরিচয়কে সম্মান করছে, অন্যদিকে চেষ্টা করছে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে।

হয়তো এ কারণেই আর্টসেল শুধু একটি ব্যান্ড নয়। এটি একটি অনুভূতি, একটি প্রজন্মের সংগীতচেতনা। আর সেই কারণেই বেঁচে থাকবে ‘আর্টসেলিজম’।
 

Related Articles

Latest Posts