পারিবারিক নাটক কেন কমে গেল, কারণ জানালেন পাঁচ নির্মাতা

একসময় এ দেশে পারিবারিক গল্পের অসংখ্য নাটক তৈরি হতো। সেসব নাটক আগ্রহ নিয়ে দেখতেন দর্শকরা। আমজাদ হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, আতিকুল হক চৌধুরী থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদের তৈরি করা নাটকগুলো আজও স্মৃতিকাতর করে দর্শকদের। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ধারাবাহিকতা অনেকটাই কমে গেছে। এখন হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া সেভাবে পারিবারিক নাটক চোখে পড়ে না।

কেন কমে গেল পারিবারিক গল্পের নাটক? এ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের পাঁচ জনপ্রিয় নির্মাতা। তারা হলেন গিয়াস উদ্দিন সেলিম, সালাহউদ্দিন লাভলু, অরণ্য আনোয়ার, অনিমেষ আইচ ও সোহেল আরমান।

গিয়াস উদ্দিন সেলিম

পারিবারিক গল্পের নাটকের চাহিদা একসময় তুঙ্গে ছিল। বিটিভি থেকে এর শুরু, এরপর দীর্ঘদিন ধরে এই ধারা চলেছে। পরে ইউটিউবসহ নানা কারণে নাটকের ধরন অন্যদিকে মোড় নেয়। একসময় নাটক পুরোপুরি নায়ক-নায়িকানির্ভর হয়ে পড়ে, যার ফলে ক্যারেক্টার আর্টিস্টদের কাজ কমে যায়। এসব কারণেই পারিবারিক নাটক কমে যায়। তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে, আবার পারিবারিক গল্প ফিরে আসছে। যদিও তা আগের তুলনায় কিছুই না। দর্শকেরা আসলে ভালো গল্প চান। পারিবারিক নাটকে আমাদের জীবনের কথাই উঠে আসে, তাই এই ধরনের নাটক আরও বেশি হওয়া উচিত।

সালাহউদ্দিন লাভলু

পারিবারিক নাটক কম হওয়ার অনেক কারণ আছে। অথচ আমাদের ছিল পারিবারিক নাটকের বিশাল ঐতিহ্য। এ দেশের দর্শকেরা পারিবারিক নাটকই বেশি দেখতেন। আমাদের অগ্রজ পরিচালক ও নাট্যকারেরা পারিবারিক নাটক দিয়ে বাজিমাত করে গেছেন, যেগুলো কালজয়ী হয়ে আছে। আমি গ্রামের গল্প নিয়ে নাটক করলেও সব সময় চেষ্টা করি সেখানে পারিবারিক বিষয়গুলো তুলে আনতে। পারিবারিক গল্পের নাটক কীভাবে যেন কমতে শুরু করল! এর দায় কার? তবে এখনো সদিচ্ছা থাকলে পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

অরণ্য আনোয়ার

পারিবারিক গল্পনির্ভর নাটক কম হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে সময়ের বদল। একটা সময় আমরা যৌথ পরিবারে বাস করতাম। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছে। যে কারণে পারিবারিক গল্প বেশি তৈরি হতো এবং দর্শকও তা আগ্রহ নিয়ে দেখতেন। এখন যৌথ পরিবার নেই বললেই চলে, সবাই যার যার মতো আলাদা থাকছে। ফলে সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন ঘটছে নাটকে। তবে একেবারেই যে হচ্ছে না, তা নয়। মোস্তফা কামাল রাজ সম্প্রতি ‘পারিবারিক’ ঘরানার একটি নাটক নির্মাণ করেছেন, যা দর্শক খুব পছন্দ করেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে আবেগের এই গল্পগুলো এখন কমই হচ্ছে।

অনিমেষ আইচ

পারিবারিক নাটক কম হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হতে পারে ভালো নাট্যকার ও পরিচালকের অভাব। এখন অনেকেই মনে করেন, নাটকে শুধু তারকা থাকলেই চলবে। আবার কেউ কেউ ভাবেন, পারিবারিক নাটকে হয়তো ‘ভিউ’ কম হবে। অনেকেই এখন শুধু ভিউ বা সাময়িক জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটছেন। যখন ভিউয়ের পেছনে দৌড়ানো হয়, তখন স্বভাবতই পারিবারিক গল্প কমে যায়। অথচ ভালো পারিবারিক গল্প হলে তা ঠিকই দর্শকের মন জয় করে।

সোহেল আরমান

একটা সময় ছিল যখন আমজাদ হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মামুন বা আতিকুল হক চৌধুরীদের নামে এ দেশে নাটক চলত। লাখ লাখ দর্শক তাদের নাটক দেখতেন। সেখান থেকে আজ আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি! মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় বিনোদনের মাধ্যমও বদলে গেছে। এখন অনেকেই ‘ভাইরাল’ হওয়ার পেছনে ছুটছেন। আমি ‘ভাইরাল’ শব্দটিরই পক্ষে নই, এটি মূলত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়। নেতিবাচক কোনো কিছু সাময়িক জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে সবকিছুর বিচার করা যায় না। এসব নানা কারণেই ধীরে ধীরে পারিবারিক গল্পের নাটক কমে গেছে।

Related Articles

Latest Posts