নদীভাঙন যেভাবে কেড়ে নিয়েছে মন্ডল দম্পতির সামাজিক মর্যাদা

দুপুরের কড়া রোদে ধান শুকাচ্ছিলেন ৬৮ বছর বয়সী সখিনা বেগম। পাশেই বসে ছিলেন স্বামী খতিব উদ্দিন মন্ডল (৭৩)। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছে তাদের রোদে পোড়া শরীর। তারপরও ধানের একেকটি দানা সযত্নে হাঁড়িতে রাখছিলেন এই বৃদ্ধ দম্পতি।

ধান রাখতে রাখতে হঠাৎ থেমে যান সখিনা বেগম। শুকনো ধানে হাত বুলিয়ে যেন অনেক বছর আগের কোনো মাঠে ফিরে যান।

তারপর প্রায় নিঃশব্দে বলে উঠলেন, ‘এ্যালা মোর খুব শখ হয়, কাইও মোক মন্ডলের বউ কয়া ডাকুক…কিন্তু কাইও ডাকায় না।’

কথাটি বলার সময় বৃদ্ধার চোখে জল ছিল না, ছিল শূন্যতা। যেন তিনি একটি সম্বোধন নয়, হারিয়ে যাওয়া পুরো একটি জীবনকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন। যেখানে সবাই তাকে চিনত, মন্ডলের বউ নামে ডাকত।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে কুড়িগ্রামের চর ফকিরের হাট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের কাচকোল গ্রামে মন্ডল বাড়িতে বউ হয়ে গিয়েছিলেন সখিনা বেগম। সেদিন তিনি শুধু স্বামীর বাড়িতে যাননি, পেয়েছিলেন নতুন একটি পরিচয়ও।

সখিনা নামটা ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়েছিল। গ্রামের মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন—‘মন্ডলের বউ’।

আজও সেই দিনের কথা খুব স্পষ্ট তার স্মৃতিতে। বলেন, ‘আগোত যখন মোক মন্ডলের বউ কয়া সবাই ডাকাইছলো, তখন মোর খুব ভাল লাগিছলো।’

তার স্বামী খতিব উদ্দিন মন্ডল তখন এলাকার পরিচিত কৃষক ছিলেন। ১৬ বিঘা উর্বর জমি, ১২ শতাংশের বসতভিটা, বাড়িজুড়ে আম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা ফলের গাছ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই মাঠে থাকত কোনো না কোনো ফসল। গ্রামের মানুষ তাকে চিনত শুধু ‘মন্ডল’ বলেই। আর সখিনা ছিলেন ‘মন্ডলের বউ’।

গ্রামের মানুষের কাছে এটি ছিল একটি সম্বোধন বা ডাক। কিন্তু সেই সম্বোধনের ভেতরে ছিল একজন নারীর সামাজিক অবস্থান, সম্মান, আস্থা আর কৃষক পরিবারের গৃহবধূ হিসেবে তার পরিচয়।

বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর তাকে মাঠে কাজ করতে দেননি স্বামী। বলেন, ‘নয়া বউ মুই। মন্ডলের বউ। এইজন্যে মোর কদর বেশি আছিল।’

তারপর ধীরে ধীরে সেই সংসারের একজন কর্মী হয়ে ওঠেন সখিনা। বাবার বাড়ি থেকেই কৃষিকাজ জানতেন। স্বামীর সঙ্গে জমিতে নামেন, ফসল ফলান, ঘরে তোলেন।

গ্রামের মানুষের সঙ্গে তার তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম সম্পর্ক। অনেকের ভরসার জায়গা ছিলেন তিনি। কারও টাকা দরকার হলে তার কাছে আসতেন। কেউ চাল-ডাল চাইতেন। কেউ তরকারি।

‘মুই কাকো কোন দিন খালি হাতোত ফিরোত দ্যাং নাই’, বলেন সখিনা।

খতিব উদ্দিন বড় কোনো কৃষক ছিলেন না বা তার তেমন প্রতিপত্তি ও ধনসম্পদও ছিল না। তবে ভালো মানুষ ছিলেন। গ্রামের সালিশ বৈঠকে তার ডাক পড়ত।

আবার নারীদের কোনো বিষয় হলে অনেক সময় সখিনার কাছ থেকেও মতামত নিতেন গ্রামের মানুষ।

তিনি শুধু একজন কৃষকের স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন গ্রামের সামাজিক জীবনেরও একজন পরিচিত মুখ।

তবে বর্তমানে চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের সড়কটারী এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধসংলগ্ন খাসজমিতে ছোট্ট একটি ঘরই মন্ডল দম্পতির ঠিকানা।

ব্রহ্মপুত্র তাদের অতীত জীবনের সবটুকু নিয়ে গেছে। গত চার-পাঁচ বছরের ভাঙনে প্রথমে জমি, এরপর বসতভিটা, ফলের বাগান থেকে শুরু করে একে একে সবই হারিয়েছেন মন্ডল দম্পতি।

তাদের যৌথ পরিবার ভেঙেছে। তিন সন্তানের মধ্যে দুই ছেলে এখন ঢাকায় দিনমজুর। মেয়ে চলে গেছেন শ্বশুরবাড়িতে।

খতিব উদ্দিন এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। সেই জমিতে সখিনাও কাজ করেন।

সখিনার মতো গ্রামের আরও অনেকের জমি-ভিটা চলে গেছে নদীর পেটে। সঙ্গে পরিবার ভেঙেছে, চেনা-পরিচিত মানুষগুলোও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে।

সখিনা বলেন, ‘যারা মোক চেনে, তার বেশিভাগ মানুষ গ্রামোত নাই। নদীভাঙার পর ছিটাছিটি হয়া গ্যাইছে।’

তার এই কথায় লুকিয়ে আছে নদীভাঙনের আরেকটি বড় ক্ষতির হিসাব।

২০১৩ সালে ‘রিভিউ অব ইউরোপিয়ান স্টাডিজ’ জার্নালে নদীভাঙনকবলিত নারীদের নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুতির পর নারীরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েন। আগে যে সামাজিক ও নৈতিক সম্পর্কের ভেতর পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতার সুযোগ ছিল, নদীভাঙনের পর তা দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ শুধু জমি বা ঘরবাড়ি নয়, এই সামাজিক পুঁজিও হারায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার মতে, নদীভাঙনে নারীর ক্ষতির জায়গাটি বুঝতে হলে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির দিকে তাকাতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কৃষক বললে কিংবা জমির মালিক বললে আমাদের চোখে সাধারণত একজন পুরুষের ছবিই ভেসে ওঠে। ফলে নদীভাঙনে জমি ও সম্পদ হারানোর বিপন্ন চরিত্র হিসেবে পুরুষই সামনে আসে।’

অধ্যাপক স্নিগ্ধার মতে, দুর্যোগের পর নারীর ক্ষতি শুধু বসতভিটা হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার ও ঘর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা হওয়া দরকার, সেটিও অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।

‘নারীকে ছাড়া যে ঘর তৈরি হয় না, এই আলাপটা আমরা দেখি না,’ বলেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাস্তুচ্যুত করে একটা পরিবারকে, কিন্তু আমাদের সামাজিক রীতিনীতি ও চর্চা একজন নারীকে বাস্তুচ্যুত করে।’

২০২৪ সালে এশিয়ার পরিবেশ ও নগরায়ন বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা ‘সেজ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের ৯৪ শতাংশ বলেছেন, তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বন্ধন ভেঙে গেছে।

ওই গবেষণায় আরও বলা হয়, নদীভাঙন মানুষের সামাজিক ও মানসিক জগতকেও ক্ষতবিক্ষত করে।

নদীভাঙনের শিকার নারীদের নিয়ে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ রিসার্চ ফাউন্ডেশন জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ নারী মনে করেন বাস্তুচ্যুতির পর তাদের সামাজিক মর্যাদা বদলে গেছে। ৬০ শতাংশ বলেছেন, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র পাড়ের সখিনার জীবনেরই গল্পটাও অনেকটা একই রকম। একসময় যে মানুষগুলো নানা কারণে তার কাছে যেত, তারাও এখন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন।

বাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া কৃষিশ্রমিক মোবারক আলী (৬০) এখনো সেই দিনগুলোর কথা ভুলতে পারেন না।

একসময় তিনি মন্ডলের জমিতে কাজ করতেন। বলেন, ‘মন্ডলের জমিতে কাজ করলে পেট ভরে খাওন মিলতো। মন্ডলের বউ শ্রমিকদের খুব সম্মান করতো।’

তার স্ত্রী জাহেদা বেগম (৫২) বলেন, ‘মন্ডলের বউয়ের কথা হামরাগুলা ভুলবার পাই না। হামারগুলা টাকা পাইসা কোনো কিছুর দরকার হইলে হামলা মন্ডলের বউয়ের কাছোং গ্যাছিলোং। হামাকগুলাক কোনোদিন খালিহাতে ফেরত দ্যায় নাই।’

‘এ্যালা মাঝে মধ্যে মন্ডলের বউয়ের সঙ্গে দ্যাখা হয়। দ্যাখা হইলে কান্দি ফ্যালায়। মোরও চোখের পানি বেড়ায়,’ বলেন জাহেদা।

রানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুধু জমি বা ঘরবাড়ি কেড়ে নেয় না। মানুষের সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছুই ভেঙে দেয়।’

অধ্যাপক স্নিগ্ধার মতে, নদীভাঙনের পর পরিবারের সদস্য ও আশপাশের মানুষ অন্যত্র চলে গেলে নারী একা হয়ে যান—পরিবারের ভেতরেও একা, সামাজিকভাবেও একা। এই দ্বিস্তরের একাকিত্ব তার নিজের অবস্থান ও গুরুত্বকেও দুর্বল করে দেয়। ফলে নিজেকে আগের অবস্থানে আর খুঁজে পান না ওই নারী।

এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘যমুনা-মেঘনা নদী ভাঙন নিরসন প্রকল্প’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে আনুমানিক ১০ হাজার হেক্টর জমি ভাঙনের কবলে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে এক লাখেরও বেশি মানুষের ওপর।

নদীভাঙনে কত বিঘা জমি বিলীন হলো, কত পরিবার বাস্তুচ্যুত হলো, কত টাকা ক্ষতি হলো—এসব হিসাব খাতায় লেখা থাকলেও কতজন নারী তাদের সামাজিক পরিচয় হারিয়েছেন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়েছেন সেই হিসাব খুব কমই থাকে। কোথাও লেখা থাকে না, কতজন এখনো অপেক্ষা করে আছেন—কেউ একবার আগের মতো ডাকবে বলে।

সখিনা বেগম সেই হারানোর ভেতরে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করেন। হঠাৎ কোনো পুরোনো মানুষের সঙ্গে মাঠে দেখা হলে, যদি কেউ আগের মতো বলে ওঠে—‘ওই…মন্ডলের বউ…’, তার মুখে তখনো হাসি ফুটে ওঠে। ‘মুই সম্মান বোধ করোং’, বলেন সখিনা।

Related Articles

Latest Posts