এক সপ্তাহ আগেও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফিফা সভাপতি হিসেবে তার অবস্থানকে তখন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বীই মনে হচ্ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই ছবিটাই যেন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার বিতর্কিত পরিকল্পনা এখন শুধু বাতিল হওয়ার গল্প নয়, বরং তা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকেই ঠেলে দিয়েছে গভীর সংকটের মুখে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে ইউরোপ থেকে। ইনফান্তিনোর সবচেয়ে কঠোর সমালোচক উয়েফা বৃহস্পতিবার জানিয়ে দিয়েছে, প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তারা ফিফার সব প্রতিযোগিতা, এমনকি বিশ্বকাপও বয়কট করতে পারে। এরপর শনিবার আরও এক ধাপ এগিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সরাসরি জানায়, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর তাদের আর আস্থা নেই।
তবে শুধু উয়েফাই নয়, ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও। উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফ, যারা ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে ইনফান্তিনোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল, ফিফার নেতৃত্ব নিয়ে ‘পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার’ আহ্বান জানিয়েছে।
আরও বড় ধাক্কা এসেছে এশিয়া থেকে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বা এএফসির বহু দেশ এতদিন ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল। তারাও এবার প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। এর মধ্যেই ইনফান্তিনো হারিয়েছেন তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকেও। প্রথমে পদত্যাগ করেছেন তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো। এরপর সরে দাঁড়িয়েছেন প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামোর।
শনিবার ভোরে ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত নিজের বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে পিছু হটার ঘোষণা দেন। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বরং উয়েফা আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে জানিয়ে দেয়, ফিফা সভাপতির ওপর তাদের আস্থা নেই। ফলে এখন বিশ্ব ফুটবলে কার্যত দুই পক্ষের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। প্রশ্ন একটাই, ইনফান্তিনো কি টিকে থাকতে পারবেন, নাকি তাকে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতেই হবে?
ইনফান্তিনোর বিদায়ের সবচেয়ে সহজ পথ অবশ্যই তার নিজের পদত্যাগ। ২০১৫ সালে দুর্নীতি কেলেঙ্কারির মধ্যে তার পূর্বসূরি সেপ ব্লাটারও শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ইনফান্তিনো এখনই সরে দাঁড়াবেন, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং তিনি আগামী মার্চ পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারেন। ওই সময় ফিফা সভাপতির চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার কথা তার।
তবে তার আগেই ফিফার অভ্যন্তরীণ কাঠামো থেকে চাপ তৈরি হতে পারে। ফিফা কাউন্সিলের ৩৭ সদস্যের মধ্যে ১৯ জন জরুরি বৈঠকের দাবি জানালে এমন একটি সভা আয়োজন করতেই হবে। সেই বৈঠক দুই সপ্তাহের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে কাউন্সিল ইনফান্তিনোকে পদত্যাগের আহ্বান জানাতে পারে। যদিও তিনি সেই আহ্বান মানতে বাধ্য নন, তবে এমন পরিস্থিতি তার ওপর রাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এরপর আরও বড় অস্ত্র রয়েছে ফিফার সদস্য দেশগুলোর হাতে। ২১১ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৪৩টি দেশ লিখিতভাবে আবেদন করলে বিশেষ কংগ্রেস ডাকা সম্ভব। উয়েফার সদস্য দেশই ৫৫টি হওয়ায় চাইলে ইউরোপ একাই সেই প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। তবে এমন কংগ্রেস আয়োজন করতে অন্তত দুই মাস সময় লাগবে, বাস্তবে তিন মাসও লেগে যেতে পারে। সেই কংগ্রেস কার্যত হয়ে উঠতে পারে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আস্থাভোট। তাকে সরাতে প্রয়োজন হবে ১০৬ ভোট। আর এখানেই শুরু হচ্ছে সবচেয়ে বড় অঙ্কের খেলা।
ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে উয়েফার হাতে ৫৫ ভোট। আফ্রিকার ৫৪, এশিয়ার ৪৬, কনকাকাফের ৩৫, ওশেনিয়ার ১১ এবং দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবলের ১০ ভোট রয়েছে। আফ্রিকা, কনমেবল ও ওশেনিয়া এখনো ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার প্রকাশ্য সমালোচনা করেনি। ফলে উয়েফা ও তার বিরোধীদের জন্য ১০৬ ভোট জোগাড় করা মোটেও সহজ হবে না।
আরও একটি বিষয় তাদের কাজ কঠিন করে তুলেছে। মোট ১৩৬টি দেশ বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করলেও কোনো প্রস্তাবের বিরোধিতা করা আর ফিফা সভাপতিকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়া এক বিষয় নয়। যেমন কাতার ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কনকাকাফের যৌথ বিবৃতি থেকেও মেক্সিকো নিজেদের কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়েছে।
তাই ইনফান্তিনোকে সরানোর লড়াইয়ে শুধু ভোট নয়, একজন গ্রহণযোগ্য বিকল্প প্রার্থীও প্রয়োজন হবে। ২০১৯ ও ২০২৩ সালে ইনফান্তিনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার কেউ তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইলে প্রার্থিতা ঘোষণার শেষ সময় ১৮ নভেম্বর।
ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় সমালোচকদের যদি নির্বাচনের পথেই যেতে হয়, তাহলে এমন একজন প্রার্থী দরকার যিনি শুধু ইউরোপ নয়, এশিয়া, আফ্রিকা ও কনকাকাফের দেশগুলোর কাছ থেকেও সমর্থন আদায় করতে পারবেন। কারণ ইউরোপের কোনো প্রার্থীকে সামনে আনা হলে সেটিকে ফিফার ওপর ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবেও দেখা হতে পারে।
এই দৌড়ে সবচেয়ে সম্ভাব্য নাম হিসেবে সামনে আসছে কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তাগলিয়ানি। ২০১৬ সালে ইনফান্তিনোর মতো তিনিও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কানাডা ফুটবলের সাবেক সভাপতি মন্তাগলিয়ানি ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজন ও বাস্তবায়নের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, ইতালিয়ান ও স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ হওয়ায় বৈশ্বিক পর্যায়ে তার যোগাযোগের সক্ষমতাও রয়েছে।
আরেকটি সম্ভাব্য নাম এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা। ২০১৩ সালে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদের জন্য চতুর্থবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এএফসির কঠোর অবস্থানেও তার অনুমোদন ছিল। এশিয়ার ৪৬টি দেশের অনেকেই জানে, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত অর্থ তাদের ফুটবল বাজেটের তুলনায় কতটা বড় হতে পারে। ফলে তাদের সমর্থন আদায় করাও সহজ হবে না।
তবে তুলনামূলক কম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন প্যারিস সেন্ট জার্মাঁর সভাপতি নাসের আল খেলাইফি। কাতারি এই ফুটবল কর্তা একই সঙ্গে ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর সংগঠনের প্রধান। ইউরোপীয় সুপার লিগের ভয়াবহ সংকটের সময় ইউরোপীয় ফুটবলকে আবার একত্রিত করার ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কাগজে-কলমে তিনি ইনফান্তিনোর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি নিজে এই দায়িত্বে আসতে আগ্রহী, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। তার ওপর কাতারের ইনফান্তিনো-সমর্থনও বড় বাধা হতে পারে।
সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠান হলে এমন পরিস্থিতিতে ইনফান্তিনোর পদে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু ফুটবল কোনো স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান নয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১৫ সালের সেপ ব্লাটার। দুর্নীতি কেলেঙ্কারির তীব্র চাপের মধ্যেও পদত্যাগের আগে তিনি পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
ইনফান্তিনো অবশ্য এখনো লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। শনিবারের বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে সব পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ, নিজের ভুল স্বীকার করে পরিস্থিতি শান্ত করার কৌশলেই এগোতে চাইছেন তিনি।
সেই কৌশল কিছুটা কাজও করতে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে। কাতারের পর ২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মরক্কোও শনিবার সন্ধ্যায় ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মিসরও তার বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
ইনফান্তিনোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভরসা সময়। আস্থাভোট হলে ১০৬ ভোট প্রয়োজন। সেই ভোট এখনই হচ্ছে না। হাতে অন্তত কয়েক মাস সময় রয়েছে। এই সময়ে তিনি যদি একের পর এক সদস্য দেশকে নিজের পাশে ফিরিয়ে আনতে পারেন, তাহলে তাকে সরানোর উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
অন্যদিকে উয়েফার সামনে এখন একটাই লক্ষ্য, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে ইনফান্তিনোর সামনে পদত্যাগ ছাড়া আর কোনো পথ না থাকে। আর তার জন্য বিশ্বজুড়ে ফিফার সদস্য দেশগুলোর সমালোচনা অব্যাহত রাখা জরুরি।
তবে ইনফান্তিনোর জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ তৈরি হতে পারে ফুটবলের মাঠের বাইরে। বড় বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যদি ফিফা থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ২০১৫ সালের ফিফা কেলেঙ্কারির সময় সনি, এমিরেটস, ক্যাস্ট্রল, কন্টিনেন্টাল টায়ার্স ও জনসন অ্যান্ড জনসনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বড় স্পনসরশিপ চুক্তি থেকে সরে গিয়েছিল।
এখনো অবশ্য তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ইনফান্তিনোর জন্য সংকট যে শেষ হয়নি, সেটি স্পষ্ট। একদিকে উয়েফার প্রকাশ্য অনাস্থা, অন্যদিকে কনকাকাফ ও এএফসির অসন্তোষ, সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের পদত্যাগ মিলিয়ে ফিফা সভাপতির সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক লড়াই।

