কামড়ের দাগ, অভিশাপের শুরু

জর্জিও কিয়েল্লিনি যখন জার্সির কলার টেনে নামিয়ে রেফারিকে ঘাড় দেখাচ্ছিলেন, তখন দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো বাচ্চা স্কুলে শিক্ষকের কাছে অভিযোগ করতে এসেছে। ইতালির এই মহাকায় ডিফেন্ডার, যে মানুষটা ক্যারিয়ার জুড়ে ফরোয়ার্ডদের গলায় ছুরি ধরে খেলেছেন রূপকার্থে, সেদিন তিনি নিজেই এক নীরব শিকার। এবং সেই শিকারির দাঁতের দাগ তার কাঁধে।

২০১৪ বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের নাতাল শহর। এস্তাদিও দাস দুনাস। গ্রুপ ডি-র শেষ ম্যাচে মুখোমুখি ইতালি আর উরুগুয়ে।

দুই দলের জন্যই ম্যাচটা ছিল টিকে থাকার লড়াই। একটা জিতলে যাবে, একটা যাবে বাড়ি। স্নায়ুক্ষয়ী এই প্রবল চাপের মাঝেই ৭৮তম মিনিটে ঘটে গেল সেই অবিশ্বাস্য আর উদ্ভট কাণ্ড।

লুইস সুয়ারেজ। বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। সৌন্দর্য আর পৈশাচিকতা যে মানুষটার মধ্যে একইসাথে বাস করে, ফুটবল মাঠে তিনি যেন দুই সত্তার সংমিশ্রণ। সেদিন আচমকাই তার ভেতরের সেই পৈশাচিক সত্তাটি জেগে উঠল। কিয়েল্লিনির সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে শারীরিক শক্তি পরীক্ষার সেই মুহূর্তে সুয়ারেজ হঠাৎ ঝুঁকে পড়লেন, আর হিংস্রভাবে কামড়ে ধরলেন ইতালীয় দেয়ালকে।

টেলিভিশনের ক্যামেরা প্রথমটায় ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, আদতে কী ঘটেছে সেখানে। কিয়েল্লিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে করলেন সেই অবিস্মরণীয় কাজটি। গায়ের জার্সি টেনে নামিয়ে নিজের কাঁধে বসে যাওয়া দাঁতের দাগ দেখালেন রেফারিকে। তার চোখেমুখে যেন বিস্ময় আর অবিশ্বাসের ভাষা, ‘দেখুন, এক জলজ্যান্ত মানুষ আমাকে কামড়ে দিয়েছে!’

রেফারি দেখলেন। এবং কিছুই করলেন না।

এই একটা সিদ্ধান্ত, বা বলা ভালো, এই একটা নিষ্ক্রিয়তা, সেদিন ফুটবলবিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। পকেট থেকে বের হলো না কোনো কার্ড, জুটল না কোনো শাস্তি। খেলা চলল নিজস্ব গতিতে। উরুগুয়ে ম্যাচটা জিতে নিল ১-০ গোলে। আর বুকভরা আক্ষেপ নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ইতালি।

সুয়ারেজের শাস্তি অবশ্য এসেছিল পরে, এবং তা বেশ কঠোরভাবেই। নয়টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা, চার মাস ফুটবল থেকে দূরে থাকার আদেশ। কিন্তু ততক্ষণে ইতালির ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। মাঠ ছেড়ে চলে গেছেন কিয়েল্লিনি, পিরলো, বুফোন; সেই প্রজন্মের কিংবদন্তিরা।

গল্পটা যদি এখানেই শেষ হতো, তবে এটি হয়তো ফুটবলের ইতিহাসের নিছকই একটি বিচিত্র ঘটনা হয়ে থাকত। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা এই গল্পকে রূপ দিল এক করুণ মহাকাব্যে।

২০১৮ বিশ্বকাপ। ইতালি নেই।

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সুইডেনের কাছে হেরে বিদায়। ষাট বছরে প্রথমবার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল আজ্জুরিরা। রাশিয়ার মাঠে সেই নীল জার্সি ছাড়াই হলো বিশ্বকাপ। বুফোন কাঁদলেন। একটা প্রজন্মের স্বপ্ন মাটিতে মিশে গেল।

২০২২ বিশ্বকাপ। ইতালি আবারও নেই।

এবার উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে হার। প্লেঅফে, শেষ মুহূর্তে। ইতালির সর্বকালের অন্যতম সেরা দলগুলোর একটি, ২০২১ ইউরো চ্যাম্পিয়ন, কাতারের মাটি স্পর্শ করতে পারল না। ফুটবলের ইতিহাসে এই হারকে বলা হয় অন্যতম বৃহত্তম এক ট্র্যাজেডি। বিশ্বাস হচ্ছিল না, তবু করতে হয়েছিল।

এরপরও ইতালি ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। নতুন কোচ, নতুন পরিকল্পনা, নতুন প্রজন্ম। জেনারো গাত্তুসো, যিনি নিজে ২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ ছিলেন, দায়িত্ব নিলেন দলের। ময়েজ কিন গোল করতে লাগলেন ধারাবাহিকভাবে। আলেসান্দ্রো বাস্তোনি, দোনারুম্মার মতো তারকারা মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ালেন। মনে হচ্ছিল, এবার হয়তো হবে।

মার্চের শেষ রাত। বসনিয়া হার্জেগোভিনার শহর জেনিতসা। প্লে-অফ ফাইনাল। ১৫তম মিনিটে কিন দুর্দান্ত কার্লিং শটে এগিয়ে দিলেন ইতালিকে। মনে হলো আজ হয়তো হবে, আজ হয়তো বারো বছরের অভিশাপ ভাঙবে।

কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। ৪২তম মিনিটে বাস্তোনি দেখলেন লাল কার্ড। দশজনের দলে পরিণত হলো ইতালি। বাকি প্রায় এক ঘণ্টা, তারপর অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুচাপ, এরপর টাই-ব্রেকার। সবটুকু পথ তারা লড়ল একজন কম নিয়ে।

দোনারুম্মা লড়লেন। বাঁচালেন। কিন্তু ইতালির কিকাররা পারলেন না। চারটি পেনাল্টিতে মাত্র একটি গোল। বসনিয়া নিশ্চিত করল ৪-১-এ। এসমির বাইরাক্তারেভিচের শেষ কিকের সাথে সাথে জেনিতসার স্টেডিয়াম ফেটে পড়ল আনন্দে।

২০২৬ বিশ্বকাপ। আরও একবার নেই ইতালি।  

ইতালির ড্রেসিং রুমে সেই মুহূর্তে কেমন নীরবতা ছিল, তা আর জানার উপায় নেই। কিন্তু অনুমান করা যায়।

কিয়েল্লিনি নিজে সেই কামড়ের কথা পরে বলেছিলেন হাসতে হাসতে। বলেছিলেন, জীবনে অনেক কঠিন ট্যাকেল সামলেছেন, কিন্তু দাঁতের আঘাত সামলানোর ট্রেনিং কেউ দেয়নি। তার সেই রসবোধ, তার সেই পরিপক্কতা, কিন্তু সেই রাতের ম্যাচের ফলাফল বদলাতে পারেনি কিছুই।

ইতিহাস বলছে, চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি এখন এমন একটি দেশ যারা পরপর তিনটি বিশ্বকাপে অনুপস্থিত। এই রেকর্ড আগে কোনো বিশ্বকাপজয়ী দেশের ছিল না। ইতালিই প্রথম।

বারো বছর। তিনটি বিশ্বকাপ। একটিতেও নেই।

২০১৪-এ শেষবার যে মাঠে খেলেছিল ইতালি, সেই ম্যাচে একজন মানুষ জার্সি সরিয়ে দাঁতের দাগ দেখিয়েছিলেন। সেই দাগ শরীর থেকে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও যেন থেকে গেছে, ইতালির ভাগ্যের গায়ে, অদৃশ্য কিন্তু অমোচনীয়।

কিয়েল্লিনি এখন অবসরে। বুফোন অনেক আগেই থেমে গেছেন। পিরলো কোচিং করছেন। যে প্রজন্ম সেই রাতে মাঠে ছিল, তারা কেউ আর নেই জাতীয় দলে।

তবু অভিশাপ থেকে গেছে।

কারণ ফুটবলে কিছু মুহূর্ত শুধু খেলা থাকে না। কিছু মুহূর্ত হয়ে ওঠে প্রতীক, হয়ে ওঠে বাঁকবদলের নিশান। ২০১৪-এর সেই কামড়, সেই জার্সি টেনে ধরা, সেই অবিশ্বাসী চোখ, সবটা মিলিয়ে একটা গল্পের শুরু হয়েছিল যেদিন, সেই গল্পের শেষ এখনও লেখা হয়নি।

হয়তো লেখা হবে। হয়তো কোনো একদিন ইতালি আবার বিশ্বকাপে ফিরবে, এবং সেদিন কেউ একজন মনে করিয়ে দেবে, এই দলটা তিনটে বিশ্বকাপ দেখেছে টেলিভিশনে, ঘরে বসে।
 

Related Articles

Latest Posts