ইরাকেও হামলা করেছিল সৌদি আরব, গোপনে আমিরাত গিয়েছিলেন নেতানিয়াহু

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুধু তেহরান ও তেল আবিব কিংবা ওয়াশিংটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, সংঘাতের আগুন নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে।

এই যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব গোপনে ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে এবং একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফর করে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। এর মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করে, যদিও সেসবের বড় অংশ জনসমক্ষে আসেনি।

ইরাকে সৌদি হামলা

একাধিক ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা, পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে অবগত সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, সৌদি যুদ্ধবিমান ইরাকের উত্তর সীমান্তঘেঁষা এলাকায় তেহরান-ঘনিষ্ঠ শিয়া মিলিশিয়াদের ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এসব ঘাঁটি থেকে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির সময়ের আশপাশেও কিছু হামলা হয়েছিল। একই সময়ে কুয়েত থেকেও ইরাকের অভ্যন্তরে রকেট হামলার ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ ইরাকে চালানো এক হামলায় কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হন এবং ইরান-সমর্থিত কাতাইব হিজবুল্লাহর একটি যোগাযোগ ও ড্রোন পরিচালনা কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়।

যদিও কুয়েত থেকে ছোড়া রকেট কুয়েতি বাহিনী নাকি সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের পক্ষ থেকে ছোড়া হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মার্কিন সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

সরাসরি ইরানেও হামলা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব প্রথমবারের মতো সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডেও হামলা চালায়। সৌদি ভূখণ্ডে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। একই ধরনের হামলা চালায় আমিরাতও।

সব সূত্রের দাবি, উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ছোড়া শত শত ড্রোনের বড় অংশই ইরাক থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে মিলিশিয়া-ঘনিষ্ঠ টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলো সৌদি আরব, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে হামলার দায় স্বীকার করে পোস্টও দেয়।

ক্রমাগত হামলায় বিরক্ত হয়ে সৌদি আরব ও কুয়েত আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। যুদ্ধ চলাকালে কুয়েত তিনবার ইরাকের প্রতিনিধিকে তলব করে এসব হামলার প্রতিবাদ জানায়। অন্যদিকে সৌদি আরবও ১২ এপ্রিল ইরাকি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে।

পুরোনো অবিশ্বাস, নতুন সংঘাত

উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরাকের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই অবিশ্বাসপূর্ণ। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণের পর থেকে সেই অবিশ্বাস আরও গভীর হয়। পরে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের পর তেহরান-ঘনিষ্ঠ শিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়তে থাকে। ফলে ইরাক ধীরে ধীরে ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।

২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, চলমান যুদ্ধ তা মারাত্মকভাবে নড়বড়ে করে দিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো যে সংঘাত এড়িয়ে চলতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই সংঘাতেই জড়িয়ে পড়তে হয়েছে তাদের।

গোপনে আমিরাত সফরে নেতানিয়াহু

এদিকে একই যুদ্ধের সময় আরেকটি কূটনৈতিক নাটকীয়তার খবর সামনে এসেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করেছে, তিনি যুদ্ধ চলাকালে গোপনে আমিরাত সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

তবে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছে। দেশটির ভাষ্য, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ‘সর্বজনবিদিত’ এবং ‘অস্বচ্ছ বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে নয়’। অঘোষিত সফর বা গোপন সমঝোতার যেকোনো দাবি ভিত্তিহীন বলেও জানানো হয়।

তবু বৈঠক সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ২৬ মার্চ ওমান সীমান্তঘেঁষা আল-আইন শহরে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেছিলেন নেতানিয়াহু ও শেখ মোহাম্মদ। একই সূত্রের দাবি, ইরান যুদ্ধ চলাকালে সামরিক সমন্বয়ের জন্য মোসাদ প্রধান ডেডি বারনিয়াও অন্তত দুবার আমিরাত সফর করেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে আমিরাত

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের সময় হামলার মুখে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পথে হাঁটছে আমিরাত। ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর থেকে আবুধাবি এই সম্পর্ককে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করছে।

মঙ্গলবার ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি জানান, যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েল আমিরাতে আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাটারি এবং তা পরিচালনার জন্য জনবল পাঠিয়েছিল।

ইরানের পাল্টা হামলায় আমিরাতের বেসামরিক অবকাঠামো ও জ্বালানি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পাইপলাইন থাকায় আমিরাত তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তবু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ দেশটির বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Related Articles

Latest Posts