তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পকে শি-র হুঁশিয়ারি, চীনই ‘একমাত্র ঝুঁকি’ বলল তাইপে

তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যু ‘ভুলভাবে মোকাবিলা’ করা হলে তা দুই পরাশক্তিকে সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এএফপি বলছে, আজ বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে দুই নেতার বৈঠকের শুরুতেই তাইওয়ান ইস্যুকে সামনে আনেন শি জিনপিং। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান প্রশ্নই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

শি আরও বলেন, ‘এটি ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সরাসরি সংঘাতেও পৌঁছাতে পারে। এতে পুরো চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ে যাবে।’

উষ্ণ অভ্যর্থনার আড়ালে উত্তেজনা

প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটি প্রথম চীন সফর। বেইজিংয়ে পৌঁছে ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্টকে ‘মহান নেতা’ ও ‘বন্ধু’ বলে প্রশংসা করেন এবং দুই দেশের ভবিষ্যৎকে ‘চমৎকার’ বলে উল্লেখ করেন।

এর আগে, চীনের রাজধানীর গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ট্রাম্পকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সামরিক ব্যান্ড, গান স্যালুট ও স্কুল শিক্ষার্থীদের স্বাগতধ্বনিতে জমকালো পরিবেশ তৈরি হয়।

তবে কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যেও শি জিনপিং স্পষ্ট করে দেন, দুই দেশকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ হতে হবে। একইসঙ্গে তিনি প্রাচীন গ্রিক রাজনৈতিক তত্ত্ব ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, উদীয়মান শক্তি ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই যুদ্ধ ডেকে আনে।

তাইওয়ান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

স্বশাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। বেইজিং বহুবার বলেছে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও তারা তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে শুধু বেইজিংকেই স্বীকৃতি দিলেও নিজস্ব আইনের অধীনে তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে, যাতে দ্বীপটি আত্মরক্ষা করতে পারে।

এবারের বৈঠকের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়েও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে কিছুটা ভিন্ন, কারণ ওয়াশিংটন সাধারণত এ বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে না।

‘চীনই একমাত্র ঝুঁকি’

শি জিনপিংয়ের বক্তব্যের পরপরই তাইপে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ‘একমাত্র ঝুঁকি’ হচ্ছে চীন।

তাইওয়ানের ভাষ্য, চীনের সামরিক তৎপরতা, নিয়মিত সামরিক মহড়া এবং তথাকথিত ‘গ্রে-জোন’ কর্মকাণ্ডই এই অঞ্চলের জন্য প্রধান হুমকি। একইসঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাইওয়ানের পক্ষে কথা বলার কোনো অধিকার বেইজিংয়ের নেই।

তাইপে আরও দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বারবার তাদের প্রতি ‘স্পষ্ট ও দৃঢ় সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বিশ্লেষকদের চোখে বার্তা

চীনবিষয়ক নিউজলেটার চায়না নেইকানের সম্পাদক অ্যাডাম নিই এএফপিকে বলেন, চীনা পররাষ্ট্রনীতিতে কড়া ভাষা নতুন কিছু নয়, তবে শি জিনপিংয়ের মুখে এ ধরনের সরাসরি সতর্কতা বিরল।

তার ভাষায়, ‘শি খুব স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাইওয়ান ইস্যুই দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্ভাব্য বিস্ফোরক পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু।’

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক চং জা ইয়ান বলেন, সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকের আগে থেকেই চীন তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু ছাড় আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। তার মতে, বেইজিং হয়তো মনে করছে, ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাণিজ্য, ইরান ও প্রযুক্তি নিয়েও আলোচনা

তাইওয়ানের পাশাপাশি বৈঠকে ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, বিরল খনিজ রপ্তানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলোও উঠে আসে।

ট্রাম্প বলেন, ইরান নিয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ‘দীর্ঘ আলোচনা’ হবে। যদিও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চীনের সহায়তা প্রয়োজন নেই।’

দুই নেতা পরে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করেন এবং রাতে তাদের রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

Related Articles

Latest Posts