মধ্যপ্রাচ্যের একটা ‘সম্ভাব্য’ সংকটের সংবাদ দিয়ে শুরু করা যাক। তেলসমৃদ্ধ ইরাক নিজ দেশে জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপড়েনে পড়েছে। একটি দেশ নিজেদের নেতা ঠিক করতে নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ডিসির অনুমোদনের ওপর।
কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন—তার পছন্দমত প্রধানমন্ত্রী ইরাকে না আসলে তিনি মার্কিন ফেডারেল ব্যাংকে রাখা বাগদাদের তেল বিক্রির টাকা ইরাকি সরকারের কাছে পাঠানো বন্ধ করে দেবেন।
সম্প্রতি, সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরাকের নেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সহায়তা না দিলে ইরাকের সাফল্য, সমৃদ্ধি বা স্বাধীনতা ধরে রাখার কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
মোটা দাগে—এটি হচ্ছে ‘পেট্রোডলার’-এর প্রভাব।
এমন ভাগ্য শুধু ইরাকের নয়, অন্যান্য তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রেও কমবেশি প্রযোজ্য।
বিশ্ববাণিজ্যে পেট্রোডলার বহুল ব্যবহৃত শব্দ। মূলত মার্কিন ডলারের বিনিময়ে পেট্রোলিয়াম বা তেল কেনার বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতাই পরবর্তীতে ‘পেট্রোডলার চুক্তি’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
সেই সমঝোতা চুক্তি অনুসারে, সৌদি আরব তাদের পেট্রোলিয়াম বিক্রির মুনাফা দিয়ে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনবে। বিনিময়ে, যুক্তরাষ্ট্র মিত্র সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা সহায়তা দেবে।
এমন সমঝোতার ফলে বৈশ্বিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য দেখা দেয়। গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। তবে সেই আধিপত্য আর কতদিন টিকবে—সেই প্রশ্নই গত কয়েক বছর ধরে ঘুরেফিরে আসছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
ব্রাজিল-রাশিয়া-ভারত-চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত আন্তঃসরকার সংগঠন ‘ব্রিকস’-এর সদস্য সংখ্যা ৫ থেকে বেড়ে এখন ১১ হয়েছে। আন্তর্জাতিক-সম্পর্ক বিষয়ে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘পেট্রোডলারের দিন কি শিগগির শেষ হচ্ছে?’—প্রতিবেদনে বলা হয়, ডলার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাপট আগের তুলনায় বর্তমানে দুর্বল হয়েছে।
ব্রিকসে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া থেকে নতুন নতুন দেশ যোগ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের ব্যবহার কমানোর দাবি তোলা হচ্ছে। এমন দাবি আসছে মূলত মার্কিন-আধিপত্যবাদবিরোধী দেশগুলোর পক্ষ থেকে।
প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্ববাণিজ্যে লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের একাধিপত্যে ভাটার টান শুরু হয়েছে বলে জনমনে সৃষ্ট ধারণা দিনে দিনে প্রবল হচ্ছে। বিশেষ করে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম পরিশোধ ও পেট্রোডলার ব্যবহারে নিম্নগতির কারণে এমন ভাবনার ‘ভরা’ জোয়ার দেখা যাচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, বৈশ্বিক জিডিপি বিবেচনায় ১৯৬০ এর দশকে ডলারের প্রভাব ৪০ শতাংশ থেকে বর্তমানে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ক্রয় ক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ চীন এগিয়ে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, এমন দেশগুলোর মধ্যে ডলারবিরোধিতা এখন প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে।
এমনকি, অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজেদের মতো করে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সেসব দেশকে দুর্বল করতে তাদের ওপর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিচ্ছে।
ইতিহাস বলছে—১৯৫৫ সালে ভিয়েতনামে শুরু হওয়া যুদ্ধ চলে প্রায় ২০ বছর। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেওয়ায় ১৯৬০ এর দশকে আটলান্টিকের পশ্চিমপারের সমৃদ্ধ দেশটির অর্থনীতি ব্যাপক চাপে পড়ে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—১৯৭১ সালে স্বর্ণের ওপর ভিত্তি করে ডলারের দাম নির্ধারণের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে যায়। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর মুদ্রার মান খোলা বাজারে নির্ধারিত হতো।
সে বছর আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে তেল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের কাছে তেল বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিলে এক নতুন অর্থব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে পুরো বিশ্ব।
১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে নিমজ্জিত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগের আগে সৌদি আরবের সঙ্গে এক অঘোষিত সমঝোতায় পৌঁছান। বৈশ্বিক জ্বালানি-বাণিজ্যের কেন্দ্রে থাকা সৌদি আরবকে মার্কিন ডলারের বিনিময়ে তেল বিক্রি ও মুনাফার অর্থ দিয়ে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনতে রাজি করায় যুক্তরাষ্ট্র।
বিনিময়ে রিয়াদকে সার্বিক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দেয় হোয়াইট হাউস।
এর ফলে, বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের দাম স্থিতিশীল হয়।
সেই ঐতিহ্য এখনো সমান তালে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে বেশিরভাগ তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ দেশকে ডলারের বিনিময়ে তাদের খনিজপণ্য বিক্রি করতে হয়। শুধু তাই নয়, সেই অর্থ জমা রাখতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে।
এর অন্যথা কিছু হলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্যেনদৃষ্টি পড়ে সেসব দেশের ওপর। নেমে আসে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে সামরিক অভিযান। গত জানুয়ারিতে এমন এক সামরিক অভিযান নেমে এসেছিল দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলার ওপর। ওভাল অফিসের ‘কথা’ না শোনায় কারাকাস থেকে সে দেশের রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসে মার্কিন সেনারা।
আর অতি সম্প্রতি, ইরাকে সরকার গঠনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের কথা আবারও স্মরণ করা যেতে পারে।
মার্কিন ডলারের দাপট কমানোর ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে এখন প্রথমেই আসছে চীনের নাম। গত ৪ ফেব্রুয়ারি সিএনএন-এর এক সংবাদের শিরোনাম করা হয়—‘ডলারের দাপট কমাতে চীনের পরিকল্পনা প্রকাশ। তবে তা কখনো কাজে আসবে কি?’
প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক দাপট দেখানো ডলারের বর্তমান দুরবস্থার সুযোগ নিতে চায় বেইজিং। বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগটি কাজে লাগাতে চায় মহাপ্রাচীরের দেশটি।
এতে আরও বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বিশ্বরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় ‘অরাজকতা’ শুরু হয়। ক্রমশ সেই অস্থিরতা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ববাজারে ডলারের দাম গত ৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমন বাস্তবতায় বিনিয়োগকারীরা এখন টাকা ঢালছে স্বর্ণের পেছনে। তাই দেশে দেশে স্বর্ণের দাম এখন নতুন নতুন রেকর্ড করে যাচ্ছে।
এই সুযোগে চীন নিজেদের মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের বিকল্প বিনিময় মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদন অনুসারে—চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির এক জার্নালে চীনের মুদ্রাকে বিশ্ব-মুদ্রা হিসেবে হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার বিষয়ে দেশটির রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে যে ভূমিকা মার্কিন ডলার পালন করে যাচ্ছে, সেই ভূমিকায় আসতে চায় চীনের মুদ্রা আরএমবি বা ইউয়ান।
বৈশ্বিক পর্যায়ে আর্থিক লেনদেনের সিংহভাগ এখনো মার্কিন ডলারের মধ্যমে সম্পন্ন হয়। এই মার্কিন মুদ্রাকেই এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের ও বিনিয়োগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
শিগগির যেকোনো সময় পরিস্থিতি পালটে যেতে পারে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে গত বছর জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর ডলারের দাম কমে যাওয়ার ঘটনা নতুন বাস্তবতার জন্ম দিতে যাচ্ছে, বলে মত বিশ্লেষকদের।
চীনা জার্নাল ‘চোষার’-এর প্রতিবেদন অনুসারে রাষ্ট্রপতি শি বলেছেন যে, চীন আশা করছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিনিময়যোগ্য একটি শক্তিশালী মুদ্রা প্রতিষ্ঠিত করা হোক।
এ জন্য তিনি একটি শক্তিশালী ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ গড়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান।
সংবাদ প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়—২০১৮ সালে শুরু হয়েছে পেট্রোডলারের বিকল্প ‘পেট্রোইউয়ান’ নিয়ে আলোচনা। অর্থাৎ, ডলারের পাশাপাশি চীনের মুদ্রা ইউয়ান দিয়ে তেল-গ্যাস কেনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি দ্য নিউইয়র্কারের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়, ‘ট্রাম্প কিভাবে ডলারের অবনতি ঘটাচ্ছেন এবং মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যে ক্ষয় ধরাচ্ছেন’।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, গ্রিনল্যান্ডসহ অন্যান্য বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি অনেক বিদেশিকে ডলারের পেছনে বিনিয়োগ করতে দুইবার ভাবাচ্ছে।
নিউইয়র্কের করনেল ইউনিভার্সিটি ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অর্থনীতিবিদ ঈশ্বর প্রসাদ সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইউরোপীয়রা এখন যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে আর বিশ্বাস করে না। সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়েও না।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্ববাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের দীর্ঘদিনের অবস্থান নিয়ে নতুন নতুন প্রশ্ন ওঠছে।
দ্য নিউইয়র্কার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—জার্মানির অন্যতম শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডয়েচে ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন শাখার প্রধান জর্জ সারাভেলোসের মতে, ইউরোপীয়রা যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে কম আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
ইউরোপের বন্ড বাজার নানা ভাগে বিভক্ত। চীনের বন্ড বাজার বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম। তবে সেখানে বিনিয়োগ করা ভূ-রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকে।
অর্থনীতিবিদ ঈশ্বর প্রসাদের ভাষ্য: ‘আপনি যদি কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চান তাহলে ডলারের বাইরে যেকোনো খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু, তা যদি কয়েক শ বিলিয়ন ডলার হয় তাহলে বিনিয়োগের জন্য ডলার ছাড়া নিরাপদ খাত আসলেই নেই।’
গত ৪ ফেব্রুয়ারি সিএনএন-এর সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—বাস্তবতা হচ্ছে চীনা মুদ্রাকে বৈশ্বিক মুদ্রা হয়ে ওঠতে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। আইএমএফ-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়, ২০২৫ সালে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ক্ষেত্রে ডলারের অবদান ৫৭ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে ইউরোর অবদান ২০ শতাংশ ও আরএমবির অবদান ২ শতাংশ।
তাই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন—ডলারের গুরুত্ব রাজনৈতিক কারণে এখন কিছুটা কমলেও এর দাপট সহসাই শেষ হচ্ছে না।

