সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে নাগরিক অধিকার আদায় করতে চান ভোটাররা

বান্দুরার হাসনাবাদ গ্রামের পবিত্র জপমালা রাণীর গির্জার পাশেই বাসা তেরেজা হিল্ডা গোমেজ পরিবারের। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তার বেশ আগ্রহ থাকলেও, কোনো প্রার্থীর সঙ্গে তার এখন পর্যন্ত দেখা হয়নি। তেমন প্রচার-প্রচারণাও চোখে পড়েনি তার। 

গির্জার পাশের সেন্ট জোসেফ টিউটোরিয়ালের প্রধান শিক্ষক হিউবার্ট যোসেফ গোমেজ দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকায় প্রায় দেড় হাজার খ্রিষ্টান পরিবারের বাস, যার মধ্যে হাসনাবাদে আছে প্রায় সাড়ে ৩০০ পরিবার।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কাকে ভোট দিলে তাদের ও এলাকার সার্বিক উন্নতি হতে পারে—তা নিয়ে ইদানিং প্রায়ই আলোচনা হয় পরিবারগুলোর মধ্যে।

এলাকায় মুসলিম-হিন্দু-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আছে বলে জানান হিউবার্ট। তবে, রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

নবাবগঞ্জ উপজেলার হাসনাবাদ থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে দোহার থানাধীন রাইপাড়া গ্রামে গেলেই বিভিন্ন ঘর থেকে কানে আসে তাঁতের খটখট শব্দ। তিন পুরুষ ধরে চলে আসা তাঁতের কাজ থেকে বের হতে পারেননি বাদশাহ মিয়া (৭২)। তার অধীনে ছয়জন তাঁতি প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লুঙ্গি বোনেন।

ভোট দেওয়াকে প্রতিটি নাগরিকের জরুরি কর্তব্য বলে মনে করেন বৃদ্ধ বাদশাহ মিয়া। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সবসময় ভোট দেই। ভোট দিয়ে আমাদের কোনো লাভ না হলেও, ভোট দেওয়া সব নাগরিকের দায়িত্ব। আমরা সাধারণ মানুষ। কাজ করে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারলেই হয়।’

তিনি জানান, তারা এ এলাকায় বর্তমানে প্রায় ১০০ পরিবার তাঁতের কাজ করেন। আগে শাড়ি ও লুঙ্গি বুনলেও, এখন শুধু লুঙ্গি তৈরি করে স্থানীয় মহাজনের কাছে বিক্রি করে তার সংসার চলে যায়।

নির্বাচনের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশা করেন বাদশাহ।

তার মতো দোহার-নবাবগঞ্জের অনেক বাসিন্দাই মনে করেন, ভোট জনগণের নাগরিক অধিকার হলেও, নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিরা প্রকৃতপক্ষে খুব কম ক্ষেত্রেই এলাকার মানুষের খোঁজখবর রাখেন।

দোহার ও নবাবগঞ্জ—এ দুই উপজেলা মিলিয়ে ঢাকা-১ আসনের অর্থনীতির বেশিরভাগ অংশই আসে রেমিট্যান্স থেকে। এখানকার অনেক পরিবারের সদস্যই মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থাকেন। দ্বিতীয় প্রধান আয়ের উৎস কৃষি।

মূলত কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের মানুষ বেশ শান্তিপ্রিয়। স্থানীয়রা জানান, এখানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা দখল-সংঘর্ষের ঘটনা অন্যান্য এলাকার চেয়ে কম ঘটে।

তবে, রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরে নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলায় নেই গ্যাস সংযোগ। এলাকাবাসীর অন্যতম প্রধান দাবি গ্যাস সংযোগ ও উন্নতমানের সরকারি হাসপাতাল। এর আগের জনপ্রতিনিধিরা কথা দিয়ে কথা না রাখলেও, এবার ভোটাররা গ্যাস সংযোগ পাওয়ার কথা আদায় করে নিতে চান প্রার্থীদের কাছ থেকে।

এবারের নির্বাচনে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি প্রার্থী খোন্দকার আবু আশফাক, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির নাসির উদ্দিন মোল্লা, ইসলামী আন্দোলনের নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির শেখ মো. আলী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিমা হুদা।

ভোটাররা বলছেন, এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি প্রার্থী ঢাকা জেলা বিএনপি সভাপতি খোন্দকার আবু আশফাক ও জামায়াত প্রার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের মধ্যে।

তবে সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার মেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিমা হুদাও এলাকায় জনপ্রিয়।

প্রায় সব প্রার্থীকেই চেনেন নবাবগঞ্জ উপজেলার কুমারবাড়িলা গ্রামের বাসিন্দা মীম হাজেরা (৪৫)। ভোটের দিন পছন্দের প্রার্থীকেই ভোট দেবেন এই গ্রামের একমাত্র হিজড়া ভোটার মীম। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা মানুষের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে খাই। যে ভালো তার কাছেও আমাদের যেতে হয়, যে খারাপ তার কাছেও যেতে হয়। তাই আমাদের কাছে সবাই ভালো।’

বিএনপি প্রার্থী আবু আশফাক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত তিন নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে না পারায় এবার তারা অনেক আগ্রহ নিয়ে ভোটের জন্য অপেক্ষা করছে। দীর্ঘদিন উপজেলা চেয়ারম্যান থাকায় এলাকার তরুণ সমাজ এবং সব ধরনের মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ভালো। তরুণরা আমাকে বেশ পছন্দ করে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আমি আমার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করবো।

নির্বাচিত হলে তিনি এলাকাকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকমুক্ত এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এছাড়া, রাস্তাঘাটসহ প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করার অঙ্গীকার তার।

‘স্থানীয় নারীরা বিএনপির সঙ্গে আছে’ জানিয়ে আশফাক বলেন, ‘ভোটারদের বলব, নির্বাচনের দিন আপনারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে জয়ী করবেন।’

এদিকে জামায়াত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মনে করেন, সাধারণ মানুষ পুরোনো নেতৃত্বের পরিবর্তে এখন নতুন কাউকে সুযোগ দিতে চায়। 

‘আমি আশাবাদী যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে ভোটাররা ব্যাপকভাবে আমার পক্ষে অর্থাৎ “পরিবর্তনের পক্ষে” রায় দেবেন,’ বলেন তিনি।

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্পিরিট নিয়ে তরুণরা আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আমরা বিশাল আকারে ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি। এছাড়া, নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ আমাকে ভোট দেবে, এটা আমার প্রতিপক্ষও জানে।’

নির্বাচিত হলে তিনি এ এলাকার রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া, সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়ন ও উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।

পাশাপাশি দোহার-নবাবগঞ্জে আধুনিক মানের আইটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে তরুণদের দক্ষ করে তুলতে তিনি বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন বলে জানান।

দুই প্রার্থীই নিজ নির্বাচনী এলাকায় শান্তি বজায় রেখে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।

এ আসনের মোট ভোটার ৫ লাখ ৪৫ হাজার ১৪০, যার মধ্যে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫০ জন পুরুষ, ২ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫ জন নারী ও ৫ জন হিজড়া। সবশেষ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬০৯।

Related Articles

Latest Posts