দেশের পাইকারি ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র পুরান ঢাকার লালবাগ ও চকবাজার। অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই এলাকা ও এখানকার নাগরিকরা জর্জরিত নানা সমস্যায়।
অপরিকল্পিত বাড়িঘর-দোকানপাট, ঘিঞ্জি গলির ভেতর সার্বক্ষণিক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা কারখানা ও গোডাউন, সরু রাস্তায় দিনভর যানজট এবং অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে দুর্বিষহ দিন কাটাতে হচ্ছে ঢাকা-৭ আসনের বাসিন্দাদের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৩ থেকে ৩৩, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর ও কোতোয়ালী থানার কিছু এলাকা নিয়ে এই আসনটি গঠিত।
এখানকার নির্বাচনে জয়-পরাজয় সাধারণত নির্ধারিত হয় ব্যবসায়ী নেতা ও আদি ঢাকাইয়াদের সমর্থনের ওপর।
লালবাগ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন (৪০) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ব্যবসার ক্ষেত্রে কিংবা যেকোনো নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখানে দুর্নীতি হয়। সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক নেই। এখন কোনোকিছুর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা আশা করি এবারের নির্বাচনের পর এসব বিষয় ঠিক হবে।’
ইতোমধ্যে পুরান ঢাকার অলিগলিতে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বিভিন্ন প্রার্থীদের নির্বাচনী অফিস খোলা হয়েছে। কর্মী-সমর্থকরা মিছিল করছে, লিফলেট বিতরণ করছে।
হোসেনি দালান এলাকার ব্যবসায়ী ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, ‘আমাদের এখানে গ্যাস-পানির সমস্যা আছে, জলাবদ্ধতা আছে। আমরা চাই নিরাপদ জীবন। ব্যবসায়ীরা যেন নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে।’
ভোটারদের মতে, এলাকায় নির্বাচনের আমেজ এসেছে, মাইক বাজছে, মিছিল হচ্ছে। বাসায় বাসায় প্রার্থীদের কর্মীরা যাচ্ছেন, ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করছেন নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে।
এই আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) প্রার্থী সীমা দত্ত ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বড় দলগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের অনাস্থা তৈরি হওয়ায় বাম সংগঠনের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। তবে নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা আছে।’
নির্বাচিত হলে তিনি লালবাগ এলাকার হরিজন কলোনির ভূমি রক্ষা, গ্যাস সংকট দূর করা এবং বেকারত্ব নিরসনে কাজ করবেন। শুধু রাস্তাঘাট উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হতে চান সীমা দত্ত।
নারী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তিনি নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার লড়াইকে শক্তিশালী করতে চান। তরুণ ভোটারদের প্রতি তার বার্তা—তারা যেন টাকা বা শক্তির বিচার না করে প্রার্থীর যোগ্যতা ও সততাকে গুরুত্ব দেন।
বিএনপি প্রার্থী হামিদুর রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. এনায়াত উল্লা ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় বেশ পরিচিত।
ঢাকা-৭ আসনে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আব্দুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী এনায়েত উল্লা পুরান ঢাকায় দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। একজন ব্যবসায়ী নেতা এবং একইসঙ্গে ধর্মীয় ভাবমূর্তির কারণে ভোটাররা তার বিষয়ে খুবই ইতিবাচক।’
মো. এনায়েত উল্লা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে অনেকগুলো জায়গায় বৈষম্য আছে। আমি নির্বাচিত হলে ভ্যাট ও আয়কর বিষয়ক আইন ব্যবসাবান্ধব করার চেষ্টা করবো।’
ঢাকা-৭ আসনকে ‘চাঁদাবাজমুক্ত’ করার অঙ্গীকার জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ এলাকার গ্যাস সংকট, মাদক দূর করবো। দুর্নীতি বন্ধ করবো। সার্বিকভাবে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা যেন বৈষম্যের শিকার না হন, সেজন্য কাজ করবো।’
অন্যদিকে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন বিএনপি প্রার্থী হামিদুর রহমান। তার মতে, দীর্ঘ সময় পর একটি উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভোটাররা স্বাধীনভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেবেন বলেই তার বিশ্বাস।
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার ইচ্ছা আছে প্রতিটি ওয়ার্ডে তরুণদের জন্য বিনা খরচে কম্পিউটার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলার। দলের ৩১ দফার আলোকে তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই।’
এছাড়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার তার।
পুরান ঢাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও তাকিয়ে আছেন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মধ্যে দিয়ে মানুষকে যেতে হচ্ছে বছরখানেক ধরে। নির্বাচনের পরে এসব সমস্যা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছেন তারা।
এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৭৬, যা গত নির্বাচনে ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮৯। অর্থাৎ, ঢাকা-৭ আসনে ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৭।
আসনটির অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবদুর রহমান, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. হাবিবুল্লাহ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির মো. শহিদুল ইসলাম, মুক্তিজোটের মাকসুদুর রহমান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির শাহানা সেলিম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইসহাক সরকার।

