সুখ যখন হাতের নাগালে মনে হচ্ছিল, তখনই সব ভেঙে পড়ল

রাঙ্গুনিয়ার বন্দারাজার পাড়ায় নেমে এসেছে ভারী নীরবতা। একই পরিবারের চার ভাইকে চারটি কফিনে একসঙ্গে বাড়ি ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে সেখানে।

ওমানে একসঙ্গে মারা যাওয়া প্রবাসী চার ভাইয়ের মরদেহ মঙ্গলবার রাতে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বুধবার তাদের বন্দারাজার পাড়া জামে মসজিদের পাশের কবরস্থানে দাফন করা হবে।

বন্দারাজার বাড়ি জামে মসজিদের সভাপতি ও পরিবারের প্রতিবেশী আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে পাশাপাশি চারটি কবরের স্থান নির্ধারণ করেছি, যেখানে ভাইদের শেষবারের মতো একসঙ্গে শায়িত করা হবে।’

মাত্র কয়েকদিন আগেও পরিবারটি পুনর্মিলনের অপেক্ষায় ছিল। ভাইদের মধ্যে দুজনের এই সপ্তাহেই দেশে ফেরার কথা ছিল। স্বজনরা জানান, যে বাড়িতে কেনাকাটা, বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা আর বহু প্রতীক্ষিত আনন্দ আয়োজন নিয়ে আলোচনা হতো; সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা। আমরা পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। মরদেহ পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘চারদিকে মানুষ, কিন্তু কেউ জোরে কথা বলছে না। পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমরা কখনো এমন কিছু দেখিনি। মানুষ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে চার ভাই একসঙ্গে কফিনে করে ফিরছে ‘

রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম— চার ভাই দীর্ঘদিন ধরেই কাজের সূত্রে ওমানে থাকতেন। বুধবার সন্ধ্যায় তারা একসঙ্গে বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশে রওনা হন। পরে রাতে তাদের একজন এক আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে জানান, তারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারা নিজেদের অবস্থানও জানান এবং বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থায় নেই।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ভাইরা শ্বাসকষ্টের কথা বলেছিলেন। তারা মাকেও ফোন করে দোয়া চেয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয় লোকজন একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে তাদের অচেতন অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে কর্তৃপক্ষ তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

ওমান চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি ইয়াসিন চৌধুরী বলেন, প্রাথমিক তথ্যে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যদিও তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া কিছু নিশ্চিত করে বলা যাবে না।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ভাইদের মধ্যে দুজনের শুক্রবার দেশে ফেরার কথা ছিল। তারা ওই সফরের আগে কেনাকাটা ও অন্যান্য প্রস্তুতির জন্য একসঙ্গে বের হয়েছিলেন।

মৃত চারজনের ভাই এনাম বলেন, ‘তারা বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ শুনলাম তারা আর নেই। একসঙ্গে চার ভাইকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’

স্থানীয়রা জানান, চার ভাই বহু বছর ধরে বিদেশে কাজ করছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে দুজন বিবাহিত ছিলেন, আর বাকি দুজন দেশে ফিরে বিয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন।

ছোটবেলাতেই তাদের বাবা মারা যান। এরপর মায়ের হাতেই বড় হন তারা। পরে তিনি স্ট্রোক করেন ও অসুস্থ অবস্থায় আছেন। ছেলেদের মৃত্যুর খবর তাকে এখনো পুরোটা জানানো হয়নি। প্রতিবেশী আলাউদ্দিন বলেন, ‘তাকে শুধু বলা হয়েছে, তার এক ছেলে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।’

আলাউদ্দিন আরও বলেন, ‘পরিবারটি কিছুদিন আগে থেকে ভালো সময় দেখতে শুরু করেছিল। তাদের মা সারাজীবন সংগ্রাম করে ছেলেদের বড় করেছেন। সুখ যখন হাতের নাগালে মনে হচ্ছিল, তখনই সব ভেঙে পড়ল।’

Related Articles

Latest Posts