ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সমনির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস।
আজ রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সাগর রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন,
স্বাধীনতার ৫৫ বছরের পরও দেশের রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক ও মানবিক হতে না পারার কারণে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নানাভাবে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। তারা ক্রমাগত রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ছেন।
তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে ধর্মীয় ও মৌলবাদী একটি চক্র সংখ্যালঘু নাগরিকদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রত্যেকটি জাতীয় নির্বাচনের আগে বা পরে সংখ্যালঘু জনপদের নাগরিকদের আতঙ্ক, ভয় যেন আজ চরম সত্যে পরিণত হচ্ছে। এই সত্য একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মৌলচেতনা এবং অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক ও সব নাগরিকের বাংলাদেশ নির্মাণের লড়াইয়ের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা।
তিনি বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বিশেষ করে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের ওপর বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রামের রাউজানে গত বছরের ১ নভেম্বর কমপক্ষে ১২টি সনাতন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাহির থেকে তালা লাগিয়ে অগ্নিসংযোগের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে।
‘এতে প্রতীয়মান হয়—এই পরিবারগুলোর সবাইকে পুড়িয়ে মারাই ছিল অগ্নিসংযোগকারীদের উদ্দেশ্য। এছাড়াও মিরসরাইয়ে সাতটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসব ঘটনাবলী সরেজমিন পর্যবেক্ষণের জন্য সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটসের একটি প্রতিনিধিদল গত ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান ও মিরসরাইয় এলাকায় যায়।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও সামগ্রিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাকির হোসেন বলেন, নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এমন সহিংসতা ঘটানোর মূল উদ্দেশ্য হলো—বিভিন্ন স্থানে আতংক ছড়িয়ে দিয়ে সংখ্যালঘুদেরকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত রাখা। আমরা দেখেছি, রাউজান ও মিরসরাইয়ে সংঘটিত সহিংসতাগুলো ঠেকানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও কার্যকরী কোনো আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিয়ে সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি বিঘ্নিত হচ্ছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। সেগুলো হলো—
১. ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বিশেষ কার্যকরী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া এবং এ বিষয়টি নিয়মিত তদারকির জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সেল গঠন করা।
২. রাউজান ও মিরসরাইসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত সব ধরনের সহিংসতার তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৪. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মানসিক আঘাত দূরীকরণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৫. নবগঠিত মানবাধিকার কমিশন যেন এ বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারিতে রাখেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ও সরেজমিন পর্যবেক্ষক দলের সদস্য সতেজ চাকমার সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ দলের সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিক বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, মানবাধিকারকর্মী দীপায়ন খীসা প্রমুখ।

