ব্রেন্টফোর্ডের স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো ইতোমধ্যে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছেন। এই ব্রাজিলিয়ান তার অভাবনীয় সাফল্যের গল্পকে টেনে নিয়ে যেতে চান আগামী ফুটবল বিশ্বকাপ পর্যন্ত।
বাবার স্মৃতিকে সম্মান জানানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর গোল করার দক্ষতা অনুপ্রাণিত করে চলেছে থিয়াগোকে। তিনি বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম ভীতি জাগানিয়া ফরোয়ার্ডে পরিণত হয়েছেন।
গত ৭ জানুয়ারি সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রেন্টফোর্ডের ৩-০ গোলের জয়ে জোড়া গোল করেন থিয়াগো। ফলে একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে কোনো ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের মালিক হয়েছেন তিনি। ২৪ বছর বয়সী এই তারকা এখন পর্যন্ত চলতি মৌসুমের লিগে ১৬টি গোল করেছেন। ফলে স্বদেশি রবার্তো ফিরমিনো, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলি ও মাথেউস কুনিয়ার করা ১৫ গোলের কীর্তিকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।
গ্যাব্রিয়েল জেসুস, রিচার্লিসন, ফিলিপ কুতিনিয়ো, জুনিনিয়ো ও রবিনিয়োর মতো আরও অনেক নামী ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন। কিন্তু কয়েক মাস আগেও আলোচনার বাইরে থাকা থিয়াগো সবাইকে টপকে গেছেন।
মাত্র তিন বছর আগেও থিয়াগো ছিলেন অখ্যাত, খেলতেন বুলগেরিয়ান ক্লাব লুদোগোরেৎস রাজগ্রাদে। তখন তিনি মনে লালন করতেন শৈশবের আদর্শ রোনালদোর পদাঙ্ক অনুসরণের স্বপ্ন, ‘আমি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলতে দেখতাম এবং সেটাই ছিল সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার। আমি বলতাম, “আমি তার মতো হতে চাই।”‘
লুদোগোরেৎসকে বুলগেরিয়ান লিগের শিরোপা জিততে সাহায্য করার পর ২০২৩ সালে তিনি ক্লাব ব্রুগেতে যোগ দেন। বেলজিয়ান লিগে তার দুর্দান্ত ফর্ম ব্রেন্টফোর্ডের স্কাউটিং নেটওয়ার্কের নজর কাড়ে— যারা অখ্যাত প্রতিভাদের খুঁজে বের করার জন্য সুপরিচিত।
২০২৪ সালে ব্রেন্টফোর্ড থিয়াগোকে ক্লাবটির পক্ষে রেকর্ড ৩ কোটি পাউন্ডে দলে ভেড়ায়। তবে হাঁটুর গুরুতর চোটের কারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রথম মৌসুমের বেশিরভাগ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। এরপর গত বছরের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ব্রায়ান এমবুমো ও ইয়োনে উইসা চলে যাওয়ায় কোচ কিথ অ্যান্ড্রুজের স্কোয়াডে থিয়াগোর জায়গা পাকা হয় এবং তিনি সেই সুযোগ পুরোপুরি লুফে নিয়েছেন।
নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে এবারের মৌসুমে নিজের প্রথম ম্যাচেই জাল কাঁপিয়ে ছন্দ খুঁজে পান থিয়াগো। এরপর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে জোড়া গোল ও প্রিমিয়ার লিগের শিরোপাধারী লিভারপুলের বিপক্ষে একটি গোল করেন। সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে রেকর্ডগড়া পারফরম্যান্সের ঠিক আগেই এভারটনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকেরও স্বাদ নেন তিনি।
থিয়াগোর এই অভাবনীয় উন্নতি খোদ কোচ অ্যান্ড্রুজকেও অবাক করেছে, ‘কেউ যদি আগে থেকে ভেবে থাকে থিয়াগো এতটা ভালো করবে, তাহলে সেই লোক সম্ভবত সত্যি কথা বলছে না। সে অসাধারণ খেলছে। আমি তাকে অন্য কারও সঙ্গে অদলবদল করব না। সে আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।’
মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু থিয়াগোর জীবনকে একেবারে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। এরপর মাকে সাহায্য করতে তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেছেন, কাজ করেছেন ফলের দোকানেও। তার মা মারিয়া রাজধানী ব্রাসিলিয়ার কাছে তাদের নিজ শহর গামাতে আবর্জনা সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করতেন।
এই প্রসঙ্গে থিয়াগো বলেন, ‘আমার শুরুর জীবন অবশ্যই আমার খেলার ধরণকে প্রভাবিত করেছে। এটা আমাকে একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে এবং ছোট-বড় সব প্রাপ্তিকে সম্মান করতে শিখিয়েছে। আজ আমি আমার জীবনের দিকে তাকালে দেখি যে, আমার যা কিছু আছে তা নিয়ে আমি সত্যিই ভাগ্যবান।’
থিয়াগোর গোলের জোয়ারে ভর করে ব্রেন্টফোর্ড প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট তালিকায় পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে, যা ক্লাবটিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। শুধু তাই নয়, লিগের পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে থাকা আর্সেনালে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে তাকে নিয়ে। পাশাপাশি রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলেও জায়গা পাওয়ার জোরাল দাবিদার হয়ে উঠেছেন তিনি।
থিয়াগো এখনও কোনো পর্যায়েই সেলসাওদের জার্সিতে খেলেননি। তবে তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেলে তা হবে তার এই অবিশ্বাস্য যাত্রার চূড়ান্ত সার্থকতা। ব্রাজিলের হয়ে খেলার আশা বুকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটাই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। যখন আমি সেখানে পৌঁছাব— আর আমি পৌঁছাবই— তার মানে দাঁড়াবে, আমি সফল হয়েছি।’

