রাশিয়ার ডিজেল নিতে গিয়ে কেন কূটনৈতিক সংকটে ট্রাম্প?

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের উদ্যোগ নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে সরবরাহের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একইসঙ্গে ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের চাপ দেওয়ায় কিয়েভ ও ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

রয়টার্স ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ইউক্রেন, ইউরোপীয় মিত্র ও মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। ফলে সীমিত অর্থনৈতিক সুবিধার সম্ভাবনার পাশাপাশি তার জন্য তৈরি হয়েছে বড় কূটনৈতিক সংকট।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন খাত ও কৃষকদের ওপর জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ কমাতে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম তার প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে আন্তর্জাতিক ও মার্কিন বাজারে ৩ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথা রয়েছে।

তবে এই সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির চাহিদা মেটাতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন শুধু পরিবহন খাতেই প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়।

সেই হিসাবে, প্রথম দফায় রাশিয়ার ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন খাতের এক দিনের চাহিদার চেয়েও কম। পরবর্তী দফাগুলো মিলিয়েও যে পরিমাণ ডিজেল আসার কথা, তা যুক্তরাষ্ট্রের চার দিনের চাহিদার চেয়ে কম।

অর্থাৎ, সরবরাহের এই উদ্যোগে সাময়িক স্বস্তি মিললেও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন হতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা এলেও রাশিয়ার ওপর থাকা ট্যাংকারসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার কারণে কীভাবে ডিজেল পরিবহন করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর অবস্থাও সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

২০২৪ সালে ইউক্রেনের হামলা শুরুর আগে রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ টন ডিজেল রপ্তানি করত। কিন্তু শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে জুলাই থেকে রপ্তানি বন্ধ রাখে মস্কো।

শিল্প খাতের এক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইউক্রেন হামলা বন্ধ করলে এবং রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশে ক্ষতিগ্রস্ত বড় শোধনাগারগুলো আবার চালু হলেই কেবল মস্কোর পক্ষে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের হামলায় দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ বা প্রায় ২ হাজার ৬৬০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। বিপরীতে, ৩ লাখ টন ডিজেল রপ্তানি করে রাশিয়া প্রায় ৪০ কোটি ডলার পেতে পারে।

তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থের সামান্য অংশই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাবে, কারণ রাশিয়ায় তেল উত্তোলনের ওপর কর আরোপ করা হলেও রপ্তানির ওপর করা হয় না।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার ডিজেল নিয়ে ট্রাম্পের উদ্যোগ ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে গত এক বছরের মধ্যে অন্যতম তীব্র সংকট তৈরি করেছে। ফ্লোরিডার মায়ামির কাছে মার্কিন বিশেষদূত স্টিভ উইটকফের মালিকানাধীন ‘শেল বে’ গলফ ক্লাবে একটি বৈঠক থেকে এই উত্তেজনার সূত্রপাত।

বৈঠকে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইউক্রেন ও ইউরোপের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিরা যুদ্ধ বন্ধের শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রতিনিধিরা জানান, রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিরা জানতে চান, হামলা বন্ধের বিনিময়ে তাদের কী দেওয়া হবে। জবাবে মার্কিন প্রতিনিধিরা বলেন, ইউক্রেনের জন্য এমনিতেই অনেক কিছু করছে যুক্তরাষ্ট্র, তাই শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে আলাদা কোনো সমঝোতার প্রয়োজন নেই।

বৈঠকে মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তার বিষয়টিও উঠে আসে। উপস্থিত কর্মকর্তাদের কাছে এ বক্তব্য পরোক্ষ হুমকি বলে মনে হয়েছিল। যদিও এক মার্কিন কর্মকর্তা এমন হুমকির কথা অস্বীকার করে বলেন, ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ যে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা অনুমান করা কঠিন।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মায়ামির বৈঠকের পর ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জেলেনস্কিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে হবে, কারণ এসব হামলা মার্কিন কৃষক ও খামারিদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে।

এদিকে ইউক্রেনে ‘নতুন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন’ বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তার দাবি, জেলেনস্কির তুলনায় পুতিন শান্তি চুক্তি করতে বেশি আগ্রহী।

তবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পেছনে ইউক্রেনের হামলাই প্রধান কারণ কি না, তা নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।

রয়টার্স ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের হামলা জ্বালানির বাজারে কিছুটা প্রভাব ফেললেও ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে যুদ্ধই দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

ফলে জ্বালানির উচ্চমূল্যের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করে দেশটির ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের সামরিক পদক্ষেপও যখন জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে, তখন কিয়েভের ওপর চাপ প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। পরে হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, ‘তারা সম্মত হয়েছে, কারণ আমি বলেছি।’

তবে বাস্তবে রাশিয়া বা ইউক্রেন, কোনো পক্ষই এই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জানান, ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় আবার হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।

এতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা কতটা কার্যকর এবং দুই পক্ষের মধ্যে আদৌ কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ইউক্রেন ও ইউরোপের মিত্রদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই পদক্ষেপকে ‘দুর্বল সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার আশঙ্কা, এতে মস্কো আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কর্মকর্তা বিয়র্ন সাইবার্ট ২৭টি দেশের রাষ্ট্রদূতকে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণায় ইউরোপীয় কর্মকর্তারা স্তম্ভিত হয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনও সমর্থন জানিয়েছেন জেলেনস্কির প্রতি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছেন। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াদেফুলও ইউক্রেনের প্রতি বার্লিনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের এই উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক আইনপ্রণেতা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিরোধিতা করেছেন।

রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডন বেকন বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিবর্তে কংগ্রেসের পাস করা অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সময় এসেছে।

এছাড়া ছয়জন সিনেটরের একটি দল যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, রাশিয়া যখন ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছে, তখন পুতিনকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয়। তাদের মধ্যে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সও রয়েছেন। সিনেটররা অবিলম্বে সিদ্ধান্তটি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্য পূরণ না হলে ট্রাম্পকে একইসঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংকট সামলাতে হতে পারে।

Related Articles

Latest Posts