ভেঙে পড়া বেড়িবাঁধের ওপর বসে পুরোনো কাপড়ের স্তূপ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেছে নিচ্ছিলেন ফুলমতি সরদার। পাশে পড়ে ছিল ভাঙা ঘরের অবশিষ্টাংশ। সেখান থেকে উদ্ধার করা সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে কোথায় যাবেন, তা-ও নিশ্চিত জানেন না ৭০ বছর বয়সী এই নারী।
তার স্বামী যদুবর সরদারের বয়স ৭৫ বছর। দুজনের কেউই ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এই বয়সে তাদের দেখাশোনা করার মতোও আর কেউ নেই। খুলনার দাকোপ উপজেলার বটবুনিয়ায় ঢাকী নদীর ভাঙনে ঘর হারিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে এই বৃদ্ধ দম্পতি।
গত রোববার সকালে উপজেলার ৩১ নম্বর পোল্ডারের উত্তর কামিনীবাসিয়া সরদারবাড়ির কাছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের একটি বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ভেসে যায় ফুলমতি ও যদুবর দম্পতির দুটি ঘরের একটি।
ফুলমতি বলেন, ‘একসময় তিন বিঘা জমির ওপর আমাদের বাড়ি ছিল। ঢাকী নদী সব নিয়ে গেছে। এর আগে পাঁচবার নদীতে আমাদের বাড়ি ভেঙেছে, এ নিয়ে ছয়বার। এখন কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না। মেয়ের বাড়িতেও যাওয়ার উপায় নেই। ভাবছি, দেড় কিলোমিটার দূরে রাস্তার পাশে কোথাও একটা ঘর তুলে যদি থাকা যায় কি না।’
গত বছরও একই জায়গায় ভাঙন হয়েছিল। তখন সরকার থেকে ১৫ হাজার টাকা ও কিছু জিনিসপত্র পেয়েছিলেন তারা। সেই সহায়তা আর ধারদেনা করে আবার ঘর তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এক বছরের মাথায় সেটিও নদীতে বিলীন হয়ে গেল।
ফুলমতির প্রশ্ন, ‘১৫ হাজার টাকায় কি আর বাড়ি করে থাকা যায়? ধারদেনা করে যে ঘরটা করেছিলাম, সেটাও নদী নিয়ে গেল।’
তার মতো আরও পরিবার এই ভাঙনে কয়েকঘণ্টার মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে কেউ আশ্রয় নিয়েছেন সড়কের পাশে, কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বৃদ্ধ, অসুস্থ ও অসহায় মানুষদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া প্রত্যক্ষ ক্ষতির আশঙ্কা করছেন আশেপাশের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ।
একই এলাকার ৭৭ বছর বয়সী নিরঞ্জন কুমার মণ্ডলও হারিয়েছেন নিজের ঘর। স্ত্রী রিনা রানী মণ্ডল ভাঙা ঘর থেকে কিছু জিনিসপত্র টেনে বের করে সড়কের পাশে রাখছিলেন। এরপর স্বামীর হাত ধরে তাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাদের কোনো সন্তান নেই।
নিরঞ্জন বলেন, ‘দুইখানা ঘর ছিল। অন্যের বাড়িতে মিস্ত্রির কাজ করতাম। এখন আর সেটাও পারি না। এই অবস্থায় কীভাবে খাব, কোথায় যাব, কিছুই জানি না। গতকাল পাশের গ্রামের একজন খাবার দিয়ে গিয়েছিলেন। আজ সকালে সেটাই খেয়েছি। জীবনটা শেষ হয়ে গেল।’
নতুন বাঁধেও ভাঙন
স্থানীয় বাসিন্দা সুবোধ সরকার জানান, বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরিসভা মন্দির ও সরদারবাড়ির সামনে গত বছরের অক্টোবরে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। এরপর পাউবো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ৩৫০ মিটার দীর্ঘ উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে।
কিন্তু এক বছরের মধ্যেই সেই বাঁধের প্রায় ৪৫ মিটার অংশ গত রোববার সকালে ধসে পড়ে।
এর আগে ২০২৪ সালেও একই জায়গায় বাঁধ ভেঙে ধানখেত প্লাবিত হয়েছিল। বারবার একই স্থানে ভাঙনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দাকোপ উপজেলা তিনটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নিয়ে গঠিত। উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে ৩১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় রয়েছে পানখালী ও তিলডাঙ্গা ইউনিয়ন এবং চালনা পৌরসভা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকায় প্রায় ৯০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন। বাঁধের ঝুঁকির কারণে তাঁদের বড় একটি অংশের নিরাপত্তা ও জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
মেরামতের চেষ্টা, কাটেনি শঙ্কা
ভাঙনের পর রোববার ও সোমবার স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের কাজ করেন। পাউবোর কর্মকর্তারাও কাজ তদারকি করেন। বালির বস্তা ফেলে জোয়ারের পানি ঠেকানোর চেষ্টা চলে। তবে আশপাশের এলাকাও ভাঙনপ্রবণ হওয়ায় স্থানীয়দের শঙ্কা কাটেনি।
পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. নয়ন আলী বলেন, বটবুনিয়া বাজারসহ প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। গত তিন বছর ধরে সেখানে সংস্কারকাজ চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভাঙা অংশ মেরামত করার এবং নতুন করে যাতে ভাঙন না হয়, সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। বালির বস্তা দিয়ে পানি ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।’
খুলনা পাউবোর বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান জানান, দ্রুত বিকল্প বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা চলছে। ঠিকাদারকে বলা হয়েছে এলাকা যেন প্লাবিত না হয়, তা যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে নগদ অর্থ ও চাল বিতরণ করা হয়েছে। পাউবোর কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে মেরামতকাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
শুধু ঘরবাড়ি নয়, ঝুঁকিতে ফসল ও জীবিকা
বটবুনিয়ার এই ভাঙন শুধু কয়েকটি পরিবারের বসতভিটা কেড়ে নেয়নি, আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও মাছের ঘেরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বেড়িবাঁধ পুরোপুরি মেরামত করা না গেলে জোয়ারের সঙ্গে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।
স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার হেক্টর আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অঞ্চলের বহু কৃষক ও মৎস্যচাষির জীবিকা কৃষিজমি ও ঘেরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পানি ঢুকে থাকলে তাদের আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় নদীভাঙনের অন্যতম বড় বিপদ হলো লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ। বেড়িবাঁধ ভেঙে নদীর পানি জমিতে ঢুকলে শুধু চলতি মৌসুমের ফসলই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না, জমির মাটির লবণাক্ততাও বেড়ে যেতে পারে। এতে পরবর্তী মৌসুমে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, তাছাড়া এ অঞ্চলের আরেকটি সমস্যা হলো নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা। একবার জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকলে অনেক জায়গায় তা সহজে বের হতে পারে না। কোথাও কোথাও পানি কয়েক মাস পর্যন্ত আটকে থাকে। এতে কৃষিজমি দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকে, ফসলের ক্ষতি হয় এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। ফলে বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের ঘটনা সাময়িক দুর্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে কৃষি, মৎস্যচাষ, বসতভিটা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে।

