দখল-চাঁদাবাজিতে ব্যবহার হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’, খুঁজে বের করা হবে পৃষ্ঠপোষকদের

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনার পর জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় কিশোর গ্যাং ও অন্যান্য অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

একইসঙ্গে এসব অপরাধী গোষ্ঠীর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

গত মঙ্গলবার পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে অপরাধ দমনে কঠোর অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল বলেছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী অপরাধী এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে।

তিনি আরও জানান, পুলিশ নিয়মিত অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ করে এবং সেই অনুযায়ী নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযানও চলছে।

চলতি সপ্তাহে বিভিন্ন স্থানে হামলা ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশ আলোচনায় রয়েছে।

এরমধ্যে মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মুখোশধারী হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানের একটি প্লটেও হামলার অভিযোগ আছে।

এ ছাড়া আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি ভবনে অস্ত্রধারীরা হামলা চালায় এবং ইসিবি চত্বরের কাছে নিউ গিনি প্রপার্টিজ হাউজিং প্রকল্প চত্বরে ২০০ থেকে ২৫০ জন হামলা চালায়।

এর মধ্যে অন্তত দুটি ঘটনায় কিশোরদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্যমতে, রাড্ডা সেন্টারে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা ওই হামলায় জড়িত দেড় শতাধিক মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ছিল কিশোর। আদাবরের হামলায়ও অনেক কিশোর অংশ নিয়েছিল।

অন্যদিকে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

এরপর থেকেই জেলায় একের পর এক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, ওই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল।

গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামেও প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হয় বলে জানায় পুলিশ।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সমস্যাটি এখন আর কেবল কিশোরদের বিচ্ছিন্ন বা অগোছালো দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন গ্যাং এখন চাঁদাবাজি, মাদক ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এমনকি কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে এলাকা দখল, ভাড়াটে লাঠিয়াল হিসেবে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি দখলের কাজেও।

কিছু কিছু চক্রে কিশোরদের নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রাপ্তবয়স্করা। গোয়েন্দা সংস্থার এক সূত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, কিছু গ্যাং এখন আর কেবল ছোটখাটো চাঁদাবাজিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তারা রীতিমতো আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগতের একটি বর্ধিত অংশে পরিণত হয়েছে।

মঙ্গলবার পুলিশ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত আগস্ট মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির সারা দেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে এবং মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয়ে দেখার কোনো সুযোগ নেই; অপরাধীর পরিচয় কেবলই ‘অপরাধী’।

সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সাইদুর রহমান। তিনি কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে চাঁদাবাজ ও অন্যান্য অপরাধীর বিরুদ্ধে চলমান বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।

পৃষ্ঠপোষকেরা নজরদারিতে

পুলিশ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্বেগের জায়গাটি এখন আর কেবল কিশোরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর পরিধি আরও বিস্তৃত।

মঙ্গলবারের সভায় অতিরিক্ত আইজি সাইদুর স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের  ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, আগে কিশোররা সাধারণত চুরি বা সম্পত্তির ক্ষতি করার মতো অপরাধে জড়িত থাকত। কিন্তু বর্তমানে তারা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যার একটি বড় কারণ হলো প্রভাবশালীরা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে তাদের ব্যবহার করছে।

অধ্যাপক ফারুক আরও বলেন, কেবল গ্রেপ্তার করে এসব গ্যাং নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ যারা তাদের সংগঠিত করে, অর্থায়ন করে বা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা প্রায়ই আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

তিনি আরও যোগ করেন, প্রাপ্তবয়স্ক যারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধে ব্যবহার করে তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের পক্ষ থেকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, সাধারণত সুবিধাবঞ্চিত কিশোররাই এসব গ্যাং এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, বেকারত্ব, সামাজিক ও পারিবারিক শৃঙ্খলার প্রতি অনীহা, আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী পৃষ্ঠপোষক কিংবা কথিত ‘বড় ভাইদের’
স্বার্থ হাসিলের প্রচেষ্টাই এসব অপরাধের মূল কারণ।

তিনি আরও বলেন, আইনে কিশোর অপরাধীদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ থাকা উচিত। তবে যারা তাদের অপরাধ থেকে সুবিধা নেয় এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদের অবশ্যই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

তিনি যোগ করেন, এ ক্ষেত্রে ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি।

বিভিন্ন জেলায় বহু আটক

গত কয়েক দিন ধরে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত সোমবার কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে ১ হাজার ৩১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে অন্তত ৭৩০ জনকে পরে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

শুধুমাত্র কুমিল্লাতেই মঙ্গলবার জেলাব্যাপী অভিযানের চতুর্থ ধাপে আরও ৩৭৯ জনকে আটক করা হয়। এর আগে তিন ধাপে জেলায় আটক করা হয়েছিল ১ হাজার ২৯৩ জনকে।

কুমিল্লা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান জানান, যেসব এলাকায় গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, মূলত সেখান থেকেই তাদের আটক করা হয়েছে।

তিনি জানান, আটকদের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত কি না। সেই অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা

পুলিশের একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ কমিটি সম্প্রতি দেখেছে, শহরাঞ্চলে কিশোর গ্যাং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কমিটির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এসব গ্যাং রাস্তাঘাটে সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। কমিটি গ্যাং সদস্যদের শনাক্ত করে তাদের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ চলতি বছরের মে মাসে জানিয়েছিলেন, শুধুমাত্র ঢাকাতেই পুলিশ ১২৭টি কিশোর গ্যাং বা তাদের উপদল চিহ্নিত করেছে।

পুলিশের গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মহানগরী ও জেলায় আরও ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল, যার প্রায় ১০০টিই ছিল চট্টগ্রাম বিভাগে। জেলা পর্যায়ে নোয়াখালীতে সবচেয়ে বেশি ২৫টি গ্যাং সক্রিয় ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদরদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশ সদরদপ্তর মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে কিশোররা যেন বিপথে না যায়, সেজন্য সরকার খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিচ্ছে।

তবে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে, কেউ যেন রাজনৈতিকভাবে কিশোরদের পৃষ্ঠপোষকতা না করে অথবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের ব্যবহার না করে, যোগ করেন ওই কর্মকর্তা।

Related Articles

Latest Posts