দ্বীপটির নাম গ্রেট ব্রিটেন। এটি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ও ইউরোপের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে মহাদেশটির মূল ভূখণ্ড ঘেঁষা সবচেয়ে বড় দ্বীপ। ‘গ্রেট ব্রিটেন’ দ্বীপটির ভৌগোলিক নাম। এই এক দ্বীপেই ৩ ‘দেশ’—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস।
গ্রেট ব্রিটেনের পাশে আরও একটি বড় দ্বীপ আছে। নাম: আয়ারল্যান্ড। এই দুই বড় দ্বীপের আশেপাশে আছে অসংখ্য মাঝারি ও ছোট দ্বীপ। এসব বড়-মাঝারি-ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত ব্রিটিশ আইলস বা ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ।
গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপে ইংল্যান্ডের অধিবাসী ইংলিশ, স্কটল্যান্ডের অধিবাসী স্কটিশ ও ওয়েলসের অধিবাসী ওয়েলশ নামে পরিচিত। শত শত বছর ধরে এক দ্বীপে বসবাস করলেও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন। এমনকি, আছে সংঘাতও।
গ্রেট ব্রিটেনকে সংক্ষেপে ব্রিটেন বলা হয়। এই দ্বীপের ভেতরে থাকা এই ৩ ‘দেশ’ তথা—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন’, সংক্ষেপে ‘ইউকে’ বা ‘যুক্তরাজ্য’।
গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপটির রাজনৈতিক নাম ‘যুক্তরাজ্য’। অর্থাৎ, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসকে রাজনৈতিকভাবে একসঙ্গে বোঝাতে ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য বলা হয়।
এই গ্রেট ব্রিটেনের পাশে তুলনামূলক ছোট দ্বীপ ‘আয়ারল্যান্ড’।
১৮০১ সালে ব্রিটিশ রাজার প্রভাব বলয়ে থাকা আয়ারল্যান্ড দ্বীপ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জোট বাঁধে। তখন দুই দ্বীপ মিলে রাজনৈতিকভাবে নাম নেয়—ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড।
বর্তমানে আয়ারল্যান্ড দ্বীপ রাজনৈতিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত—একটি স্বাধীন আইরিশ প্রজাতন্ত্র ও অন্যটি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত উত্তর আয়ারল্যান্ড।
১৯২২ সালে আয়ারল্যান্ড দ্বীপটির বড় অংশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নাম নেয় আইরিশ প্রজাতন্ত্র। দ্বীপটির ছোট অংশ অর্থাৎ, উত্তর আয়ারল্যান্ড রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থেকে যায়।
উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকায় রাজনৈতিকভাবে এটি নাম নিয়েছে—ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড নর্থ আয়ারল্যান্ড। সংক্ষেপে এই ৪ জাতির রাজনৈতিক ‘জোট’কেও ‘ইউনাইটেড কিংডম’ বা ‘ইউকে’ বা যুক্তরাজ্য বলা হয়।
ঠিক ১০৪ বছর পর সেই যুক্তরাজ্যে আবারও শোনা যাচ্ছে ভাঙনের সুর।
এবার একযোগে যুক্তরাজ্যের অংশীদার স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার বা ‘মুখ্যমন্ত্রী’রা নিজ নিজ অঞ্চলের স্বাধীনতার দাবি তুলেছেন। তারা সমান অধিকার নিয়ে একে অপরের বন্ধু ও প্রতিবেশী হিসেবে পথ চলার আশা প্রকাশ করেছেন।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে এই তিন অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী নেতারা নিজ নিজ অঞ্চলের স্বাধীনতার জন্য এক সঙ্গে কাজ করতে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেন।
তারা সদর্পে ঘোষণা দেন—লন্ডনের আধিপত্যের দিন শেষ হওয়ার পথে।
তারা ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।
এই নেতারা চান না, কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তাদের ওপর খবরদারি করুক। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়তে চান।
সেই সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নামকে আহ্বান জানানো হয়েছে ‘সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়াটিকে সহজ করার’ জন্য।
স্মারকটিতে সই করেছেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও জাতীয়তাবাদী স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) নেতা জন রামসে সুইনি, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার ও জাতীয়তাবাদী প্লাইড কাম্রি দলের নেতা রিন অ্যাপ ইয়োরওয়ার্থ, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও জাতীয়তাবাদী শিন ফেইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মিশেল ও’নিল এবং শিন ফেইনের প্রেসিডেন্ট ম্যারি ল্যু ম্যাকডোনাল্ড।
তবে তারা দলীয়ভাবে এই সমঝোতা স্মারক সই করেছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন—এই জাতীয়তাবাদী নেতাদের এমন দাবির কারণে যুক্তরাজ্যের শতাব্দী প্রাচীন ঐক্যের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।
২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বের হয়ে যাওয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড। এই অঞ্চল দুটির বাসিন্দারা মনে করছেন ইংল্যান্ডের ইংলিশ জাতীয়তাবাদীরা অন্যদের অবজ্ঞা করছে।
কেননা, গণভোটে স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিবাসীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের অনেকের ভাষ্য: ইংল্যান্ডের আধিপত্য কমাতে ও ব্রিটিশ সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতেই হয়ত যুক্তরাজ্যের অন্য অঞ্চলগুলোর জাতীয়তাবাদী নেতারা এমন কৌশল নিচ্ছেন।
তাদের অনেকে ইংল্যান্ডের ইংলিশ জাতীয়তাবাদী নেতাদের বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদী আচরণের অভিযোগও তুলছেন।
ইংল্যান্ড সবচেয়ে বড় অঞ্চল ও সম্পদশালী হওয়ায় ইংলিশ জাতীয়তাবাদী নেতাদের বিরুদ্ধে ‘বিমাতাসুলভ’ আচরণের অভিযোগ উঠছে। ‘বঞ্চনার’ কারণে অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট অঞ্চলগুলোয় অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে।
স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্ট, ওয়েলসের সেনেথ (সিনেট) ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের অ্যাসেম্বলিতে স্বাধীনতাকামী দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবির পেছনে জনগণের সমর্থন ঠিক কতটা?—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয় জাতীয়তাবাদের ঢেউ ওঠায় সেই প্রভাব স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
আবার কারও মতে, ব্রেক্সিটের কুপ্রভাব এক দশক পর পুরো যুক্তরাজ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
এরইমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের প্রতি সমর্থন দিয়ে যেন ‘আগুনে ঘি’ ঢেলেছেন।
অর্থাৎ, স্বাধীন আইরিশ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের সম্ভাব্য একত্রীকরণকে ‘স্বাগত’ জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি। অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের এমন মনোভাবের ভেতর ‘রাজনীতি’ দেখছেন।
তাদের মতে, ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড একত্রীকরণ মন্তব্য আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেখানে বসবাসকারী প্রায় ৩ কোটি আইরিশ জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এক সময় বলা হতো ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না’।
এমন কথা বলা হতো, পৃথিবীর পূর্বপ্রান্ত থেকে পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারকে বোঝাতে।
অর্থাৎ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক অংশে রাত নেমে এলে অন্য অংশে দিনের আলো ফুটে উঠতো। সেই সাম্রাজ্য থেকে ৫০টির বেশি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ায় সেসব অতীত হয়েছে বহু বছর আগেই। কিন্তু, এবার খাস যুক্তরাজ্যে আবারও উঠেছে ভাঙনের দাবি।
গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপে থাকা স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস এবং আয়ারল্যান্ড দ্বীপে থাকা উত্তর আয়ারল্যান্ড এখন নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। এখন এসব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এক যোগে বলেছেন, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’?
ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে এক স্মারক সমঝোতায় সইয়ের পর সংবাদ সম্মেলন করে রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরা বলেছেন যে তাদের বাসিন্দারা আর লন্ডনের অধীনে থাকতে চান না। তাদের ভবিষ্যৎ তারা নিজেরাই গড়তে চান।
মুখ্যমন্ত্রীরা আশা করছেন, যুক্তরাজ্যের সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। কেননা, রাজ্যগুলোর স্বাধীন হওয়ার অধিকার আছে।
তারা আরও বলেছেন, গণতন্ত্রের পথে বাধা দেওয়ার অধিকার ব্রিটিশ সরকারের নেই। অন্যের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকারও ব্রিটিশ সরকার অস্বীকার করতে পারে না।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ওয়েলস অনলাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাসের নির্বাচনে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে জাতীয়তাবাদী দলগুলো বিজয়ী হওয়ায় তারা এখন দাবি করছেন—দুই দ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পালটে যাচ্ছে।
ব্রিটানিকার তথ্য বলছে—অনেক সময় ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য ও গ্রেট ব্রিটেন একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। তবে এই শব্দ দুটি সমার্থক নয়। কারণ, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে এই দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য আছে।
ইউরোপের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান। এই দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ড সবচেয়ে বড় দ্বীপ।
ইংলিশ চ্যানেলের দক্ষিণে ফরাসি অংশে ‘ব্রিটানি’ নামে ফ্রান্সের একটি উপকূলীয় অঞ্চল থাকায় দ্বীপ ব্রিটেন ও এর সংলগ্ন ছোট ছোট দ্বীপগুলোকে বোঝাতে ‘গ্রেট ব্রিটেন’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়।
ব্রিটানিকার তথ্যে আরও জানা যায়—১২৮৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ড ওয়েলসের উত্তরাঞ্চল দখল করেন। ১৩০১ সাল থেকে ইংল্যান্ডের রাজা ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’ বা ‘ওয়েলসের যুবরাজ’ খেতাব ব্যবহার করে আসছেন।
রাজা অষ্টম হেনরির সময় থেকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস একসঙ্গে আছে।
১৯২৫ সালে ওয়েলসের জাতীয়তাবাদী দল ‘প্লাইড কাম্রি’ গড়ে উঠলেও ১৯৬০ এর দশকে এই দলের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৯৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে ওয়েলস বাড়তি ক্ষমতা পায়। ১৯৯৯ সালে ওয়েলসে সেনেথ নির্বাচন হয় এবং প্রথম অধিবেশন বসে।
এর আগে, ১৭০৭ সালে দ্বীপ ব্রিটেনের ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড রাজ্যের বিবদমান রাজারা এক চুক্তির মাধ্যমে ‘কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন’ গঠন করেন। সেই বছর ১ মে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্টে ‘অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন’ চুক্তিটি সই হয়।
১৮০১ সালে ব্রিটিশ রাজার প্রভাব বলয়ে থাকা আয়ারল্যান্ড দ্বীপ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে যোগ দেয়। তখন জোটের নাম হয়—ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড।
এই ঐক্য টিকেছিল ১৯২২ সাল পর্যন্ত। সে বছর আয়ারল্যান্ড দ্বীপের বড় অংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আইরিশ প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়। তখন দ্বীপটির উত্তরের অংশ ‘উত্তর আয়ারল্যান্ড’ নাম নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থেকে যায়।
এরপর জোটটির নতুন নাম হয়—ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড নর্থ আয়ারল্যান্ড। একেও সংক্ষেপে ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য বলা হয়।
যুক্তরাজ্য বা গ্রেট ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় অঞ্চল ইংল্যান্ড এবং প্রধান শহর লন্ডন। তাই অনেকে সংক্ষেপে যুক্তরাজ্য বোঝাতে এই শব্দ দুটিও ব্যাপকহারে ব্যবহার করেন।
বহু বছরের বহু আন্দোলনের পর অবশেষে স্কটল্যান্ডে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর।
বিবিসির তথ্য বলছে—স্কটল্যান্ডের ৪২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯২ জন ভোট দিয়েছিলেন। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
ভোটারদের মধ্যে ২০ লাখ ১ হাজার ৯২৬ জন বা ৫৫ দশমিক ৩০ শতাংশ স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অর্থাৎ ‘না’ ভোট দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৮৯ জন বা ৪৪ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে।
যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে—যুক্তরাজ্য সরকার বিশ্বাস করে যে, স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থেকে ভালো আছে এবং যুক্তরাজ্য স্কটল্যান্ডকে সঙ্গে রেখে ভালো অবস্থানে আছে।
এ ধরনের গণভোট ‘এক প্রজন্মে’ একবার আয়োজন করা হতে পারে বলেও মনে করে যুক্তরাজ্য সরকার। অর্থাৎ, কোনো দল বা ব্যক্তি গণভোটের দাবি তুললেই তা মেনে নেওয়া হবে—এমন নয়।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে—‘স্কটল্যান্ডের কি স্বাধীন দেশ হওয়া উচিত?’—এমন প্রশ্নের ওপর ২০১৪ সালে আয়োজন করা গণভোটে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছিলেন।
গত ৪ সেপ্টেম্বর বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়—স্কটল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী জন রামসে সুইনির ভাষ্য: ‘২০১৪ সালের পর পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। যুক্তরাজ্যের মতো স্কটল্যান্ডও বদলে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘স্কটল্যান্ড প্রস্তুত। স্কটল্যান্ডের জনগণ প্রস্তুত। এখন যুক্তরাজ্য সরকারের সময় এসেছে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের।’
আবার যুক্তরাজ্যপন্থিদের অনেকে মনে করছেন—স্বাধীন স্কটল্যান্ডের ভাবনা এখনো ‘যোজন যোজন’ দূরে।
প্রতিবেদন অনুসারে—চলতি বছরের শুরুতে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর স্ট্র্যাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্যার জন কার্টিস জানিয়েছিলেন, স্কটল্যান্ড স্বাধীনতার বিষয়ে ‘দুইভাবে বিভক্ত’।
‘কখনো দেখা যাচ্ছে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে বেশি মানুষ কথা বলছেন। আবারও কখনো এর বিপক্ষে বেশি মানুষ মত দিচ্ছেন,’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘গত গণভোটের তুলনায় এবার নতুন গণভোটে বেশি মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিতে পারেন।’
তবে ডাউনিং স্ট্রিটের বক্তব্য—যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম স্কটল্যান্ডের জন্য আরেকটি গণভোটের আয়োজন নিয়ে এখন কিছুই ভাবছেন না। কেননা, সরকার দেশটির অর্থনৈতিক বিষয় তথা জীবনযাত্রার খরচ কমানো নিয়ে বেশি চিন্তিত।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিবিসির অপর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকার যাই বলুক না কেন, স্কটল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী ও এসএনপি প্রধান জন রামসে সুইনি ২০৩১ সালে সেখানে আবারও গণভোট চান।
প্রতিবেদনে বলা হয়—জন রামসে সুইনি মনে করেন অ্যান্ডি বার্নাম হবেন যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, গত মে মাসের নির্বাচনে স্বাধীনতাকামী এসএনপিকে বিজয়ী করে স্কটল্যান্ডবাসী তাদের মনের কথা প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—স্কটল্যান্ড স্বাধীনতা অর্জন করলে সেখানে থাকা যুক্তরাজ্যের পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজটির ভবিষ্যৎ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্কটল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্য নতুন চুক্তি হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়ার সময় নতুন দেশটির নিরাপত্তার বিষয়টিও ঠিক করে নেওয়া হবে, বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে।
গত ২১ এপ্রিল বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ওয়েলসের স্বাধীনতার প্রশ্নে সেখানকার জাতীয়তাবাদী দল প্লাইড কাম্রির অবস্থান স্পষ্ট। দলটির সংবিধানের দ্বিতীয় বাক্যে বলা হয়েছে—‘ওয়েলসের জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে এর লক্ষ্য হবে: ওয়েলসের জনগণের জন্য স্বাধীনতা নিশ্চিত করা’।
গত মে মাসে ওয়েলসের সেনেথ নির্বাচনে প্লাইড কাম্রি ভালো ফল করায় দলটির নেতারা মনে করছেন যে সেখানে স্বাধীনতার পক্ষে হাওয়া জোরালো হচ্ছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—৯৬ আসনের সেনেথে ৪৩ আসন জিতে ওয়েলসের জাতীয়তাবাদী দল প্লাইড কাম্রি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
গত বছর ১২ অক্টোবর বিবিসির অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল—প্লাইড কাম্রি ওয়েলসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি ‘স্থায়ী কমিশন’ গঠন করবে। এই কমিশন সাংবিধানিক বিষয়গুলো নিয়ে নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা করবে।
এতে আরও বলা হয়েছিল—দলটি ২০২৬ সালের নির্বাচনে স্বাধীনতার দাবি না তুললেও, ২০৩০ সালের নির্বাচনে দাবিটি তোলা হবে।
বাস্তবে দেখা গেল: গত মে মাসের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্লাইড কাম্রি চলতি সেপ্টেম্বরে অন্যান্য অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে নিয়ে স্বাধীনতার জন্য কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের পক্ষে ট্রাম্প। বহু দশকের মার্কিন নীতি ভাঙলেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাজ্যের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষতার নীতি মেনে চলছিল।
এতে আরও বলা হয়—গত ১২ সেপ্টেম্বর ৩ দিনের সফরে আয়ারল্যান্ডে গিয়েছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। সফরের প্রথম দিন এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে, আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণ দেখলে ‘ভালো লাগবে’।
সেসময় ট্রাম্পের পাশে ছিলেন, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিহল মার্টিন।
ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি নতুন করে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চাই না। তবে বলবো—দুই আয়ারল্যান্ড এক হলে ভালো লাগবে। যদি এমনটি হয় তাহলে ভালো কাজ হবে।’
‘একদিন দুই আয়ারল্যান্ড এক হবেই,’ বলেও মন্তব্য করেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের বিষয়ে কথা বলা এড়িয়ে চলছে।
১৯৯৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের প্রশাসন ‘গুড ফ্রাইডে’ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকা উত্তর আয়ারল্যান্ডের সশস্ত্র আন্দোলন বন্ধ করেছিল।
তবে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় সহায়তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রপতির ‘আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণ’ নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলেও মন্তব্য করছেন ডাবলিনে ট্রাম্পের সফরের বিরোধিতাকারী অনেকে।
ব্রিটানিকার তথ্য বলছে—১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত উত্তর আয়ারল্যান্ডে যুক্তরাজ্যপন্থি প্রটেস্ট্যান্ট ও যুক্তরাজ্যবিরোধী বা আয়ারল্যান্ড একত্রীকরণপন্থি ক্যাথলিকদের মধ্যে গোষ্ঠীগত সংঘাত চলেছিল।
স্বাধীনতার জন্য যুক্তরাজ্যবিরোধী আইরিশ লিবারেশন আর্মির (আইএলএ) গেরিলা যুদ্ধে আয়ারল্যান্ড দ্বীপের উত্তরাংশ রক্তাক্ত হয়েছিল। সেই সংঘাতে অন্তত ৩ হাজার ৬০০ জন নিহত হন। আহত হয়েছিলেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের বক্তব্য: শান্তি চুক্তির মাধ্যমে উত্তর আয়ারল্যান্ডে স্বস্তি ফিরলেও, স্বাধীনতার দাবি কখনোই থামেনি। আইএলএ-র রাজনৈতিক শাখা ‘শিন ফেইন’ উত্তর আয়ারল্যান্ডের অ্যাসেম্বলিতে প্রধান দল হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায়, সেই দাবি দিনকে দিন আরও জোরালো হচ্ছে।
গত বছর ৭ ফেব্রুয়ারি আইরিশ প্রজাতন্ত্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য আইরিশ টাইমস-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—জরিপ বলছে, আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের প্রতি সমর্থন উত্তর আয়ারল্যান্ডে ক্রমশ বাড়ছে।
গত বছরের ৪ জুলাই এক জরিপের বরাত দিয়ে ডাবলিনভিত্তিক রয়েল আইরিশ একাডেমির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—ভোটারদের ৫৭ শতাংশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকতে এবং ৪২ শতাংশ আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের মানুষ জীবনযাত্রার মান ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বেশি চিন্তিত।
চলতি বছরের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ-এর তথ্য বলছে—যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ ও স্বাধীন আইরিশ প্রজাতন্ত্রের ৬৯ শতাংশ মানুষ ক্যাথলিক।
তাই বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন—আয়ারল্যান্ড দ্বীপের একই জাতি, ভাষা ও ধর্মগোষ্ঠীর মানুষের এক দেশ গড়ার স্বপ্ন হয়ত বেশিদিন আটকে রাখা যাবে না।
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সম্ভব কি না?—এমন প্রশ্ন অনলাইনে ছুঁড়ে দিতেই জানা গেল—আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্বাধীনতা এবং আইরিশ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণ সম্ভব।
তবে এর জন্য যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া দরকার।
আর যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার চায় না ১০০ বছর পর আবারও যুক্তরাজ্য ভেঙে যাক।
কিন্তু, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলগুলোর জাতীয়তাবাদী নেতারা বলছেন, তাদের কার্ডিফ সম্মেলন ইতিহাস হয়ে থাকবে। কেননা, আজকের যুক্তরাজ্য কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। লন্ডনকে এখন ‘যুক্তরাজ্য-পরবর্তী’ বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হবে।
এখন দেখার বিষয়—আগামী দিনগুলোয় যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যায়।

