রংপুর নগরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শ্যামাসুন্দরী খাল। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক এই খালটি একসময় নগরীর প্রাণপ্রবাহ ছিল। বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খালের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কিন্তু কয়েক দশকের দখল, ভরাট, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যবাহী খালটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। গত দুই দশকে ১৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হলেও শ্যামাসুন্দরীর হারানো রূপ ফিরিয়ে আনা যায়নি।
সর্বশেষ চলতি বছর শ্যামাসুন্দরী খাল পুনর্বাসনে প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব যৌথভাবে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), রংপুর সিটি করপোরেশন ও বন বিভাগকে।
এর মধ্যে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে খালের ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন করার কথা পাউবোর। গত মে মাসে কাজ শুরু করে সংস্থাটি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, খাল পুনঃখনন না করে কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে কেবল জমে থাকা প্লাস্টিক ও বর্জ্য তুলছিল পাউবো। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ শুরু করলে কাজটি স্থগিত হয়ে যায়।
নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার বাসিন্দা একরামুল হক খন্দকার বলেন, পুনঃখনন না করে শুধু প্লাস্টিক-বর্জ্য তুলে প্রকল্পটি শেষ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছিল। খালের নামে সরকারি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা আমরা মেনে নেব না। যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে পুনঃখনন ও পুনর্বাসন কাজ শুরু না করলে কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না।
তবে কাজের ধরন নিয়ে ব্যাখ্যার পাশাপাশি নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, প্লাস্টিক ও বর্জ্য তুলে ফেলার পরেই মূল খননের প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু স্থানীয়রা বিষয়টি বুঝতে চাননি। তাদের বাধার মুখে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে, বর্ষা পার হলে আবার কাজ শুরু হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, সরকার যে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, তা দিয়ে ১০ কিলোমিটার খাল পুরোপুরি পুনঃখনন ও পুনর্বাসন সম্ভব নয়। এই বাজেট দিয়ে যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই করা হবে।
প্রকল্পটির বাকি অংশের কাজ করবে অন্য দুই সংস্থা। সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে খালের সঙ্গে লাগোয়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল করার দায়িত্বে রয়েছে সিটি করপোরেশন। আর দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে খালের দুই তীরে বৃক্ষরোপণ ও শোভাবর্ধনের কাজ করবে বন বিভাগ।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৯০ সালের দিকে তৎকালীন রংপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ডিমলার জমিদার রাজা জানকীবল্লভ সেন নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খালটি পুনঃখনন করেন। তার মা চৌধুরানী শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামানুসারে খালটির নামকরণ করা হয়। এর আগের নাম ছিল ‘ঘোষের খাল’। খালটি নগরের কেল্লাবন্দ এলাকার ঘাঘট নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে রঘুনাথ, ধাপ, কেরানীপাড়া, গোমস্তাপাড়া, আলমনগর ও মাহিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে আবার ঘাঘট নদীতেই মিশেছে।
একসময় শ্যামাসুন্দরী খালের প্রশস্ততা ছিল ১০০ থেকে ১৫০ ফুট। কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে বর্তমানে তা কমে ২০ থেকে ৩০ ফুটে ঠেকেছে। বহু স্থানে মূল খালের ৪০ ফুটের বেশি অংশ ভরাট হয়ে মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুটে নেমে এসেছে।
বাসাবাড়ি ও হাসপাতাল-ক্লিনিকের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া প্রভাবশালীরা দোকানপাট, মার্কেট ও বসতবাড়ি নির্মাণ করায় খালের স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে বর্ষায় তৈরি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা।
পরিবেশ কর্মী অ্যাডভোকেট পলাশকান্তি নাগ বলেন, শ্যামাসুন্দরী খালকে ঘিরে আর যেন শুধুই প্রকল্প ও বরাদ্দের ঘোষণা না দেখা যায়। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই খালকে দখল ও দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল একটি জলধারা নয়, রংপুরের ইতিহাস ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।
খালটির মূল সংকট দখলদারিত্ব। জেলা প্রশাসন সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলেও তা থমকে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১১৭টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে ৫-৬টি উচ্ছেদ করা হয়। এরপর চারজন অবৈধ দখলদার আদালতের আশ্রয় নিলে উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
সার্বিক বিষয়ে রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, শুধু খনন করলেই শ্যামাসুন্দরীর সংকট দূর হবে না। পুরো ১৬ কিলোমিটার খালের সীমানা চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বয়, বর্জ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না করলে নতুন প্রকল্পও আগেরগুলোর মতো ব্যর্থ হতে পারে।
তিনি জানান, আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুতই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে এবং বর্ষার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি করপোরেশন ও বন বিভাগ যৌথভাবে পুনর্বাসনের কাজ শুরু করবে।

