নতুন ‘অবৈধ’ বসতি, বড় বরাদ্দ: গাজা-পশ্চিম তীরে কী করতে যাচ্ছে ইসরায়েল?

গাজায় তিনটি নতুন অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণে ১৩০ কোটি শেকেল (প্রায় ৪০ কোটি ডলার বা ৫ হাজার কোটি টাকা) বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ।

একই সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রধান কমান্ডার উগ্রপন্থী বসতিগুলোকে সামরিক বাহিনীর ‘নিরাপত্তা অংশীদার’ বলে উল্লেখ করেছেন।

সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ২৭ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট সরকার দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার এবং ফিলিস্তিনিদের দ্রুত উচ্ছেদের প্রচেষ্টা করছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ জানান, উত্তর গাজায় তিনি তিনটি ‘নাহাল’ আউটপোস্ট স্থাপন করতে চান। ‘নাহাল’ হলো এমন এক ধরনের সামরিক কমিউনিটি, যা অতীতে ইসরায়েলি বেসামরিক বসতি স্থাপনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী স্মোত্রিচ ঘোষণা দেন, দখলকৃত পশ্চিম তীরে নতুন কয়েক ডজন ইসরায়েলি বসতি নির্মাণে ১৩০ কোটি শেকেল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত মাসেই মন্ত্রিসভা এই অর্থ অনুমোদন করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বিরোধিতার আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ উগ্রপন্থী বসতিগুলোর বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলেছেন, তিনি তাদের কাজের ‘প্রশংসা’ করেন এবং নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের সামরিক বাহিনীর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেন।

গার্ডিয়ান জানায়, পশ্চিম তীরের একটি বসতিতে বেড়ে ওঠা ব্লুথ বুধবার ‘ফার্মস অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠনের বৈঠকে এসব মন্তব্য করেন। সংগঠনটি এমন সব বসতির প্রতিনিধিত্ব করে, যেগুলো ইসরায়েলের নিজস্ব আইনেও অবৈধ।

সমালোচকদের মতে, এসব উগ্রপন্থী বসতি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও জমি থেকে উৎখাতের জন্য ভয়ভীতি ও সহিংসতা চালানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধানসহ রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরকারি সমর্থনের অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

এ সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনবিষয়ক জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাই আসলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, পশ্চিম তীর দখল ও সংযুক্তির প্রচেষ্টায় ইসরায়েল বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহার করছে এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে এই সহিংসতা আরও বেড়ে চলেছে।

ইসরায়েলি শান্তিবাদী সংগঠন পিস নাউয়ের কর্মী হাগিত ওফরান গার্ডিয়ানকে বলেন, অন্তত সাতটি নতুন বসতিতে ইতোমধ্যে বুলডোজার দিয়ে কাজ চলছে। ভোটের আগেই সেগুলোতে বসতি স্থাপন শুরু হতে পারে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার জনসাধারণের অর্থ খরচ করে দ্রুততার সঙ্গে এমন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে, যা ভবিষ্যতে বদলানো কঠিন হবে।

ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রিত গাজার অংশ পরিদর্শনের সময় কাৎজ নতুন বসতির পরিকল্পনার কথা জানান। এর আগে গাজা থেকে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে দেওয়ারও পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।

চ্যানেল ১৪ টেলিভিশনকে কাৎজ বলেন, উত্তর গাজার যেসব এলাকায় আগে ইসরায়েলি বসতি ছিল, সেখানে তিনি তিনটি নাহাল আউটপোস্ট স্থাপন করতে চান। এগুলো সামরিক স্থাপনাও হবে বলে জানান তিনি।

ভূমি অধিগ্রহণ পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন কেরেম নাভোটের প্রতিষ্ঠাতা দ্রোর এতকেস বলেন, নাহাল আউটপোস্ট দীর্ঘমেয়াদে সামরিক ব্যবহারের জন্য নয়।

তার ভাষ্য, সামরিক উপস্থিতি হলো প্রথম ধাপ। এর উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে সেখানে বেসামরিক বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করা। পশ্চিম তীরের বহু ইসরায়েলি বসতি এভাবেই গড়ে উঠেছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, ১৯৫০-এর দশকে সীমান্ত এলাকায় প্রথম নাহাল বসতি গড়ে তোলা হয়। ১৯৬৭ সালের পর একই পদ্ধতি পশ্চিম তীরেও প্রয়োগ করা হয়—প্রথমে জর্ডান উপত্যকায়, পরে অন্য এলাকাগুলোতে।

গত মাসেও স্মোত্রিচ বলেছিলেন, গাজায় তিনটি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অনুমোদন মিললেই কাজ শুরু করা যাবে। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে নেতানিয়াহুর কার্যালয় কোনো সাড়া দেয়নি।

কাৎজ চ্যানেল ১৪-কে আরও বলেন, গাজার যেসব এলাকায় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরের জায়গায় এখন ধ্বংসস্তূপ পড়ে আছে, সেগুলো দেখে তার ‘ভালো লেগেছে’।

ক্যামেরার সামনে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল তামির ইয়াদাই জানান, বর্তমানে গাজার ৬৫ শতাংশ ভূখণ্ড ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। এই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে নির্ধারিত ৫৩ শতাংশের চেয়েও বেশি।

গার্ডিয়ান জানায়, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বেঁচে যাওয়া প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি এখন গাজার অবশিষ্ট তিন ভাগের একভাগ এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।

ইয়াদাই বলেন, ৬৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং সেখানে ৭০ হাজারের বেশি সন্ত্রাসীকে হত্যা করা—এটাকেই তিনি বিজয় বলবেন।

ইয়াদাইয়ের এই বক্তব্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কারণ, এতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ২১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকেও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহত শিশুদের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি ছিল এক বছরের কম বয়সী।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এর আগে স্বীকার করেছে, গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নিহত ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার মোটামুটি নির্ভুল। সেখানে ৭৩ হাজারের বেশি নিহতের নাম ও ইসরায়েল কর্তৃক ইস্যুকৃত পরিচয়পত্র নম্বর রয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি শিশু, ৬০ বছরের কম বয়সী ১০ হাজারের বেশি নারী এবং ৫ হাজারের বেশি প্রবীণ ব্যক্তি রয়েছেন।

ইয়াদাইয়ের পরিসংখ্যানে নারী, শিশু ও প্রবীণদেরও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে ধরা হয়েছে কি না—গার্ডিয়ানের এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

এক মুখপাত্র বলেন, গাজায় হতাহতের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে সেনাবাহিনী এখনো মূল্যায়ন করছে। কাজটি শেষ হয়নি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেও তা এখনো উপস্থাপন করা হয়নি।

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি সেনা কমান্ডার আভি ব্লুথের সমর্থনের বিষয়েও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায় সেনাবাহিনী।

তাদের ভাষ্য, বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়।

Related Articles

Latest Posts