ঘটনার শুরু চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি। সুন্দরবনের বৈদ্যমারী ফরেস্ট ক্যাম্পের শরকির খালের পাশে মানুষের পাতা ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হয়েছিল এক বাঘিনী। বনকর্মীদের প্রচেষ্টা ও দীর্ঘ ছয় মাসের চিকিৎসার পর সেটি সুস্থ হয়ে উঠলে গত ১৩ জুলাই সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। তবে এর পর থেকে বাঘিনীটির বর্তমান অবস্থান জানা যাচ্ছে না। সেটি আদৌ বেঁচে আছে কি না, তা নিয়ে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। এই বিশেষ দিনে বনে ছাড়া বাঘিনীটির পরিণতি ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দেশের বাঘ সংরক্ষণ পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ ও ১৯টি শাবক রয়েছে।
গত ১৩ জুলাই বাগেরহাটের মোংলার চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের দক্ষিণে সুস্থ করে তোলা বাঘিনীটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বন বিভাগ আট কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বসিয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্যামেরাতেই সেটির ছবি ধরা পড়েনি।
বন কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যামেরা ট্র্যাপ, নিয়মিত টহল ও ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে বাঘিনীটির অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তবে বাঘিনীটির গতিবিধি সরাসরি অনুসরণ করার জন্য অবমুক্তির সময় তার শরীরে কোনো রেডিও কলার বা ট্র্যাকার লাগানো হয়নি।
এদিকে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই বাঘের দেখা মিলছে। গত সোমবার পূর্ব বন বিভাগের কচিখালী এলাকায় বন থেকে বেরিয়ে একটি বাঘকে খালে নামতে দেখেন বনকর্মীরা।
এর চার দিন আগে বাগেরহাটের মোংলার চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিসের কাছে আরেকটি বাঘের দেখা মেলে। এটি ২০২১ সালে সুন্দরবনে গড়ে তোলা চারটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের একটি।
তবে বন বিভাগ নিশ্চিত করেছে, সম্প্রতি দেখা যাওয়া বাঘগুলোর কোনটিই চিকিৎসা শেষে অবমুক্ত করা সেই বাঘিনী নয়।
চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, গায়ের ডোরাকাটা দাগ মিলছে না। তবে বাঘিনীটিকে বনের যে অংশে ছাড়া হয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। আশা করা যায়, সেখানে টিকে থাকতে তার কোনো সমস্যা হবে না।
ক্যামেরা ট্র্যাপগুলোতে অন্য বাঘ ছাড়াও চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, বনমোরগ, বন্য শূকর, মেছো বাঘ ও উদ্বিড়ালের ছবি ধরা পড়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা নতুন করে আরও তিনটি বাঘিনীকে শনাক্ত করেছি, তবে উদ্ধার ও অবমুক্ত করা বাঘিনীটির ছবি মেলেনি।
বন কর্মকর্তারা আরও জানান, নিয়মিত টহলের সময় তারা আগের চেয়ে বেশি বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছেন।
তবে বাঘিনীটিকে সঠিকভাবে অবমুক্ত করা হয়েছে কি না এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মনিটরিং করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
বন্যপ্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, রেডিও কলার বা কোনো ট্র্যাকার ছাড়াই বাঘিনীটিকে এভাবে তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে দেওয়া কতটা ঠিক হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। তাকে যদি সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হতো, তবে অন্তত জানা যেত সে কোথায় আছে এবং সুস্থ আছে কি না। এখন সে আদৌ বেঁচে আছে কি না, তাও আমরা জানি না।
তিনি আরও বলেন, অন্য বাঘ, এমনকি বন্য শূকরও তার জন্য হুমকি হতে পারে। তাই তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
মনিটরিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি যোগ করেন, ড্রোন দিয়ে ট্র্যাকিং করা হলে তা কতটা কার্যকর ড্রোন—তা জানা দরকার। দক্ষ ট্র্যাকারদের দিয়ে তার গতিবিধি নজরদারি করা যেত, কিন্তু আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাইনি। আমাদের ‘টাইগার রেসপন্স টিম’ ছিল, যাদের ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকায় মনিটরিংয়ের কাজে লাগানো যেত।
তিনি মনে করেন, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে অবমুক্ত করা উচিত ছিল। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, পুনর্বাসন, পুনঃঅবমুক্তকরণ, গবেষণা এবং মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষায়িত ‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ (ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট)’ গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
রেজা খান বলেন, এই বাঘিনীকে সুস্থ করে আবার সুন্দরবনে ফিরিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিরল ঘটনা। কিন্তু আমরা সেই বিরল ঘটনাটির পূর্ণ মর্যাদা রক্ষা করতে পারিনি।
বাঘ বিশেষজ্ঞ খসরু চৌধুরীও মনে করেন অবমুক্তকরণ-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, এই তড়িঘড়ি করে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি অবিমৃশ্যকারিতা, ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে কাজ করা। এই বাঘিনী ছয় মাস মানুষের নিবিড় পরিচর্যায় ছিল এবং মানুষের সান্নিধ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। সে যেহেতু জানে মানুষের কাছ থেকে খাবার পাওয়া যায়, তাই আবারও মানুষের কাছে যেতে চেষ্টা করলে তা সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে। কাজটা অপেশাদার হয়ে গেছে।
তবে বন বিভাগ বলছে, বাঘিনীটিকে শনাক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সুন্দরবনের প্রধান বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ বলেন, আমরা আগামী সপ্তাহে আরও ২০টি ক্যামেরা বসাব। ড্রোন দিয়েও তদারকি চলছে। বাঘিনীটির কোনো সমস্যা হলে বা মারা গেলে আমাদের নিয়মিত টহল দল অবশ্যই তা ট্রেস করতে পারত।
তিনি বলেন, বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। সুন্দরবনে তিন মাসের পরিবেশ নিষেধাজ্ঞা বাঘের নিরাপত্তায় সাহায্য করছে। এ ছাড়া বনের ভেতরে তাদের মিষ্টি পানির জন্য পুকুর খনন ও ঝড়ের সময় আশ্রয় নেওয়ার জন্য উঁচু ঢিবি তৈরি করা হচ্ছে। লোকালয়ে বাঘ আসা ঠেকাতে আমরা প্রায় ৭৪ কিলোমিটার নাইলনের বেড়াও দিয়েছি। তবে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো হরিণ শিকারি, বনদস্যু এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র।

