সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবছে খুলনা শহর, ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়েও মিলছে না সুফল

আবারো সামনে এসেছে খুলনা শহরের চেনা জলাবদ্ধতার চিত্র। গতকাল মঙ্গলবার রাতভর বৃষ্টি এবং বুধবার সকালেও দফায় দফায় বর্ষণে নগরের প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি অলিগলিও পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে, ফলে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।

শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই শতাধিক ড্রেন নির্মাণ এবং সাতটি খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে। বাসিন্দাদের প্রশ্ন—এত কিছুর পরও কেন বৃষ্টি হলেই শহর পানির নিচে চলে যায়।

আজ বুধবার সকালে  সরেজমিন দেখা যায়, শহরের আবু নাসের মোড়, উল্লাস পার্ক মোড়, আহসান আহমেদ রোড, রয়েল মোড়, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চানমারী, লবণচরা, টুটপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, রূপসা নতুন বাজারসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে আছে। নতুন রাস্তা মোড় থেকে খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল (আবু নাসের হাসপাতাল) মোড় এবং মুজগুন্নি সড়কের বড় অংশও আছে।

কোথাও পানিতে নষ্ট হয়ে ইজিবাইক সড়কের মাঝেই বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, আবার কোথাও যাত্রী নামিয়ে রিকশা ঠেলে এগোতেও দেখা যায় চালকদের। ভেজা ইউনিফর্ম পরে এমন দুর্ভোগের মধ্যেই পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয় স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে অফিসগামী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধ সড়ক পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়।

১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও ইজিবাইকের চালক মো. রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, রাস্তায় নেমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। পুলিশ লাইনের সামনের সড়কে অনেক পানি ছিল। মোটরে পানি ঢুকে দুবার আমার ইজিবাইক বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিবারই যাত্রী নামিয়ে অন্যদের সহায়তায় গাড়ি ঠেলে শুকনো জায়গায় নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, মোটরে পানি ঢুকে আরও অনেক চালকের ইজিবাইক একইভাবে বিকল হয়ে পড়ে। কয়েকটি ট্রিপ বাতিল করতে হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, নগরের ৩, ৭, ৯, ২২, ২৩ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। বৃষ্টির সঙ্গে রূপসা নদীতে জোয়ার এলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। তখন নদীর পানি ড্রেন দিয়ে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং স্ট্যান্ড রোড, চানমারী, কেএমপি সদরদপ্তর এলাকা, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

দৌলতপুর, খালিশপুর, বয়রা, মুজগুন্নি ও কবির বটতলা এলাকার পানি কারিগরপাড়া খাল হয়ে ময়ূর নদে যাওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এই পানি ঠিকমতো প্রবাহিত হতে পারছে না।

নগরবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা, ২২টি খাল পুনরুদ্ধার ও সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতা, জলাধার ভরাট, নদী ও খাল দখল এবং বিভিন্ন সড়কে চলমান উন্নয়নকাজের কারণে ড্রেন বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধতা দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের কনজারভেন্সি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নগরে ড্রেনের মোট দৈর্ঘ্য এক হাজার ১৬৫ কিলোমিটার। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অধিকাংশ ড্রেন ঢাকনাযুক্ত। কিন্তু এসব ড্রেন পরিষ্কারের কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকায় ম্যানুয়ালি পরিষ্কার করতে হয়। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না।

৩১ নম্বর ওয়ার্ডের চানমারী এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, এক সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৃষ্টির পানি নেমে যেত। এখন মাঝারি বৃষ্টিতেই দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। ড্রেন হয়েছে, কালভার্ট হয়েছে, কিন্তু জলাবদ্ধতা কমেনি।

তিনি বলেন, আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এটি এখন স্থায়ী দুর্ভোগ। বৃষ্টি হলেই কাজ কমে যায়, আয়ও কমে যায়।

খুলনা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, গত দুই দশকে খুলনার জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার মতে, ভৈরব ও রূপসা নদী নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষার পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারে না, উল্টো জোয়ারের পানি শহরে ঢুকে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, শহরের পশ্চিম পাশের নিচু জলাধারগুলো আবাসন প্রকল্পের জন্য ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ধারণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহর পানির নিচে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, পাঁচ বছর আগে খুলনা মহানগর ও জেলার তিনটি উপজেলার ময়ূর নদসহ ২৬টি খালে ৪৬০ জন দখলদার এবং ৩৮২টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হলেও সেগুলো উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ময়ূর নদ খনন করা হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় নদীর পাড়ে ফেলে রাখা মাটি আবার বৃষ্টির পানিতে নদীতে ফিরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আলুতলা গেট খুলে ময়ূর নদকে রূপসা নদীর সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা গেলে পানি নিষ্কাশন অনেক সহজ হবে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মিজানুর রহমান জানান, বুধবার সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া দুই দিনের মধ্যে সাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হলে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে।

খুলনার জলাবদ্ধতা অবশ্য নতুন সমস্যা নয়। ২০০৮-১৩ সালে তৎকালীন মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে শতকোটি টাকার নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এরপর ২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনী প্রচারণায়ও জলাবদ্ধতা নিরসন ছিল তার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি।

পরে ৮২৩ কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প অনুমোদন হয়। এই প্রকল্পের আওতায় গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় দুই শতাধিক ড্রেন নির্মাণ এবং ময়ূর নদসহ সাতটি খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। তবুও নগরবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের অধীনে দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি হলেও বৃষ্টির দিনে তার সুফল মিলছে না।

কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। অনেক কাজ শেষ হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বাকি রয়েছে। বিশেষ করে পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেট সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হলে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, চার দশক ধরে প্রতিটি নির্বাচনে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং সামান্য বৃষ্টিতেই খুলনা শহর পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

তার মতে, প্রকল্প গ্রহণের আগে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং নগরীর ২২টি খালের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ছাড়া খুলনার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

Related Articles

Latest Posts