রেকর্ডের রাজসিংহাসনে মেসি: পরিসংখ্যানে শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য দলিল

দুয়ারে কড়া নাড়ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। দলগুলোর রণকৌশল, স্কোয়াড আর সূচি নিয়ে যেমন আলোচনার পারদ তুঙ্গে, ঠিক তেমনি ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষায় আছে এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় দেখার। ৩৯ বছর ছুঁইছুঁই লিওনেল মেসির জন্য এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে শেষবারের মতো দ্যুতি ছড়ানোর সুযোগ। গত দুই দশক ধরে এই টুর্নামেন্টকে রাঙিয়ে তিনি যেসব ইতিহাস গড়েছেন, বিদায়ী মঞ্চে নামার আগে তার আসব অর্জনের খতিয়ানে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া তাই প্রাসঙ্গিক।

বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার সমৃদ্ধ ইতিহাসে মেসির এই পথচলা শুধুই শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক নয়, বরং তার অদম্য শারীরিক ও মানসিক শক্তিরও অনন্য নিদর্শন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মাঠে তার ভূমিকা ও পজিশনে পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু দলের প্রাণভোমরা হিসেবে তিনি থেকে গেছেন আগের মতোই অপরিহার্য। সবশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে অপ্রত্যাশিত হারের পর দলকে যেভাবে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলেন, সেটার পুরোটা জুড়েই ছিল তার জাদুকরী নেতৃত্বের ছাপ।

৩৬ বছরের শিরোপাখরা ঘুচিয়ে আকাশি-সাদাদের মরুর বুকে বিশ্বজয় মূলত মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারেরই পূর্ণতা দিয়েছিল। কারণ ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য সব বড় শিরোপা জেতা এই মহাতারকার মুকুটে কাতারে মাটিতেই যুক্ত হয়েছিল আরাধ্য সেই সোনালী পালক।

২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে ফিরে তাকানো যাক মেসির অতিমানবীয় রেকর্ডগুলোর দিকে, গত পাঁচটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে যা তাকে নিয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরের এক অনন্য উচ্চতায়।

* বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ পাঁচটি আসরে খেলার বিরল রেকর্ডের তালিকায় আছেন মেসি। তিনি ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে মাঠে নেমেছেন। বাকি পাঁচজন হলেন জার্মানির লোথার ম্যাথাউস, পর্তুগালের ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এবং মেক্সিকোর আন্তোনিও কারবাহাল, রাফায়েল মার্কেজ ও আন্দ্রেস গুয়ার্দাদো।

* মেসিই বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের পাঁচটি ভিন্ন আসরে গোল করিয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ব্রাজিলের পেলে, পোল্যান্ডের জেগজ লাটো, আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা ও ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহ্যাম। তারা প্রত্যেকে তিনটি করে আসরে অ্যাসিস্ট করেছিলেন।

*  সবশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালটি ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির ২৬তম ম্যাচ। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন। তিনি ২০০৬ সালে তিনটি, ২০১০ সালে পাঁচটি, ২০১৪ সালে সাতটি, ২০১৮ সালে চারটি ও ২০২২ সালে সাতটি ম্যাচ খেলেন। আগের কীর্তিটি ছিল ম্যাথাউসের (২৫ ম্যাচ)।

* বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি। তার গোল সংখ্যা ১৩টি। এই তালিকায় পরের স্থানগুলোতে রয়েছেন যথাক্রমে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা (১০ গোল), ম্যারাডোনা (৮ গোল), গিয়ের্মো স্তাবিল (৮ গোল), মারিও কেম্পেস (৬ গোল) ও গঞ্জালো হিগুয়াইন (৫ গোল)।

* বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ ১১ বার ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন মেসি। এর মধ্যে কেবল কাতার বিশ্বকাপেই তিনি পাঁচবার ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছিল।

* বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি দুবার গোল্ডেন বল জিতেছেন। তিনি ২০১৪ সালের ব্রাজিল ও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন। ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হলেও কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জিতে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। এতে পরম আরাধ্য সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার স্বাদ লাভ করেন মেসি।

* ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে সবচেয়ে বেশি মিনিট খেলার রেকর্ডও মেসির দখলে। তিনি মোট ২ হাজার ৩১৪ মিনিট মাঠে থেকেছেন। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল চলাকালীন তিনি পেছনে ফেলেন ইতালির পাওলো মালদিনিকে (২ হাজার ২১৭ মিনিট)।

* বিশ্বকাপে মেসি অধিনায়ক হিসেবে সবার চেয়ে বেশি ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন। এই তালিকায় তার পেছনে রয়েছেন মার্কেজ (১৭ ম্যাচ) ও ম্যারাডোনা (১৬ ম্যাচ)।

* মেসিই ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার, যিনি কোনো একটি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব, শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল— প্রতিটি ধাপেই গোল করার বিরল রেকর্ড গড়েছেন। কাতারে অনুষ্ঠিত আসরে তিনি এই কীর্তি সম্পন্ন করেন। কেবল গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে পোল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

* বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২১টি গোলে সরাসরি অবদান রাখার রেকর্ড যৌথভাবে মেসি ও ব্রাজিলের পেলের দখলে। নকআউট পর্বে সর্বোচ্চ ছয়টি অ্যাসিস্ট করার কীর্তিও রয়েছে তাদের নামের পাশে।

* ২০০৬ সালের আসরের গ্রুপ পর্বে সার্বিয়া অ্যান্ড মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে মেসি যখন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করেন, তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৫৭ দিন। তিনি বিশ্বকাপের সপ্তম কনিষ্ঠতম গোলদাতা। এই তালিকার শীর্ষে আছেন পেলে। ১৯৫৮ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে গোল করার সময় তার বয়স ছিল ১৭ বছর ২৩৯ দিন।

* বিশ্বকাপের ইতিহাসে সব মিলিয়ে গোল করার সবচেয়ে বেশি সুযোগ (৬৭টি) তৈরির রেকর্ডটি যৌথভাবে মেসি ও ম্যারাডোনার দখলে। এর মধ্যে কাতারে অনুষ্ঠিত আসরে মেসি ২১টি সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

* মোট ১২১টি সফল ড্রিবলিং মেসি সম্পন্ন করেছেন, যা বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বাধিক। ২০১৪ সালে তিনি ৪৬টি সফল ড্রিবলিং করেছিলেন, যা কোনো একটি আসরে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এই তালিকায় তার উপরে আছেন ব্রাজিলের জারজিনিয়ো (১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ৪৭টি) ও ম্যারাডোনা (১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ৫৩টি)।

Related Articles

Latest Posts