ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো এখনো কতটা অক্ষত?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জনসমক্ষে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিসহ সামরিক বাহিনী ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে—এমন দাবি করলেও, পেন্টাগনের গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রের কথা বলছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার গোপন মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও মোবাইল উৎক্ষেপণ যন্ত্রের ৭০ শতাংশ এখনো অক্ষত রয়েছে। একইসঙ্গে ৯০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি পুনরায় সচল করেছে দেশটি।

আজ বুধবার মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইরানের সামরিক সক্ষমতার প্রকৃত চিত্র।

স্যাটেলাইট ছবি ও অন্যান্য নজরদারির তথ্য বিশ্লেষণ করে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের যে ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ছিল, তার প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো তাদের কাছে অক্ষত রয়েছে।

এই মজুতের মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও স্বল্পপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে ইরান।

শুধু তাই নয়, মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ঘাঁটি ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ আংশিক বা পুরোপুরি কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে ইরান।

গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির পাশে ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিতেই আবার কার্যক্রম চালানোর মতো সক্ষমতা ফিরে এসেছে।

ইরান চাইলে এসব ঘাঁটি থেকে হরমুজে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হরমুজের আশপাশে ইরানের মাত্র তিনটি ঘাঁটি পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন ঘাঁটিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ভিন্ন হলেও ইরান এখনো সেসব ঘাঁটির ভেতরে থাকা মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র ব্যবহার করতে পারছে।

কোথাও কোথাও সরাসরি ঘাঁটির ভেতর থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া সম্ভব বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংসের ক্ষেত্রে কৌশলগত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমার মজুত সীমিত হওয়ায় পেন্টাগন অনেক ক্ষেত্রে পুরো স্থাপনাটি ধ্বংস না করে শুধুমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করার কৌশল প্রয়োগ করেছে।

এর ফলে বাইরে থেকে ইরানের ঘাঁটিগুলো বিধ্বস্ত দেখালেও ভেতরে সব কিছু ঠিকঠাক ছিল বলে উল্লেখ করেছেন গোয়েন্দারা।

বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্যবহার না করার পেছনে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের যুক্তি ছিল, উত্তর কোরিয়া বা চীনকে ঘিরে সম্ভাব্য এশীয় সংঘাতের জন্য আগামীতে এসব বোমা প্রয়োজন হতে পারে।

গত ৯ মার্চ ট্রাম্প সিএসবি নিউজকে বলেছিলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে এবং সামরিক অর্থে দেশটির আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’

আর গত ৮ এপ্রিল পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি ইরানের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং বহু বছরের জন্য অকার্যকর করেছে।’

কিন্তু সাম্প্রতিক গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়ন, ট্রাম্প প্রশাসনের এসব প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে জানাতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস ট্রাম্পের অবস্থানই পুনরায় তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘ইরানের সামরিক বাহিনী গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

তার মতে, যারা মনে করে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে, তারা হয় বিভ্রান্ত, নয়তো আইআরজিসির মুখপাত্র।

পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র জোয়াল ভ্যালডেজ সংবাদ মাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ কিছু গণমাধ্যম এমনভাবে প্রতিবেদন করছে যেন তারা ইরানি শাসনের জনসংযোগ কর্মকর্তা।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গোয়েন্দা মূল্যায়ন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় সংকেত।

কারণ যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান চালাতে হতে পারে।

তবে ইরান যুদ্ধে ইতোমধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হারিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

এর মধ্যে রয়েছে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ হাজার ১০০ দীর্ঘপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা তাদের অবশিষ্ট মজুতের প্রায় সমান।

এছাড়া ১ হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা পেন্টাগন এক বছরে যত সংগ্রহ করে তার প্রায় ১০ গুণ।

প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে ১ হাজার ৩০০টির বেশি, যা উৎপাদন করতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের।

বর্তমানে বছরে প্রায় ৬৫০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র।

বছরে ২ হাজারটি উৎপাদনের পরিকল্পনা করলেও তা সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এই মজুত পূরণে কয়েক মাস নয়, কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

যদিও পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল দাবি করেছেন, মিশন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় যে ট্রাম্প ও তার সামরিক উপদেষ্টারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণকে অতিমূল্যায়ন করেছেন। একইসঙ্গে ইরানের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছেন।

Related Articles

Latest Posts