কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর গল্প নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে এখন তারুণ্য ধরে রাখার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপাদান হয়ে উঠেছে মৃত মানুষের শরীর থেকে প্রক্রিয়াজাত করা ত্বক। বলিরেখা মুছে ফেলে ‘তরুণ মুখ’ পাওয়ার এই তীব্র আকুলতায় অভিজাত ক্লিনিকগুলোতে এখন উপচে পড়া ভিড়, নিমেষেই ফুরিয়ে যাচ্ছে ওষুধের শিশি।
তবে রূপচর্চার এই অন্ধ দৌড়ে মৃতদেহের টিস্যু ব্যবহার করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর নৈতিক ও আইনি বিতর্ক।
আলো ঝলমলে সৌন্দর্যশিল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই মোড় ঘোরানো ও চমকপ্রদ বাস্তবতা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।
সিউলের এক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ যখন ব্লুমবার্গকে তার ক্লিনিকের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির কথা প্রথম বলেছিলেন, তখন সারা ইউন নামে এক সেবাগ্রহীতা কিছুটা হতবাক হয়েছিলেন।
চিকিৎসক ইংরেজিতে খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তাই তার কথাগুলো ত্বকের পরিচর্যার চেয়ে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতোই বেশি শোনাচ্ছিল।
তিনি বলেছিলেন, ‘এটা মৃত মানুষের শরীর থেকে তৈরি।’
মার্কিন নাগরিক ৪০ বছর বয়সী ইনফ্লুয়েন্সার সারা ইউন এক মুহূর্ত থমকে গেলেও খুব বেশি ভাবেননি। ২০২৩ সালে তিনি সিউলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
তিনি বলেন, শহরের অভিজাত গ্যাংনাম এলাকার ঝকঝকে ক্লিনিকগুলোতে এখন দান করা মানুষের ত্বক থেকে তৈরি এই চিকিৎসা সবচেয়ে জনপ্রিয় সৌন্দর্যচর্চার অন্যতম উপকরণ।
রোগীরা সিরিয়াল দিচ্ছেন, ওষুধের শিশি দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর এই প্রযুক্তির পথিকৃৎ দক্ষিণ কোরিয়ার বায়োটেক প্রতিষ্ঠান এলঅ্যান্ডসি বায়োর শেয়ারের দাম গত এক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
ইউনের সামান্য দ্বিধা দেখিয়ে দেয়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত উপাদানগুলোর একটি কত দ্রুত দক্ষিণ কোরিয়ার সৌন্দর্যচর্চার মূলধারায় জায়গা করে নিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘ডং-আন’ অর্থাৎ ‘তরুণ দেখায় এমন মুখ’ অর্জনের প্রবল আগ্রহ নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির খোঁজকে সব সময়ই ত্বরান্বিত করেছে।
তবে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও নজর কেড়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, দান করা মানুষের টিস্যু সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসায় ব্যবহার করা নৈতিক কি না। একইসঙ্গে তাদের আশঙ্কা, এতে স্তন পুনর্গঠন বা দগ্ধ রোগীর চিকিৎসার মতো প্রচলিত চিকিৎসায় ব্যবহৃত মানব টিস্যুর সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
ইউন বলেন, ‘আমি একটু বেশি পরীক্ষামূলক মানসিকতার। এখানে এসে চিকিৎসকদের ওপর অনেক বেশি আস্থা রাখতে শিখেছি।’
বর্তমানের জনপ্রিয় অনেক স্কিন বুস্টার, যেমন স্যামনের ডিএনএ ভিত্তিক রেজুরান বা শূকরের কোলাজেন থেকে তৈরি ল্যাটিজেন ত্বকের নিজস্ব কোলাজেন উৎপাদন বাড়াতে কাজ করে।
কিন্তু বয়স বাড়লে বা ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারের কারণে মুখের মাংস কমে গেলে (যা ‘ওজেম্পিক ফেস’ নামে পরিচিত) শরীরের কোলাজেন তৈরির ক্ষমতা কমে যায়।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে বাজারে এসেছে আরইটুও (Re2O)। এই চিকিৎসায় মানুষের প্রক্রিয়াজাত ত্বক থেকে তৈরি এক্সট্রাসেলুলার ম্যাট্রিক্সের (ইসিএম) ৬ মিলিলিটারের একটি ভায়াল মুখ ও গলায় ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির স্লোগান, ‘ত্বকের ওপর ত্বক।’
এই উপাদান ত্বকের নিচে একটি কাঠামো তৈরি করে, যা সূক্ষ্ম বলিরেখা ভরাট করে, রোমকূপ টানটান করে এবং শরীরের নতুন কোষ গজানোর ভিত্তি তৈরি করে।
একেকটি চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা নেন ৬ লাখ থেকে ৮ লাখ ওন (প্রায় ৪০০–৫৩০ ডলার)। অন্যদিকে প্রচলিত স্কিন বুস্টারের খরচ ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ওন।
আরইটুওতে ব্যবহৃত ত্বক যুক্তরাষ্ট্রে দান করা মানব টিস্যু থেকে সংগ্রহ করা হয়। এগুলো অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সিং টিস্যু অ্যান্ড বায়োলজিকসের (এএটিবি) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রত্যয়নপ্রাপ্ত। এই সংস্থা নিরাপদে মানব টিস্যু ব্যবহারের মানদণ্ড এবং দাতার সম্মতি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এএটিবি সনদপ্রাপ্ত মানব টিস্যু দিয়ে একই ধরনের স্কিন বুস্টার তৈরি করছে।
সিউলের ডিওডি ডার্মাটোলজি ক্লিনিকের প্রধান চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ কিম হান-সেম ব্লুমবার্গকে বলেন, এখানে শুধু ত্বকের কাঠামো ব্যবহার করা হয়। কোষগুলো আগে থেকেই সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা এটি প্রত্যাখ্যান না করে এবং অ্যালার্জির ঝুঁকি না থাকে।
তার ভাষ্য, বয়সজনিত বা ক্ষতিগ্রস্ত ত্বকে এটি কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায় না, বরং ত্বকের কাঠামোই নতুন করে গড়ে তোলে। এ কারণেই এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চিকিৎসা।
২০২৪ সালের শেষ দিকে চালুর পর থেকেই এর চাহিদা উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে বেশি বলে জানান তিনি। অনেক রোগীকেই অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বয়স বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ ত্বকের এক্সট্রাসেলুলার ম্যাট্রিক্স (ইসিএম) ধীরে ধীরে ভেঙে যাওয়া। কোলাজেনসমৃদ্ধ এই কাঠামোই ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ও দৃঢ়তা বজায় রাখে। এটি ক্ষয় হতে শুরু করলে ত্বক ঝুলে পড়ে এবং রক্তনালিও দুর্বল হয়ে যায়।
আরইটুওর লক্ষ্য শরীরকে নতুন কোলাজেন তৈরি করতে উৎসাহিত করা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া সেই কাঠামোই প্রতিস্থাপন করা।
একই ধরনের প্রযুক্তি এখন যুক্তরাষ্ট্রেও জনপ্রিয় হচ্ছে। সেখানে রেনুভা নামে একটি পণ্য হলিউডের তারকাদের মধ্যে আলোচনায় এসেছে। তবে এটি ত্বক নয়, দান করা মানব চর্বি থেকে তৈরি। কয়েক মাসের মধ্যে রোগীর নিজের কোষ সেখানে বৃদ্ধি পেয়ে অস্ত্রোপচার ছাড়াই মুখের হারানো ভলিউম ফিরিয়ে আনে।
বিশ্বজুড়ে বয়সের ছাপ কমানোর চিকিৎসার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। প্রিসিডেন্স রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অ্যান্টি-এজিং বাজারের আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে পৌঁছাবে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে।
এই প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে এশিয়া। আয় বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যা এই বাজারকে সম্প্রসারিত করছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি পাঁচজনের একজন এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি চারজনের একজনের বয়স হবে ৬০ বছরের বেশি।
এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি এলঅ্যান্ডসি বায়ো। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯১৭ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৬০০ কোটি ওনে।
বর্তমানে তারা প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার ভায়াল আরইটুও উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী লি হোয়ান-চুল জানান, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে উৎপাদন ১ লাখ ৫০ হাজার ভায়ালে এবং পরবর্তী কয়েক বছরে ৩ লাখ ভায়ালে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, কে-বিউটির জনপ্রিয়তার কারণে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের কাছে অনুসন্ধান আসছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর ও জাপানে আরইটুও রপ্তানি করা হচ্ছে। এ বছর অস্ট্রেলিয়া, হংকং, মালয়েশিয়া, রাশিয়া ও থাইল্যান্ডে এবং আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে মানব টিস্যু দিয়ে তৈরি প্রসাধনমূলক চিকিৎসা নিয়ে বিতর্কও বাড়ছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, সৌন্দর্যচর্চায় চাহিদা বাড়লে চিকিৎসা খাতে প্রয়োজনীয় মানব টিস্যুর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার পার্লামেন্টে এ বিষয়ে শুনানিতে আইনপ্রণেতারা সম্ভাব্য সংকট ঠেকাতে নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দাবি জানান। বর্তমানে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে দক্ষিণ কোরিয়ার খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
স্বাস্থ্যবিষয়ক আইনজীবী কওন ডং-জু সংসদে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলেন, যথেষ্ট ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, পণ্যের অনুমোদন ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ছাড়াই এসব স্কিন বুস্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি প্রসাধনী চিকিৎসায় মানব টিস্যুর ব্যবহার নিষিদ্ধ, এসব ইনজেকশনকে ওষুধ হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাস এবং দাতা ও রোগী—উভয়ের জন্য আরও কঠোর অবহিত সম্মতির (ইনফর্মড কনসেন্ট) ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান।
তবে এএটিবি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রসাধনী চিকিৎসায় মানব টিস্যুর ব্যবহার অন্য চিকিৎসার জন্য টিস্যুর প্রাপ্যতায় কোনো প্রভাব ফেলেছে—এমন তথ্য তাদের জানা নেই।
অন্যদিকে এলঅ্যান্ডসি বায়োর প্রধান নির্বাহী বলেন, তাদের সম্মতিপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে যে দান করা টিস্যু প্রসাধনী চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হতে পারে।
তার দাবি, টিস্যুর ঘাটতির অভিযোগ অতিরঞ্জিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি আরও জানান, বাধ্যতামূলক না হলেও প্রতিষ্ঠানটি চার লাখের বেশি ক্লিনিক্যাল কেসের তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হলে তারা সেটিকে স্বাগত জানাবে।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও এ বিষয়ে জনমত বিভক্ত। চলতি বছরের মার্চে পরিচালিত এক জরিপে প্রায় ৬৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা কেবল তখনই মানব টিস্যু দান করতে রাজি হবেন, যদি তা শুধু প্রচলিত চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ এই চিকিৎসাকে ‘মৃতদেহের তরল’ বলেও সমালোচনা করছেন।
তবে চিকিৎসক কিম হান-সেমের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি বলেন, রোগীরা যখন জানতে পারেন এটি মানুষের টিস্যু থেকে তৈরি, তখন ভয় পাওয়ার বদলে বেশির ভাগই বলেন, মানুষের শরীর থেকেই যদি আসে, তাহলে তো আরও নিরাপদ হওয়ার কথা।
তবে তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, এখন বাজারে এমন অনেক পণ্য আসছে, যেগুলো এএটিবি সনদপ্রাপ্ত টিস্যু থেকে তৈরি নয়। তখন কেউই জানতে পারবে না, সেই মানব টিস্যু কোথা থেকে এসেছে বা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না।
এদিকে সারা ইউন ইতোমধ্যে তার পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা করছেন। তার দাবি, জীবনে কখনোই তার ত্বক এত ভালো দেখায়নি।
শেষ পর্যন্ত তাকে রাজি করিয়েছিল তার চিকিৎসকের নিজের ওপর চালানো একটি পরীক্ষা। চিকিৎসক নিজের মুখের এক পাশে আরইটুও ব্যবহার করেছিলেন, অন্য পাশটি রেখেছিলেন আগের মতো। এক সপ্তাহ পর তিনি নিজেই পার্থক্য দেখতে পেয়েছিলেন।
ইউন বলেন, ‘ওই পরীক্ষাটাই শেষ পর্যন্ত আমাকে বিশ্বাস করিয়েছে।’

