মশা কেন মানুষের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক, জেনে নিন আদ্যোপান্ত

পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীর তালিকা তৈরি করলে সেখানে অনিবার্যভাবে থাকবে সিংহ, বাঘ, কুমির, হাঙর কিংবা বিষধর সাপ। এরা সবাই শক্তি, গতি বা শারীরিক সক্ষমতায় অনেক এগিয়ে। কিন্তু প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় খুব ছোট্ট একটি প্রাণীর কারণে! সে মোটেও বাঘ-সিংহের মতো শক্তিশালী নয়। আর ছোট্ট সেই প্রাণীটির নাম মশা।

মানব ইতিহাসে মশাকে সবচেয়ে সফল শিকারি হিসেবে ধরা হয়। মশা শক্তিশালী কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী নয়, বরং একটি ক্ষুদ্র ভেক্টর ইনসেক্ট। এরা সরাসরি মানুষকে হত্যা করে না, কিন্তু রোগ ছড়িয়ে মৃত্যুর বিশাল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে রেখেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়ার্ল্ড ম্যালেরিয়া রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৮২ মিলিয়ন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে, এবং প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং ভয়াবহ একটি বাস্তবতা। যেখানে আধুনিক চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক উন্নয়নের পরও একটি ক্ষুদ্র প্রাণী মানবজীবনের ওপর বিশাল নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

বিশ্বের ম্যালেরিয়ার বোঝার প্রায় পুরো চাপই এখনো আফ্রিকা মহাদেশ বহন করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৪ শতাংশ ম্যালেরিয়া এবং ৯৫ শতাংশ মৃত্যু সাব-সাহারান আফ্রিকায় ঘটে।

বিশেষ করে নাইজেরিয়া, ডিআর কঙ্গো, উগান্ডা, মোজাম্বিক ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোতে মশাবাহিত রোগ ভয়ংকর আকারে ছড়িয়ে আছে। যেখানে অনেক শিশু জন্মের পর থেকেই জীবনের ঝুঁকির মধ্যে বড় হয়।

অনেক প্রজাতির মশা, যেমন কিউলেক্স মিঠা বা স্থির পানির ওপর ডিম পাড়ে। এই পানি হতে পারে টিনের কৌটা, ড্রাম, পশুর পানির পাত্র, সুইমিং পুল, জলাবদ্ধ গর্ত, খাল, নালা, ড্রেন বা জলাভূমি। সাধারণত ঘাস ও আগাছা দিয়ে বাতাস থেকে আড়াল করা পানিতে মশারা ডিম পাড়তে বেশি পছন্দ করে।

কিউলেক্স মশা সাধারণত রাতে ডিম পাড়ে। তারা একসঙ্গে ১০০ থেকে ৩০০টি ডিম জোড়া লাগিয়ে একটি ভেলার মতো গুচ্ছ তৈরি করে। পানির ওপর ভাসমান এই ডিমের ভেলাটি দেখতে কালো ধুলোর ছোট্ট দানার মতো লাগে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় এক-চতুর্থাংশ ইঞ্চি এবং প্রস্থ প্রায় এক-অষ্টমাংশ ইঞ্চি। একটি স্ত্রী মশা তার জীবদ্দশায় প্রায় প্রতি তিন রাত পরপর একটি করে ডিমের ভেলা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে অ্যানোফিলিস এবং আরও অনেক প্রজাতির মশা পানির ওপর একটি একটি করে ডিম পাড়ে। এডিস ও ওকলেরোটাটাস সাধারণত স্যাঁতসেঁতে মাটিতে আলাদা আলাদা ডিম দেয়। এডিস ও ওকলেরোটাটাসের ডিম শুকনো পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে। কিছু ক্ষেত্রে ডিম ফোটার আগে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়া প্রয়োজন হয়। পরে যখন বৃষ্টি, জোয়ার, সেচ বা বন্যার পানিতে ডিম ডুবে যায়, তখন সেগুলো ফুটে বের হয়।

সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ডিম থেকে ক্ষুদ্র লার্ভা বের হয়ে আসে এবং অধিকাংশ ডিম প্রায় একই সময়ে ফোটে।

মশার লার্ভাকে সাধারণভাবে ‘উইগলার’ বলা হয়। পানির তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে তারা ৪ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত পানিতে বসবাস করে। প্রায় সব মশার লার্ভাকেই শ্বাস নেওয়ার জন্য বারবার পানির উপরিভাগে উঠতে হয়। তারা সাইফন নামে একটি শ্বাসনালির মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে।

লার্ভারা প্রায় সারাক্ষণই খেতে থাকে। কারণ তাদের দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য প্রচুর শক্তি প্রয়োজন হয়। তাদের প্রধান খাদ্য হলো শৈবাল, প্ল্যাঙ্কটন, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব।

বৃদ্ধির সময় লার্ভা চারবার খোলস বদলায়। প্রতিটি খোলস বদলের মধ্যবর্তী ধাপকে ইনস্টার বলা হয়। চতুর্থ ইনস্টারে পৌঁছালে লার্ভার দৈর্ঘ্য প্রায় আধা ইঞ্চি হয়। এই পর্যায়ের শেষে তারা খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে দেয় এবং শেষবার খোলস বদলে পিউপায় রূপান্তরিত হয়।

মশার পিউপাকে সাধারণত ‘টাম্বলার’ বলা হয়। প্রজাতি ও তাপমাত্রা অনুযায়ী তারা ১ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত পানিতে থাকে। পিউপা পানির চেয়ে হালকা হওয়ায় পানির উপরিভাগে ভেসে থাকে। তারা ‘ট্রাম্পেট’ নামে দুটি শ্বাসনালির মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে।

এই পর্যায়ে পিউপা কোনো খাবার খায় না। তবে তারা নিষ্ক্রিয়ও নয়। কোনো বিপদ বুঝলে হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে পানির নিচে ডুব দেয় এবং কিছুক্ষণ পর আবার ভেসে ওঠে।

মশার সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটে এই পর্যায়েই। পিউপার আবরণের ভেতরেই লার্ভার দেহ ভেঙে একটি পূর্ণাঙ্গ মশার শরীর গড়ে ওঠে।

সব মশা কামড়ায় না। শুধু স্ত্রী মশারাই রক্ত পান করে। তারা মানুষ, পাখি কিংবা উষ্ণ ও শীতল রক্তের বিভিন্ন প্রাণীকে কামড়াতে পারে।

মশাকে কামড়াতে উৎসাহিত করে এমন কয়েকটি বিষয় হলো—আমাদের নিঃশ্বাসে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের তাপমাত্রা, ঘাম বা আর্দ্রতা, গায়ের গন্ধ, পোশাকের রং এবং শরীরের নড়াচড়া।

পুরুষ মশা কখনো রক্ত পান করে না। তারা ফুলের মধু ও অন্যান্য মিষ্টি উদ্ভিজ্জ রস খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রকৃতপক্ষে স্ত্রী মশারাও অধিকাংশ সময় ফুলের মধুই খায়। ডিম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করতেই কেবল তারা রক্ত পান করে।

মজার বিষয় হলো, টক্সোরাইনকাইটিস প্রজাতির স্ত্রী মশাও কখনো রক্ত পান করে না। তারা সারাজীবন শুধু ফুলের মধু খেয়েই বেঁচে থাকে।

অনেকের ধারণা, মশার প্রথম পছন্দ মানুষের রক্ত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ মশার কাছে ঘোড়া, গরু, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী বা পাখি মানুষের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।

এডিস ও ওকলেরোটাটাস মশা ভোরবেলা, সন্ধ্যার সময় ও রাতের শুরুতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। কিছু প্রজাতি দিনের বেলাতেও কামড়ায়, বিশেষ করে মেঘলা দিনে বা ছায়াযুক্ত স্থানে। এরা শক্তিশালী উড়ুক্কু এবং ডিম ফোটার স্থান থেকে অনেক কিলোমিটার দূরেও যেতে পারে।

কিউলেক্স মশা সাধারণত সন্ধ্যার পর এবং রাতের অন্ধকারে বেশি কামড়ায়। তারা সহজেই মানুষের ঘরে প্রবেশ করে। বেশিরভাগ কিউলেক্স মশা দূরে উড়তে পারে না, যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রায় তিন কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে দেখা গেছে। গ্রীষ্মকালে এদের আয়ু সাধারণত কয়েক সপ্তাহ। তবে গ্রীষ্মের শেষে জন্ম নেওয়া স্ত্রী মশারা আশ্রয়স্থল খুঁজে শীতকাল পার করে এবং বসন্তে আবার সক্রিয় হয়।

কিউলিসেটা মশা মাঝারি মাত্রার আক্রমণাত্মক। অন্যদিকে সোরোফোরা, কোকুইলেটিডিয়া ও ম্যানসোনিয়া প্রজাতির মশা মানুষের বসতি তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ছড়িয়ে পড়ার কারণে ক্রমেই বেশি সমস্যার সৃষ্টি করছে।

সবশেষে অ্যানোফিলিস মশা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের মধ্যে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ানোর জন্য দায়ী একমাত্র মশা হলো অ্যানোফিলিস। তাই জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রজাতির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

মশা পৃথিবীর নতুন বাসিন্দা নয়। বরং এটি এমন একটি প্রাণী যা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রায় পুরো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, প্রায় ১০ থেকে ২০ কোটি বছর আগে মশার পূর্বপুরুষরা পৃথিবীতে ছিল, অর্থাৎ ডাইনোসরের যুগেই এর অস্তিত্ব ছিল। মিয়ানমারের অ্যাম্বার ফসিলে পাওয়া প্রায় ১০ কোটি বছর আগের মশার জীবাশ্ম প্রমাণ করে, এই ক্ষুদ্র প্রাণীটি ভূতাত্ত্বিক সময়ের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী এবং অভিযোজনক্ষম জীবদের মধ্যে একটি।

এই দীর্ঘ বিবর্তনকাল মশাকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে, এটি বিভিন্ন জলবায়ু, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ফলে পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই মশা টিকে আছে এবং বিভিন্ন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে মানুষের সঙ্গে এক ধরনের অবিচ্ছিন্ন সহাবস্থান তৈরি করেছে।

বর্তমানে পৃথিবীতে ৩ হাজার ৭০০ এরও বেশি মশার প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এই প্রজাতিগুলোর বিস্তার পৃথিবীর সব অঞ্চলে সমান নয়। উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও পানির প্রাচুর্যের কারণে মশার বৈচিত্র্য অনেক বেশি।

উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলে প্রায় ৪৪৭ প্রজাতি, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৪৩৯ প্রজাতি, মালয়েশিয়ায় ৪১৫ প্রজাতি, থাইল্যান্ডে ৩৭৯ প্রজাতি, এবং ভারতে প্রায় ৩৩৮ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়।

একইভাবে ফিলিপাইন, কলম্বিয়া, ডিআর কঙ্গো এবং চীনের মতো দেশগুলোতেও শতাধিক প্রজাতি আছে।

এই বৈচিত্র্য মূলত সেই সব অঞ্চলে বেশি দেখা যায় যেখানে ঘন বন, নদী, জলাভূমি ও বর্ষাকাল দীর্ঘ হয়। ফলে ট্রপিকাল বেল্টকে বলা যায় পৃথিবীর ‘মসকিটো বায়োডাইভারসিটি করিডর’, যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ মশার জীবনচক্রের জন্য অত্যন্ত অনুকূল।

মশার প্রজাতি যেখানে বেশি, সেখানে সবসময় মৃত্যু বেশি হয় না—এই সত্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট আফ্রিকায়। সাব-সাহারান আফ্রিকা এখনো বিশ্বের ম্যালেরিয়া মৃত্যুর প্রধান কেন্দ্র, যেখানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশ ঘটে। নাইজেরিয়া, ডিআর কঙ্গো, উগান্ডা, মোজাম্বিক এবং মালি এই সংকটের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত।

এখানে বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে ম্যালেরিয়া এখনো একটি প্রধান মৃত্যুর কারণ।

বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার চেয়ে এখন সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হলো ডেঙ্গু। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নির্মাণ সাইটে জমে থাকা পানি এবং প্লাস্টিক বর্জ্য এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়, বরং বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে একটি স্বাস্থ্য সংকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে একেবারেই মশা নেই। তবে কিছু দেশে মশার সংখ্যা এত কম যে, সেখানকার বাসিন্দারা প্রায়ই মশা দেখেই না।

সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো আইসল্যান্ড। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দেশটির আবহাওয়ার অস্বাভাবিক ওঠানামা মশার জীবনচক্র সম্পন্ন হতে দেয় না। শীতের সময় পানি জমে বরফ হয়, আবার হঠাৎ গলে যায়। ফলে ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হওয়ার সুযোগ খুব কম।

মশা তুলনামূলক কম পাওয়া যায়—আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকা, ফারো দ্বীপপুঞ্জ, সলবার্ড, চিলির আটাকামা মরুভূমি, মঙ্গোলিয়ার কিছু অঞ্চল, সৌদি আরবের মরুভূমি অঞ্চল, কাতারের শুষ্ক অঞ্চল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মরু এলাকা।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই চিত্রও বদলে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপের কিছু অঞ্চলে এমন মশা দেখা যাচ্ছে, যেগুলো কয়েক দশক আগেও সেখানে ছিল না।

বিজ্ঞান বলছে, প্রকৃতির নিজস্ব একটি ভারসাম্য আছে। টিকটিকি, ব্যাঙ, ফড়িং, মাছ, বাদুড়, কিছু পাখি মশা খায়। বিশেষ করে গাপ্পি ও গাম্বুসিয়া মাছ মশার লার্ভা খেতে খুব দক্ষ। অনেক দেশে পুকুর ও জলাশয়ে এসব মাছ ছেড়ে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে শুধু ব্যাঙ বা টিকটিকি বাড়িয়ে কোনো শহরের মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ একটি স্ত্রী মশা তার জীবদ্দশায় ৩০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। অর্থাৎ মশার জন্মহার এত বেশি যে কয়েকটি শিকারি প্রাণী দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা মারার চেয়ে মশার জন্ম বন্ধ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি মশা মারলে একটি মশা কমে। কিন্তু একটি প্রজননস্থল ধ্বংস করলে শত শত মশার জন্ম বন্ধ হয়।

তাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো—জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা, ফুলের টব নিয়মিত পরিষ্কার করা, পুরোনো টায়ার, ড্রাম ও বালতি ঢেকে রাখা, ড্রেন পরিষ্কার রাখা, মশারি ব্যবহার করা, জানালায় জালি লাগানো, প্রয়োজন হলে কীটনাশক ব্যবহার করা।

বিশ্বের সফল মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিগুলোর প্রায় সবই এই পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন কেবল কয়েল, স্প্রে কিংবা ফগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পৃথিবীর বড় বড় গবেষণাগারে চলছে অত্যাধুনিক গবেষণা। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়ার গবেষকরা নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।

কিছু গবেষক মশার জিন পরিবর্তন করে নতুন প্রজাতি তৈরি করছেন, যাদের বংশবিস্তার খুবই সীমিত। ফলে ধীরে ধীরে মশার সংখ্যা কমে আসে।

ওয়ার্ল্ড মসকিটো প্রোগ্রামের বিজ্ঞানীরা ওলবাচিয়া নামের একটি ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করছেন। এই ব্যাকটেরিয়া বহনকারী মশা ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষমতা অনেকাংশে হারিয়ে ফেলে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশে এ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এখন অনেক দেশ মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণ করছে। কোথায় মশা বাড়ছে, কোথায় রোগ ছড়াতে পারে—এসব তথ্য আগেভাগেই জানা যাচ্ছে।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে মশার বিস্তার নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং পুরনো এলাকাগুলোতে এর জীবনচক্র আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ইউরোপের ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, গ্রিস ও পর্তুগালে এখন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা কয়েক দশক আগেও প্রায় অসম্ভব ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন মশার জন্য শুধু পরিবেশ অনুকূল করছে না, বরং তার ভৌগোলিক সীমানাও পরিবর্তন করছে।

মানুষ প্রযুক্তিতে অগ্রগতি করেছে, চাঁদে গেছে, মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধান চালিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে এবং পারমাণবিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। কিন্তু মশাকে এখনো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এটি সরাসরি শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং রোগ ছড়িয়ে মানবসভ্যতার উপর প্রভাব ধরে রেখেছে।

তথ্যসূত্র:
WHO World Malaria Report 2025 (2024 data), CDC, World Population Review, World Mosquito Program, UNEP, National Geographic

Related Articles

Latest Posts