ভারত কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলে ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেস পুনরায় চালু হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
চালু হলে ট্রেনটি যমুনা নদীর ওপর দিয়ে যাওয়া আগের দীর্ঘ পথের বদলে পদ্মা সেতু হয়ে কম দূরত্বের পথে চলবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, তারা (ভারত) যদি কোনো প্রস্তাব পাঠায়, তবে সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ চালুর অংশ হিসেবে ২০০৮ সালের এপ্রিলে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়। এরপর থেকে চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি যাত্রীদের কাছে ট্রেনটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ভারত ট্রেন পরিষেবাটি স্থগিত করে। এর আগ পর্যন্ত মৈত্রী এক্সপ্রেস ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশন থেকে টাঙ্গাইল, যমুনা সেতু, ঈশ্বরদী ও দর্শনা হয়ে চলাচল করত। ঢাকা থেকে কলকাতার ৩৯২ কিলোমিটার এই যাত্রাপথে সময় লাগত প্রায় সাত ঘণ্টা ৪৫ মিনিট।
গত সেপ্টেম্বরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রস্তাব দেয়, ট্রেনটি যেন পদ্মা সেতু, যশোর ও বেনাপোল হয়ে নতুন রুটে চলাচল করে। এই নতুন পথ আগের চেয়ে সংক্ষিপ্ত হওয়ায় ভ্রমণের সময় প্রায় ছয় ঘণ্টায় নেমে আসতে পারে এবং টিকিটের মূল্যও প্রায় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এগুলো প্রাথমিক ধারণা। চূড়ান্ত রুট, সময়সূচি এবং পরিচালন ব্যবস্থার ওপরই সবকিছু নির্ভর করবে।
মৈত্রী এক্সপ্রেস ছাড়াও, ২০২৪ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে চলাচলকারী অন্য দুটি ট্রেন বন্ধন এক্সপ্রেস ও মিতালী এক্সপ্রেসের চলাচলও বন্ধ আছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মাসুদুর বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে নিজে থেকে এই ট্রেনগুলো বন্ধ করেনি, বরং ভারতই এসব পরিষেবা বাতিল করেছে।
তিনি জানান, মৈত্রী এক্সপ্রেস যদি পদ্মা সেতু দিয়ে চালু করা হয়, তবে আগের মতোই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে ইমিগ্রেশনের কাজ চলবে।
আগে ট্রেনটি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ছাড়ত এবং সেখান থেকেই যাত্রীদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হতো।
তিনি বলেন, ‘সেখানে ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করাই আছে। কিন্তু যদি আমরা এটি কমলাপুর স্টেশনে করতে চাই, তবে নতুন করে সবকিছু গুছিয়ে আনতে হবে।’
পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেন চালাতে হলে কমলাপুর স্টেশন হয়েই নতুন রেললাইনে উঠতে হবে।
গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের রেল কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে মৈত্রী এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু দিয়ে চালানোর বিষয়টি নিয়ে
আলোচনা হয়েছিল। তবে ভারত এখনো এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠায়নি।
তিন দিনব্যাপী আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠকের পর ১০ সেপ্টেম্বর রেল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হক জানিয়েছিলেন, ভারত যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরুর প্রস্তাব দেয়, তবে বাংলাদেশ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবে।
জিয়াউল জানান, ভারতীয় প্রতিনিধিরা পদ্মা সেতু দিয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচলের বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত রুটে ট্রেন চালাতে গেলে বেশ কিছু কারিগরি ও পরিচালনাসংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। এর মধ্যে আছে রুটের সক্ষমতা, ট্রেন চলাচলের নিয়ম, ঘোরানোর সুবিধা (টার্নিং ফ্যাসিলিটি), ভাড়া সমন্বয় এবং ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত মৈত্রী এক্সপ্রেসে মোট ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬০ যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি।
সাধারণ সময়ে ট্রেনে যাত্রী পূর্ণ থাকার হার ছিল ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। তবে ঈদ ও দুর্গাপূজার ছুটিতে এই হার ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত।
দুই দেশের মধ্যে ট্রেন চলাচল সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী, এই সেবা থেকে আসা আয়ের ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং বাকি ২৫ শতাংশ পায় ভারতীয় রেলওয়ে।

