পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই নিষিদ্ধ, গুজব না সত্য?

পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই নিষিদ্ধ করেছে বিজেপি—সম্প্রতি এমন একটি খবর বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। তবে এই তথ্য বা দাবি পুরোপুরি সত্য নয়।

গত ১৪ মে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গরু, মহিষসহ গবাদি পশু জবাই করে কাটা মাংস বিক্রি করা নিয়ে পুরোনো একটি আইন নতুন করে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সরকার।’

অপরদিকে, একই দিনে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০ কঠোরভাবে পালনের জন্য নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রাজ্য সরকার।’

এ বিষয়ে প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘কলকাতা হাইকোর্টের ২০১৮ সালের ৬ আগস্টের রায় এবং সে সংক্রান্ত ২০২২ সালের ৮ জুনের সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করেই এটি প্রকাশ করা হয়েছে।’

পশ্চিমবঙ্গের অনেক রেস্তোরাঁর মেনুতে গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ খুঁজে পাওয়া যায়। এমনকি, বাজার থেকেও সহজেই গরুর মাংস কেনা যায়। অপরদিকে, ভারতের উত্তরাঞ্চলের অনেক রাজ্যেই এমন দৃশ্য বিরল।

যে রাজ্যে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে বিধিনিষেধ নেই, সে রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে—এ বিষয়টি যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনই অবাস্তব।

গত ৯ মে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনামলের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তার মন্ত্রিসভা থেকে পশু জবাই নিয়ে আট দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তবে এর কোনোটিই নতুন নয়।

মূলত ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ সুরক্ষা আইনটিকেই তিনি আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন।

তবে সরাসরি পশু জবাই নিষিদ্ধ না করলেও নতুন সরকার এমন কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে, যা পশু জবাই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ করতে পারে। কুরবানি ঈদকে সামনে রেখে বিপাকে পড়তে পারেন ব্যবসায়ীরা।

এর আগে বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ এসেছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে এই আইনটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করেছে।

গত ১৪ টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজ্য সরকার পুলিশকে অবৈধ পশু জবাই ও বেচা-কেনা দমনে কোনো ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশনা মেনে পশু বাজারগুলো এবং চাঁদাবাজ চক্রের ওপর কড়া নজর রাখবে পুলিশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে গবাদি পশু পাচার ও চাঁদাবাজ চক্র সব ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছে।

সরকারের দাবি, ৭৬ বছরের পুরনো ওই আইনটি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্য পশু জবাই ও এ সংক্রান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

অবৈধ পশু বাজার ও অননুমোদিত কসাইখানাগুলো বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য পুলিশের সব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার।

পশ্চিমবঙ্গের এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) অজয় মুকুন্দ রানাডে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, ‘অবৈধ পশুর হাট, কসাইখানা পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা নিশ্চিত করব যাতে নিবন্ধিত ও বৈধ পশু ব্যবসা নির্বিঘ্নে চলতে পারে।’

রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে পশ্চিমবঙ্গের কসাইখানাগুলোর জন্য আট দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এগুলো হলো:

১। সনদ ছাড়া কোনো প্রাণী (ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর, পুরুষ ও স্ত্রী মহিষ, মহিষের বাছুর এবং নপুংসক মহিষ) জবাই করা যাবে না।

২। পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশুচিকিৎসক যৌথভাবে একটি প্রাণী জবাইয়ের উপযোগী কিনা সে বিষয়ে সনদ দিতে পারবেন। শুধুমাত্র শ্রমসাধ্য কাজ বা প্রজননের জন্য অনুপযোগী ও  ১৪ বছরের বেশি বয়সী প্রাণী জবাই করা যাবে। বয়স, আঘাত, অঙ্গবিকৃতি বা রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়া পশুও জবাই দেওয়া যেতে পারে।

৩। কাউকে এ ধরনের সনদ দিতে অস্বীকার করা হলে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করতে পারবেন।

৪। সনদ পাওয়া প্রাণীকে শুধু পৌরসভার নির্ধারিত জবাইখানা বা স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারণ করে দেওয়া জবাইখানায় জবাই করা যাবে।

৫। সনদ পাওয়া গেলেও প্রকাশ্যে বা জনসাধারণের যাতায়াত আছে এমন জায়গায় কোনো প্রাণীকে জবাই করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

৬। পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, অথবা সরকারি পশুচিকিৎসকের অনুমোদিত কোনো ব্যক্তি (কসাইখানা) পরিদর্শনে গেলে কেউ বাধা দিতে পারবেন না।

৭। উল্লেখিত আইনগত বিধিগুলোর কোনোটি লঙ্ঘন করলে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। ১৯৫০ সালের আইন অনুযায়ী এ ধরনের সব অপরাধই ‘গুরুতর’ হিসাবে গণ্য হবে।

৮। সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক রায়গুলো রাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।

গত ১৬ মে আউটলুক ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়—ঈদুল আজহার আগে এই নির্দেশনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নির্দেশনাগুলোকে ‘রুটিন’ মনে হলেও বাধ্যতামূলক সনদের বিষয়টি অনেকের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জবাই এর ‘উপযুক্ত’ হিসেবে বিবেচিত পশুর জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড বেশ কঠোর, যা ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। জবাইয়ের উপযোগী পশুর থাকলেই জবাই করা যাবে না—অনুমোদন বা সনদ নিতে হবে।

আবার সে সনদ পেলেও নিজের বাড়ির সামনে জবাই করার সুযোগ নেই। পৌরসভা নির্ধারিত কসাইখানা বা স্থানীয় প্রশাসন অনুমোদিত জায়গায় জবাই করতে হবে।

সব মিলিয়ে, ঈদুল আজহার সময় প্রথাগতভাবে পশু জবাই মোটামুটি ‘জটিল’ হয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে।

এ বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী অর্ক মাইতি আউটলুক ইন্ডিয়াকে বলেন, ‘এই আইনে সরকারি ও ব্যক্তিগত স্থানে পশু জবাইয়ে কোনো ভেদাভেদ রাখা হয়নি। অর্থাৎ, আপনি যদি নিজের বাড়িতে পশু জবাই দেন, তবুও আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’

তিনি চলমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তি উদ্যোগে বা অনুমোদন ছাড়া পশু জবাই দেওয়া থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন। বলেন, ‘এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’

গত ১৭ মে ভারতের বার্তা সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে এক সাক্ষাৎকারে কলকাতার ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদের ইমাম রাজ্যের মুসলিমদের এবারের ঈদে গরু কুরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

হিন্দুদের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গরু কুরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেন তিনি।

জানান, রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশনা এবং স্থানীয়ভাবে যথাযথ অবকাঠামো না থাকায় পশু জবাই দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ হয়েছে।

তিনি বার্তা সংস্থাটিকে আরও বলেন, ‘সরকার যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না দিতে পারে, তাহলে তাদের উচিৎ হবে গরুকে জাতীয় পশু হিসেবে ঘোষণা দেওয়া। সে ক্ষেত্রে গরু জবাই ও মাংস রপ্তানির ওপরও শতভাগ নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা উচিৎ।’

১৯৫০ সালের ওই আইনে একটি ব্যতিক্রমের কথা বলা হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সেই প্রতিবেদন অনুসারে—ধর্মীয়, চিকিৎসা ও গবেষণার কাজে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে আইনটি প্রযোজ্য নয়।

ওই আইনের ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে—রাজ্য সরকার চাইলে এ ধরনের ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ কাজের ক্ষেত্রে আইনে ছাড় দিতে পারে।

তবে সর্বশেষ নির্দেশনায় এই ব্যতিক্রমের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশনায় জনসম্মুখে পশু জবাইয়ের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।

নতুন নির্দেশনায় ‘কৃষি খাতের উন্নয়নে পশুসম্পদ সুরক্ষিত রাখা ও রাজ্যের দুধের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার’ লক্ষ্যমাত্রার কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, এতে বাধ্যতামূলক সনদ ও জনসম্মুখে জবাই দেওয়ার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, কার্যত পশু জবাইকে ‘জটিল প্রক্রিয়ায়’ ফেলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি শাসিত সরকার।

Related Articles

Latest Posts