একসময় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের নীল হেলমেট ছিল নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা ও আশার প্রতীক। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে তারা পৌঁছাতেন যুদ্ধ থামাতে, সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এবং শান্তির পথ তৈরি করতে। কিন্তু সময় বদলেছে। বর্তমান বিশ্বের সংঘাতগুলো এখন এতটাই জটিল, অনিশ্চিত ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে যে শান্তিরক্ষীরাও আর নিরাপদ নন। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লেবানন, গাজা, সুদান, কঙ্গো, মালি কিংবা দক্ষিণ সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে—শান্তিরক্ষা এখন শুধু কঠিন নয়, অনেক সময় আত্মঘাতী দায়িত্বেও পরিণত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস-২০২৬ এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লেবানন–ইসরায়েল সীমান্তে চলমান সংঘাত এবং গাজায় যুদ্ধ পরিস্থিতি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, ইসরায়েলের হামলা ও চলমান সংঘাতে গাজা ও লেবাননে জাতিসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু কর্মী ও শান্তিরক্ষী হতাহত হয়েছেন। তবে এখানে ‘শান্তিরক্ষী’ এবং জাতিসংঘের অন্যান্য কর্মীদের সংখ্যা আলাদা করে দেখা জরুরি।
গাজা
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ’র অন্তত ২৬৩ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ২০২৪ সালেই নিহত হন অন্তত ১১৬ জন। এটিকে জাতিসংঘের ইতিহাসে এক সংঘাতে সবচেয়ে বড় সংখ্যক কর্মীর প্রাণহানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এদের বেশিরভাগই ছিলেন ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাকর্মী, সরাসরি ‘শান্তিরক্ষী বাহিনী’র সদস্য নন।
লেবানন
লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউএনআইএফআইএলের সদস্যরা একাধিকবার ইসরায়েলি হামলা ও সীমান্ত সংঘর্ষে হতাহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী: ২০২৪ সালে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৪০ জনের মতো শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ইসরায়েলি ট্যাংক হামলায় কয়েকজন শান্তিরক্ষী আহত হন।
তবে ইউএনআইএফআইএলের অফিসিয়াল তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ সময়কালে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘর্ষে ইউএনআইএফআইএলের শান্তিরক্ষীদের মধ্যে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালে পৃথক কিছু হামলায় ইউএনআইএফআইএলের সদস্য নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে, তবে সেগুলোর দায় সবক্ষেত্রে সরাসরি ইসরায়েলের ওপর নিশ্চিতভাবে আরোপ করা হয়নি।
শান্তিরক্ষা কেমন কঠিন
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের ইতিহাসে লেবাননের ইউএনআইএফআইএল বা ইউনাইটেড নেশনস ইন্টারিম ফোর্স ইন লেবানন অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি মিশন। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মিশনের কাজ ছিল ইসরায়েল–লেবানন সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ এবং বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে মিশনটি নিজেই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছে।
রয়টার্সের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ লেবাননে তিনজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার পর ইউএনআইএফআইএল মিশনকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। নিহতদের সবাই ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার সেনাসদস্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ঘটনাটি ঘটে দক্ষিণ লেবাননের আদচিত আল-কুসাইর এলাকায়। সেখানে একটি ইউএনআইএফআইএল পোস্টে গোলাবর্ষণে এক শান্তিরক্ষী নিহত হন। পরদিন বানি হাইয়ান এলাকায় একটি ইউএনআইএফআইএল কনভয়ের কাছে বিস্ফোরণে আরও দুই শান্তিরক্ষী মারা যান। জাতিসংঘের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হয়, রাস্তার পাশে পেতে রাখা বিস্ফোরক থেকে এই হামলা হয়েছিল। ইসরায়েল অভিযোগ তোলে যে হিজবুল্লাহর বিস্ফোরকেই এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত তদন্ত শেষ হয়নি।
এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘে ৬৩টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক যৌথ বিবৃতিতে শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলার নিন্দা জানায়। তারা একে ‘অগ্রহণযোগ্য আগ্রাসী আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে এবং শান্তিরক্ষীদের সুরক্ষা জোরদারের আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
লেবাননে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে ইউএনআইএফআইএল মিশনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইউএনআইএফআইএল মিশন সমাপ্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার শান্তিরক্ষী ৪৭টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করে সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং সরাসরি হামলার কারণে শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে অন্তত ছয়জন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও ফ্রান্সের সেনাসদস্যও রয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, শান্তিরক্ষীরা এমন এক পরিবেশে কাজ করছেন যেখানে প্রতিনিয়ত গোলাবর্ষণ, বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে।
ফরাসি শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলার ঘটনাও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়। এপ্রিলে দক্ষিণ লেবাননে একটি ফরাসি ইউএনআইএফআইএল টহলদলে হামলায় একজন সেনাসদস্য নিহত এবং তিনজন আহত হন। ফ্রান্স সরাসরি হিজবুল্লাহকে দায়ী করলেও সংগঠনটি অভিযোগ অস্বীকার করে। ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, শান্তিরক্ষীরা এখন আর নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবেও নিরাপদ নন।
কতটা নিরাপদ
বাস্তবতা হলো, শান্তিরক্ষীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনিরাপদ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সাল থেকে হাজার হাজার শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু সাম্প্রতিক কয়েক বছরেই আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বহু শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনের গাজার পরিস্থিতিও জাতিসংঘের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। যদিও গাজায় ইউএনআইএফআইএলের মতো শান্তিরক্ষা মিশন নেই, তবুও জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবিক সংস্থা ও কর্মীরা সরাসরি হামলার শিকার হচ্ছেন। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর অভিযোগ তুলেছে যে অনেক বেসামরিক মানুষকে শুধু সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে গুলি করা হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইসরায়েল গাজার সীমান্তবর্তী এলাকায় তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা নিরাপত্তা অঞ্চল সম্প্রসারণ করেছে, যা এখন গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিস্তৃত। এর ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষেরা আরও অনিরাপদ অবস্থায় পড়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর সতর্ক করে বলেছে, বেসামরিক মানুষকে এভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হতে পারে।
শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে সংঘাতের ধরন বদলে গেছে। অতীতে শান্তিরক্ষীরা মূলত যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ও নিরস্ত্রীকরণে কাজ করলেও এখন তারা সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে অবস্থান করছেন। ফলে তাদের ওপর হামলার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে ইউএনআইএফআইএল ঘাঁটি বারবার গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষীরা আশ্রয়কেন্দ্র ত্যাগ করতেও পারছেন না।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস প্রতি বছর ২৯ মে পালিত হয়। এই দিনটি শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ, সাহস ও পেশাদারিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নির্ধারিত। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দিবসটির তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে উঠেছে। কারণ এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু শান্তিরক্ষা নয়, বরং শান্তিরক্ষীদের নিজেদের বেঁচে থাকার প্রশ্নও রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলো আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে। একইসঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ওপর চাপ বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কী
নীল হেলমেটও এখন আর সুরক্ষিত নয়। আগে ধারণা ছিল, জাতিসংঘের পতাকা ও নীল হেলমেট দেখলে যুদ্ধরত পক্ষগুলো অন্তত শান্তিরক্ষীদের আক্রমণ করবে না। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই অলিখিত নিয়মও ভেঙে যাচ্ছে।
বিভিন্ন সংঘাতে এখন শান্তিরক্ষীদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। কোনো পক্ষ মনে করে তারা প্রতিপক্ষকে সহায়তা করছে, আবার কেউ মনে করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে নিরপেক্ষতার পরিচয় থাকলেও তারা হামলার বাইরে থাকছেন না।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই জাতিসংঘের কনভয়ে হামলা চালায়। লেবাননে শান্তিরক্ষীদের ঘাঁটিতে গোলা পড়েছে। মালিতে বহু শান্তিরক্ষী সড়কবোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। সুদানে জাতিসংঘের কর্মীরা গুলিবর্ষণের মধ্যে আটকা পড়েছেন।
অর্থাৎ, শান্তিরক্ষীরা এখন আর ‘নিরাপদ পর্যবেক্ষক’ নন—তারা নিজেরাও সংঘাতের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হয়ে গেছেন।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের এবারের দিবসটি বিশ্বকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শান্তিরক্ষীরা এখন শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠার সৈনিক নন; তারা নিজেরাও যুদ্ধ ও সহিংসতার শিকার। লেবানন ও গাজার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, শান্তিরক্ষী মিশনের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি নয়, বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি হয়ে উঠেছে।

