কাঁচের লেন্সটা যেন কোনো সাধারণ যন্ত্র ছিল না, ছিল গোটা পৃথিবীর স্থির হয়ে থাকা এক জোড়া চোখ, যে চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক পরাজিত ঈশ্বর পড়ছিলেন নিজের পুনরুত্থানের মন্ত্র। কপালে ফুলে ওঠা রগ, দৃষ্টিতে আদিম আক্রোশ, আর গলার শিরা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা এক বুনো চিৎকার। ঠিক যেন এক আহত সিংহ তার রাজত্ব হারানোর ঠিক আগে শেষবারের মতো জানিয়ে দিচ্ছে, জঙ্গলের রাজত্ব আজও তার, মুকুটটা সে এখনো ছুঁড়ে ফেলেনি।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে ম্যারাডোনাকে ঘিরে পৃথিবীর অনুভূতি ছিল অদ্ভুত রকম দ্বিধায় ভরা। কেউ তাকে দেবতার মতো ভালোবাসতেন, কেউ ভাবতেন তিনি শেষ হয়ে গেছেন। নাপোলির কিংবদন্তি দিন শেষ, ১৯৯০ বিশ্বকাপের কান্নাভেজা বিদায় শেষ, নিষেধাজ্ঞা, ওজন বেড়ে যাওয়া, কোকেন কেলেঙ্কারি মিলিয়ে ম্যারাডোনা তখন যেন নিজের ছায়ার সঙ্গে লড়ছেন।
কিন্তু সমস্যা হলো, ম্যারাডোনা কখনও সাধারণ মানুষের মতো হারিয়ে যেতে জানতেন না।
তিনি সবসময় নাটকীয়ভাবে ফিরে আসতেন।
দিনটি ছিল ২১ জুন, ১৯৯৪ সাল।
বোস্টনের ফক্সবোরো স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচা প্রস্তুত ছিল এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় রচনা করার জন্য। প্রতিপক্ষ গ্রিস। কিন্তু মাঠের ওই এগারো জন গ্রিক ফুটবলার যেন সেদিন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার আসল প্রতিপক্ষ ছিলেন না। তার লড়াইটা ছিল নিজের সঙ্গে, নির্মম সময়ের সঙ্গে, আর তাকে বাতিল করে দেওয়া গোটা ফুটবল বিশ্বের সঙ্গে।
১৯৯০ বিশ্বকাপের পর থেকেই শুরু হয়েছিল পতন। ড্রাগ, বিতর্ক, নাপোলি থেকে লজ্জাজনক বিদায় আর ১৫ মাসের দীর্ঘ নির্বাসন, ম্যারাডোনা যেন খাদের একেবারে শেষ কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখান থেকে এই ফেরাটা আর দশটা সাধারণ প্রত্যাবর্তনের মতো ছিল না। এটা ছিল জমে থাকা পাহাড়সম অপবাদ আর ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া সম্মান পুনরুদ্ধারের এক অমানুষিক লড়াই।
বিশ্বকাপের ঠিক আগে কেউ বিশ্বাসই করেনি এই লোকটা মাঠে নামতে পারবেন। অতিরিক্ত ওজনে শরীর ফুলে গিয়েছিল, অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠছিলেন। কিন্তু তার জেদ ছিল অন্যরকম। নিজেকে নিংড়ে দিয়ে, হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিনি ঝরিয়ে ফেলেছিলেন অনেকটা ওজন। আবার গায়ে জড়িয়েছিলেন সেই চিরচেনা আকাশী-সাদা জার্সি, বাহুতে পরেছিলেন অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। ফক্সবোরো স্টেডিয়ামের বাতাসে সেদিন একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল। সবাই দেখতে চাইছিল, জাদুকরের ঝুলিতে আর কোনো জাদু অবশিষ্ট আছে কি না।
ম্যাচের ষাট মিনিট তখন অতিক্রান্ত। আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যেই গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার জোড়া গোলে এগিয়ে। কিন্তু দর্শকরা তো অপেক্ষা করছিল অন্য কিছুর জন্য। বক্সের ঠিক বাইরে হঠাৎ করেই শুরু হলো শিল্পের এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী। বল যেন শিল্পীর তুলি হয়ে ঘুরতে লাগলো খেলোয়াড়দের পায়ে পায়ে। ফার্নান্দো রেদন্দো থেকে ক্লদিও ক্যানিজিয়া, ক্যানিজিয়া থেকে আবার রেদন্দো। এক ছোঁয়ার ছোট ছোট জাদুকরী পাসে বোনা হচ্ছিল এক সম্মোহনী মায়াজাল। গ্রিক ডিফেন্ডাররা যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিল সেই শৈল্পিক কোরিওগ্রাফি।
আর সেই জালের একেবারে কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যারাডোনার বাঁ পায়ে বলটা যখন এলো, সবকিছু যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল মুহূর্তের জন্য। কোনো জায়গা ছিল না, সামনে ডিফেন্ডারদের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। কিন্তু ওই ঐশ্বরিক বাঁ পা তো জাগতিক নিয়মের তোয়াক্কা করে না।
তার বাঁ পা উঠল।
চোখের পলকে, শরীরের নিখুঁত মোচড়ে বলটা ছুঁয়ে দিলেন তিনি। অবিশ্বাস্য এক বাঁক খেয়ে বল গিয়ে আশ্রয় নিল জালের একদম ওপরের কোণায়। গ্রিস গোলরক্ষক আন্তোনিস মিনুর শূন্যে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
এরপর শুধু বিস্ফোরণ।
স্টেডিয়াম ফেটে পড়ছে উল্লাসে, কিন্তু আসল নাটকীয়তা তখনো বাকি। গোল করার পর ম্যারাডোনা দৌড়াতে শুরু করলেন সাইডলাইনের দিকে। সতীর্থদের এড়িয়ে এই দৌড় কোনো উদ্দেশ্যহীন উল্লাস ছিল না, তিনি যেন খুঁজছিলেন এক অদৃশ্য শত্রুকে। মুহূর্তেই তিনি পেয়ে গেলেন মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা টেলিভিশন ক্যামেরাকে। ঠিক যেন ক্যামেরার লেন্স ভেদ করে তিনি সরাসরি পৌঁছে যেতে চাইলেন তাকে ফুরিয়ে যাওয়া খেলোয়াড় বলা প্রতিটি সমালোচকের ড্রয়িংরুমে, ফিফার কর্তাদের টেবিলে।
ক্যামেরার একেবারে সামনে এসে গর্জে উঠলেন ম্যারাডোনা। মুখমণ্ডল বিকৃত, চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। লেন্সের এত কাছে চলে এসেছিলেন যে, মনে হচ্ছিল তিনি বুঝি ক্যামেরাটাকে গ্রাস করে নেবেন। সেই চিৎকারটা কিসের ছিল? ওটা কি নিছক একটি সুন্দর গোলের আনন্দ? না। ওটা ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভের আগ্নেয়গিরির প্রচণ্ড অগ্ন্যুৎপাত।
প্রতিটি অপমানের জবাব তিনি দিচ্ছিলেন ওই এক হুংকারে। ওটা ছিল পৃথিবীকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া, ‘আমি ফুরিয়ে যাইনি, আমিই দিয়েগো, আমিই ফুটবল।’ সেই কয়েক সেকেন্ডের ফ্রেমে আটকে থাকা ম্যারাডোনার মুখচ্ছবি হয়ে উঠেছিল এক বিদ্রোহী নায়কের চূড়ান্ত প্রতিরোধের প্রতীক।
কিন্তু কে জানত, বোস্টনের সেই পড়ন্ত বিকেলের হুংকারই হবে আকাশী-সাদায় তার শেষ হুংকার! ক্যামেরার লেন্স সেদিন ম্যারাডোনার যে বুনো উল্লাস ধারণ করেছিল, মাত্র কয়েক দিন পরই তা পরিণত হয় এক তীব্র বিষাদে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষের ম্যাচের পর এক নার্স এসে তার হাত ধরে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যায়। এরপরই নেমে আসে এফিড্রিন নামক নিষিদ্ধ ওষুধের কালো থাবা।
‘আমার পা দুটো ওরা কেটে নিল,’ ম্যারাডোনার এই এক বুকফাটা আর্তনাদেই চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় এক জাদুকরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ম্যারাডোনা আজ আর নেই। কিন্তু ক্যামেরার দিকে তেড়ে আসার মুহূর্তটি সময়ের ফ্রেমে অবিনশ্বর হয়ে আছে।
সেই কয়েক সেকেন্ডে। যেখানে যেন তার পুরো জীবন ধরা ছিল।
শৈশবের বস্তি।
নেপলসের উন্মাদনা।
১৯৮৬-র মহিমা।
কোকেনের অন্ধকার।
সমালোচনা।
অহংকার।
ভালোবাসা।
ধ্বংস।
সবকিছু।
এবং হয়তো এ কারণেই সেই উদযাপন আজও এত অস্বস্তিকর সুন্দর। কারণ সেখানে নিখুঁত কোনো নায়ক নেই। সেখানে আছেন এক ভাঙা প্রতিভা, যিনি নিজের শেষ আলোটুকু দিয়ে পৃথিবীকে আরেকবার কাঁপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
আর সত্যি বলতে, তিনি পেরেছিলেনও।

