খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে গতকাল বুধবার ভোরে আগুন লাগার ঘটনায় গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে তদন্ত কমিটির প্রধান ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কাজী মো. আইনুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদনটি পাঠান। তবে তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনই প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সদস্যরা গতকাল রাতে ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিদর্শন করেন। প্রত্যক্ষদর্শী, কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে কথা বলে তারা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন।’
তিনি জানান, বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে এবং তার কাছেও প্রতিবেদন পাঠানো হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখেছেন।
পরিচালক বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে আমরা আমাদের মতামত ও সুপারিশ দিয়েছি। ভবিষ্যতে যেন আগুন লাগার মতো কোনো ঝুঁকি না থাকে, বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে— এমন ধারণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুরোনো সরঞ্জাম মেরামত, নিয়মিত বৈদ্যুতিক লাইন ও যন্ত্রপাতি পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’
হাসপাতালের জরুরি অপারেশন থিয়েটার (ইমার্জেন্সি ওটি) এখনো বন্ধ রয়েছে বলে জানান পরিচালক আইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রায়োরিটি বেসিসে জেনারেল ওটিতে সমন্বয় করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগের সহায়তায় জরুরি চিকিৎসা সেবা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ ইমার্জেন্সি ওটি পুরোপুরি চালু করা যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’
আগুনের ঘটনায় আহত দুই নার্স বর্তমানে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আইনুল ইসলাম জানান, নার্স রীপা বাইনকে পরিবারের ইচ্ছায় গতকাল ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর শারমিন আক্তার নামে আরেক নার্স খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্য আহতরা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ আছেন।
তবে একটি বিষয় নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন হাসপাতালের পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এই হাসপাতালে ১৮১টি ফায়ার এক্সটিংগুইশার আছে। ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদের এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আগুন লাগার শুরুতে একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রও ব্যবহার করা হয়নি।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ইমার্জেন্সি ওটিতে ১০০ থেকে ১৩০টি ছোট-বড় অপারেশন হয়। সেখানে পাঁচটি অপারেশন টেবিল আছে।
সিনিয়র নার্স হোসনে আরা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিভাগীয় এই হাসপাতালে প্রতিদিন নানা ধরনের রোগী ইমার্জেন্সি ওটিতে আনা হয়। আগুনে পোড়া রোগী, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, নারীদের বিভিন্ন অপারেশন—বিশেষ করে সিজারিয়ান রোগীর চাপ সবসময়ই থাকে।’
তিনি বলেন, ‘ওটি দ্রুত সচল করা না গেলে রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।’
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আজ থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু করেছে। গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিদর্শন করে সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তারা গ্যাস লাইনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত বিষয় সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
গণপূর্ত বিভাগের ইএম (ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল) ডিভিশন, খুলনার উপ-সহকারী প্রকৌশলী এস এম মেহেদী হাসান বলেন, ‘আজ সকালে হাসপাতালের টেকনিক্যাল টিমের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষগুলো ঘুরে দেখেছি। কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।’
তবে কবে নাগাদ সবকিছু আবার চালু করা সম্ভব হবে—সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলতে পারেননি তিনি। তিনি মনে করেন, ‘সবকিছু ঠিক করতে ১৫ দিনও লাগতে পারে, আবার এক মাসও সময় লাগতে পারে। গ্যাস পাইপ, বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য সরঞ্জাম কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা বিস্তারিত পরীক্ষা না করে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেন্ট্রাল গ্যাস ও অক্সিজেন লাইনের অবস্থা ভালোভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। অবকাঠামো মেরামত করতে খুব বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ পুনঃস্থাপন জটিল কাজ। কারণ এসব লাইনের সঙ্গে হাসপাতালের অন্য অংশেরও সংযোগ রয়েছে। সিভিল, ইলেক্ট্রিক্যালসহ বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। পুরো সিস্টেম আইসোলেশন না করে কাজ করা সম্ভব নয়।’
আজ সকালে ক্ষতিগ্রস্ত অপারেশন থিয়েটার ও পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন কক্ষে পোড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম ছড়িয়ে রয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা সেগুলো আলাদা করার কাজ করছেন। কোথাও ধোঁয়ায় কালো হয়ে যাওয়া জিনিসপত্র পরিষ্কার করা হচ্ছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারাও পরিস্থিতির দিকে খেয়াল রাখছেন। এ সময় অনেক রোগী ও স্বজনকে দূর থেকে উঁকি দিয়ে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
হাসপাতালের এক দায়িত্বরত টেকনিশিয়ান নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আগুনের তাপে নিচতলা, দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলার বেশ কয়েকটি এসি বিকল হয়ে গেছে। বিদ্যুতের সংযোগও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।’
আতঙ্ক কাটেনি রোগী-স্বজনদের
আগুনের স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফিরছে হাসপাতালে থাকা মানুষগুলোকে। একদিন পার হয়ে গেলেও রোগী ও স্বজনদের চোখেমুখে এখনো সেই বিভীষিকা আর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট; আতঙ্কেই কাটছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।
আজ আইসিইউ বিভাগের করিডোরে অপেক্ষমাণ শারমিন আক্তার গতকাল ভোরে আগুন লাগার সময় ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন। তিনি বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি দৌড়ে এসে খালাকে আইসিইউর বেডসহ নিচে নামিয়ে নিয়ে যাই। প্রায় তিন ঘণ্টা পর হাসপাতালের স্টাফদের সহযোগিতায় আবার তাকে রুমে নিয়ে আসি।’
তিনি বলেন, ‘গতকালের ভয় এখনো কাটেনি। এই ওয়ার্ড থেকে মাত্র ৩০ হাত দূরে আগুন লেগেছিল। লোকজনের ছোটাছুটি, ফায়ার সার্ভিসের সাইরেন—সব মিলিয়ে সিনেমার দৃশ্য মনে হচ্ছিল। আমি একা মানুষ, বেশি কিছু বুঝি না। অন্যদের দেখাদেখি আমিও খালাকে নিয়ে নিচে নেমে যাই। তার শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যা রয়েছে। পরে আবার তাকে রুমে আনতে পেরেছি।’
তিনি আরও জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে যশোরের বাঘারপাড়া থেকে তার আরও দুই স্বজন হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।
বুধবার ভোরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৃতীয় তলায় আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
আগুন লাগলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনায় নার্স ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যসহ মোট পাঁচজন আহত হন। এ ছাড়া আতঙ্কের মধ্যে আইসিইউ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় এক রোগীর মৃত্যু হয়।

