ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের হার বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন কোনো সংকটের খবর দেয়নি। বরং জাকার্তার রাতটি যেন বহুদিনের পুরোনো সমস্যাগুলোকে আরও বড় করে চোখের সামনে তুলে ধরেছে। গতি, অনুশীলনের তীব্রতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, টেকনিক্যাল সক্ষমতা কিংবা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের অভাব, বছরের পর বছর যেসব ঘাটতির কথা বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বড় হারে সেগুলোই আবার সামনে এসেছে।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের কোচ থমাস ডুলির কথাতেও তাই নতুন কোনো আবিষ্কারের চেয়ে পুরোনো সমস্যাগুলোরই প্রতিধ্বনি শোনা গেল। জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের জন্য ব্যবধানটা শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল। ইন্দোনেশিয়ার খেলোয়াড়দের গতি ও বলের ওপর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ যখন দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, তখন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা এক ধাপ পিছিয়ে ছিলেন। বল নিয়ন্ত্রণ, পাস, আক্রমণ তৈরি কিংবা রক্ষণে অবস্থান নেওয়া, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই ব্যবধান ধরা পড়েছে।
বাংলাদেশের দলে প্রবাসী একাধিক খেলোয়াড় থাকার পরও চিত্র বদলায়নি। হামজা চৌধুরী, শামিত সোম, জিদান ইউসুফ, ফারহান আলী ওয়াহিদ, শুকি ইতোফুসা, তারেক কাজী রায়হান ও জায়ান আহমেদের মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলও ইন্দোনেশিয়ার হাই প্রেস ফুটবলের সামনে বারবার বিপাকে পড়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত মানের নয়; এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি কাঠামোগত বাস্তবতা।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৮১তম স্থানে থাকা বাংলাদেশ আসিয়ান কাপ শেষ করেছে তিন ম্যাচে তিন হার নিয়ে। পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠাতে পেরেছে মাত্র দুবার, বিপরীতে হজম করেছে ১৩ গোল। ১১৮তম স্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া সেই ব্যবধানটা যেন মাঠেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
ডুলির বিশ্লেষণ ছিল বেশ সরাসরি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যে তীব্রতায় নিয়মিত অনুশীলন ও ম্যাচ খেলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের ফুটবলাররা সেই সুযোগই যথেষ্ট পান না বলে মনে করেন তিনি, ‘এই টুর্নামেন্ট থেকে আমরা যা শিখতে পারি, তা হলো, উন্নতি করতে চাইলে সবকিছু একদিনে হয় না; সময় লাগে। আপনাকে জানতে হবে আপনার হাতে কী ধরনের খেলোয়াড় আছে, তারা কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে খেলে ও অনুশীলন করে। এরপর প্রকৃত ম্যাচের সময় তারা কী ধরনের ভুল করে, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।’
বাংলাদেশের ফুটবলের বাস্তবতায় এই কথার মধ্যে নতুনত্ব খুব বেশি নেই। ঘরোয়া কোচরাও বছরের পর বছর ধরে প্রায় একই সমস্যার কথা বলে আসছেন, অনুশীলনে পর্যাপ্ত তীব্রতার অভাব, মানসম্পন্ন ম্যাচের স্বল্পতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ধীরগতি, কারিগরি দুর্বলতা এবং যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘরোয়া লিগের অভাব। কিন্তু এত বছর পরও সমস্যাগুলোর বড় অংশ একই জায়গায় রয়ে গেছে।
ডুলি সমস্যাটির একটি সংখ্যাগত উদাহরণও দিয়েছেন। ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে বহুল আলোচিত ‘১০ হাজার ঘণ্টা’ অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শীর্ষ পর্যায়ের লিগে পৌঁছাতে আপনাকে ফুটবলে ১০ হাজার ঘণ্টা দিতে হবে, অর্থাৎ বহু বছর ধরে প্রতিদিন প্রায় তিন ঘণ্টা। অন্য দেশগুলোর পর্যায়ে পৌঁছাতে বাংলাদেশের যে জায়গাটিতে ঘাটতি রয়েছে, সেটি হলো এই সময় ও পরিশ্রম।’
সমস্যাটার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক সম্ভবত এখানেই। কয়েকজন বিদেশে খেলা ফুটবলারকে জাতীয় দলে এনে দেওয়া কিংবা কোচ পরিবর্তন করলেই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া উন্নয়নগত ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে প্রায় প্রতিটি বিভাগেই সেই ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা সময় নিয়েছেন বেশি, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেছেন এবং নেওয়া সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করতেও সমস্যায় পড়েছেন।
‘আপনি যখন এই দলগুলোর বিপক্ষে খেলবেন, তখন আপনার চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি কম থাকবে, আপনার গতিও কম থাকবে। ফুটবলের সবকিছুই গতির সঙ্গে সম্পর্কিত, কত দ্রুত আপনি একটি পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন, কত দ্রুত সেটি বাস্তবায়ন করছেন এবং বল নিয়ন্ত্রণে নিতে আপনার কতটা সময় লাগছে।’ বলেন ডুলি।
এই বক্তব্যও বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে বহুদিনের পরিচিত সমালোচনাই মনে করিয়ে দেয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই সমস্যার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত আলোচনা ও সমালোচনার পরও সমস্যাগুলো কেন কাটছে না?
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড তাদের ফুটবল কাঠামোকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার পাশাপাশি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়ানোর ওপর বিনিয়োগ করেছে। তাদের সেরা ফুটবলারদের অনেকে এখন বিদেশে গিয়ে শক্তিশালী লিগে খেলছেন। সেই অভিজ্ঞতা পরে তারা জাতীয় দলে নিয়ে আসছেন।
ডুলিও এই পার্থক্যের দিকেই সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, ‘মালয়েশিয়ার দলগুলোর দিকে তাকান। তারা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী একটি লিগে খেলছে। কিংবা ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের দিকে তাকান। তারা ভালো, কারণ তারা একটি বছরজুড়ে প্রতিদিন অনুশীলন করছে এবং প্রতি সপ্তাহান্তে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলছে।’
ডুলির এই বক্তব্যের মূল জায়গাটি সহজ, আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে কয়েক দিন একসঙ্গে অনুশীলন করলেই কোনো জাতীয় দল হঠাৎ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না। আন্তর্জাতিক ফুটবল আসলে একটি দেশের পুরো ফুটবল কাঠামোর চূড়ান্ত ফলাফল।
আর সেই কাঠামোর জায়গাতেই বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে।
তবে ডুলির কাছে আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের অর্জন শুধু ফলাফলের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, বড় ব্যবধানে হারও কাজে লাগতে পারে, যদি সেই হার এমন দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে আসে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে সংশোধন করা সম্ভব।
কোচিং স্টাফরা ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের ভুলগুলো বারবার দেখাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন ডুলি। পাশাপাশি আরও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া, পাসিংয়ের উন্নতি এবং দুই পা দিয়েই স্বাচ্ছন্দ্যে খেলার অভ্যাস তৈরির ওপরও কাজ করছেন তারা।
ডুলি বলেন, ‘আপনি যদি শুধু র্যাঙ্কিংয়ে আপনার পেছনে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে খেলেন এবং জেতেন, তাহলে সেটি দেখতে দারুণ লাগে এবং আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। কিন্তু এতে আপনার উন্নতি হয় না। শেষ পর্যন্ত যখন আপনি আরও ভালো ও দ্রুতগতির একটি দলের মুখোমুখি হবেন, তখন হঠাৎ ধাক্কা খাবেন।’
জাকার্তায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছে।
তবে ৯-২ গোলের ফলাফলের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটও ছিল। ফাইনালে ওঠার জন্য গোল ব্যবধানে মালয়েশিয়াকে টপকাতে ইন্দোনেশিয়ার বড় ব্যবধানে জয় প্রয়োজন ছিল। ফলে ম্যাচের ফল কার্যত নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পরও তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট প্রেরণা ছিল।
ডুলি এ প্রসঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে আগের ম্যাচটির উদাহরণ টেনেছেন। সেই ম্যাচে এগিয়ে যাওয়ার পর ইন্দোনেশিয়া গোলের জন্য মরিয়া না হয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছিল।
বাংলাদেশের বিপক্ষে পরিস্থিতিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ডুলি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এবার তাদের আমাদের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জিততেই হতো। পরিস্থিতিটা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, আরও একটি গোল করার জন্য তারা যোগ করা সময়ের সাত মিনিটও খেলেছে।’
এই প্রেক্ষাপট অবশ্যই বাংলাদেশের দুর্বলতাগুলোকে মুছে ফেলবে না। তবে স্কোরলাইন কেন এত অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল, তা বুঝতে সাহায্য করে। এখন বাংলাদেশ দেশে ফিরবে। সামনে নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আর সেই টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে ডুলির বার্তাও বদলে যাচ্ছে। তার মতে, আসিয়ান কাপ ছিল শেখার জায়গা। কিন্তু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হবে জয়ের জন্য লড়াইয়ের মঞ্চ।
ডুলি বলেন, ‘এখানে আমাদের ম্যাচগুলো শেখার জন্য ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার পর আমাদের সাফ টুর্নামেন্ট জিততে হবে। এ নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই।’
এটাই বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ।
তবে নভেম্বরের পর অপেক্ষা করছে আরও বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নটি আসলে বাংলাদেশের ফুটবল বহু বছর ধরেই নিজেকে করে আসছে, শেখা বিষয়গুলো শেষ পর্যন্ত কবে মাঠের ফলাফলের বাইরে গিয়ে দেশের ফুটবল কাঠামোর স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ নেবে?

