শেরপুরের বাজিতখিলা গ্রামের বাসিন্দা নুসরাত জাহান রিতুর বাড়ির পাশের পুকুরটি বর্ষার পানিতে ভরে গেছে। চার বছর বয়সী মেয়ে আফিয়া জান্নাত ও ১০ মাস বয়সী আরেক সন্তানকে নিয়ে এখন সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন তিনি। কয়েক মিনিট পরপরই খোঁজ নেন, এই বুঝি তারা পুকুরের দিকে চলে গেল।
রিতুর উদ্বেগ আরও বেড়েছে গত ডিসেম্বর থেকে। তখন থেকে বন্ধ আছে এলাকার কমিউনিটি শিশু যত্ন কেন্দ্র। আগে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সেখানে মেয়েকে রেখে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে পারতেন তিনি।
রিতু বলেন, কেন্দ্র চালু থাকলে আমি নিশ্চিন্তে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারতাম। এখন পরীক্ষা চলার মধ্যেই সন্তানদের নিরাপদে রাখা খুব কঠিন হয়ে গেছে।
রিতুর মতো দেশের অসংখ্য গ্রামীণ পরিবার এখন একই সমস্যায় পড়েছে। সরকারের শিশু পরিচর্যা কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় তারা সন্তানদের নিরাপদ রাখার গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থা হারিয়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ২০২২ সালে ৩০৬ কোটি টাকার ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্প’ চালু করে।
এই প্রকল্পের আওতায় ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় ৮ হাজার শিশু যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। সেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় দুই লাখ শিশুর দেখাশোনা করা হতো। পাশাপাশি ১ হাজার ৬০০টি সুইম-সেইফ কেন্দ্রের মাধ্যমে ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী আরও প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হতো।
প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন না পাওয়ায় এখনো সেগুলো চালু করা যায়নি।
এদিকে এই বন্ধের সময়টিই পড়েছে বর্ষা মৌসুমে, যখন দেশে শিশু ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ডুবে মারা গেছে ৫৮৩ জন। এর মধ্যে ৫২৭ জনই শিশু।
গত বছর ডুবে মারা যায় ১ হাজার ৩১১ জন। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ১ হাজার ১৮৪ জন ছিল শিশু।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি মাসেই অন্তত নয়টি শিশু ডুবে মারা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগস্ট মাসে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। কারণ তখন বর্ষার পানি বেড়ে যায় এবং গ্রামীণ নারীরা ঘরের কাজ, গবাদিপশুর দেখাশোনা বা কৃষিকাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ শিশু বাড়ির কয়েক মিটারের মধ্যেই সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে পানিতে ডুবে মারা যায়। এ সময় মায়েরা সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। আগে এই সময়টাতেই শিশু যত্ন কেন্দ্রগুলো ছোট শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে রাখত।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এই কেন্দ্রগুলোতে নিবন্ধিত কোনো শিশুর ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
শুধু ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ নয়, শিশুদের বিকাশেও এই কেন্দ্রগুলোর ইতিবাচক প্রভাব ছিল।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের ২০২৫ সালের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, এসব কেন্দ্রে যাওয়া শিশুদের ভাষা, চলাফেরা ও আত্মবিশ্বাসের বিকাশ তুলনামূলক ভালো হয়েছে।
অন্যদিকে মায়েরা নিশ্চিন্তে কাজ বা পড়াশোনা করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় অনেক নারী পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
ময়মনসিংহের নান্দাইলের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার বলেন, তার তিন বছরের ছেলে আগে কেন্দ্রটিতে যেত।
তিনি বলেন, সংসারের কাজ, অসুস্থ স্বজনের দেখাশোনা, গরু-ছাগল সামলানো আর ছোট শিশুকে একসঙ্গে দেখাশোনা করা খুব কঠিন। আগে সেলাইয়ের কাজ করে কিছু আয় করতে পারতাম, এখন সেটাও পারি না।
অভিভাবকদের ভাষ্য, এখন অনেক ছোট শিশু দীর্ঘ সময় কোনো তদারকি ছাড়াই থাকে। কেউ কেউ আবার বয়স্ক দাদা-দাদী বা নানা-নানীর কাছে থাকে, যাদের পক্ষে সব সময় নজর রাখা সম্ভব হয় না। ফলে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। পাশাপাশি শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি ও পুষ্টিকর খাবারের সুবিধাও হারাচ্ছে।
কেন্দ্র বন্ধ থাকায় শত শত পরিচর্যাকারীও কাজ হারিয়েছেন।
শেরপুরের পরিচর্যাকারী রুপালী আক্তার বলেন, জানুয়ারি থেকে তাদের ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, এই টাকায় নিজের সন্তানদের জন্য কিছু কিনতে পারতাম। এখন আর পারি না। এলাকার মায়েরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, কেন্দ্র কবে খুলবে।
আরেক পরিচর্যাকারী লতিফা খাতুন বলেন, আমার নিজের সন্তান নেই। ২০ থেকে ২৫টি শিশুর দেখাশোনাই ছিল আমার জীবন। এখন আমার একমাত্র আয়ের উৎসও নেই, আনন্দও নেই।
প্রকল্প পরিচালক তারিকুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ৮৩৮ কোটি টাকার নতুন একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
এতে ১৬ জেলার বদলে ৩০ জেলা এবং ৪৫ উপজেলার বদলে ৭৯ উপজেলায় কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সারা দেশে ১৩ হাজারের বেশি শিশু যত্ন কেন্দ্র চালু হবে। শিশু যত্ন ও সুইম-সেইফ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ ৬ হাজার শিশাকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিচর্যাকারীদের মাসিক ভাতা ৪ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদন পেলেই আগে বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো চালু করা হবে। তবে সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী বেসরকারি সংস্থা নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করে মাঠপর্যায়ে পুরো কার্যক্রম শুরু করতে আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা দ্রুত আয়োজনের জন্য আমরা পরিকল্পনা কমিশনকে অনুরোধ করেছি। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। খুব শিগগিরই সভার তারিখ নির্ধারণ হবে বলে আশা করছি।
তবে কেন্দ্রগুলো কবে চালু হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি। শুধু বলেছেন, আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই প্রকল্পটির অনুমোদন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে আর শুধু প্রকল্পনির্ভর রাখলে চলবে না। এটি সরকারের নিয়মিত জনসেবা হিসেবে রাজস্ব বাজেট থেকে পরিচালনা করা উচিত। আর উন্নয়ন বাজেট ব্যবহার করা উচিত কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও নতুন উদ্যোগের জন্য।
সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মীর মাসরুর জামান বলেন, প্রকল্প শেষ হলেই সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রশিক্ষিত জনবল ছড়িয়ে পড়ে এবং কমিউনিটিভিত্তিক নজরদারিও ভেঙে যায়। অথচ শিশু ডুবে মৃত্যু সারা বছরই জনস্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষার একটি বড় সমস্যা।
তার মতে, জনবল, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য রাজস্ব বাজেটে স্থায়ী বরাদ্দ থাকা উচিত। আর উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ ব্যবহার করা উচিত নতুন এলাকা ও নতুন উদ্যোগে। এতে সেবার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

