সৌদি আরবের রাজধানীর কাছে শনিবার একটি তেল স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ঘটনাস্থলে থাকা এএফপির এক সাংবাদিক সেখানে আগুন ও ধোঁয়া উড়তে দেখেছেন।
অন্যদিকে, হুতিরা অভিযোগ করেছে, সৌদি জোট গত কয়েক দিনে রাজধানী সানায় বিমান হামলা চালিয়েছে।
গত মাসে ইয়েমেনের লোহিত সাগরের পুরো উপকূল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই এই দুই পক্ষ একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হুতি-নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টিভি জানিয়েছে, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ‘সৌদি শত্রু বিমান’ ২৬ বার হামলা চালিয়েছে। এর আগে তারা সানায় ‘সৌদি আগ্রাসনের’ খবর দিলেও হামলার লক্ষ্যবস্তু বা হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
সানায় অবস্থানরত দুজন সংবাদকর্মী জানিয়েছেন, তারা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং যুদ্ধবিমান থেকে শহরের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে দেখেছেন।
অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবে, শনিবার বিকেলে রিয়াদের দক্ষিণে আরামকোর একটি স্থাপনা থেকে আগুন ও ধোঁয়া উড়তে দেখেছেন এএফপির একজন সাংবাদিক।
যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে শনিবার গভীর রাতে হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে রিয়াদের একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালান এবং এতে সেখানে আগুন ধরে যায়।
এএফপির সাংবাদিক জানিয়েছেন, তিনি রিয়াদের দক্ষিণে অবস্থিত আরামকোর তেল শোধনাগারে অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দেখেছেন। স্থাপনাটির কাছে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়িও অবস্থান করছিল।
এদিকে, শনিবারের শুরুর দিকে হুতিদের আল-মাসিরাহ চ্যানেল জানায়, তাদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সা’দা প্রদেশে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
ইয়েমেনে ভয়াবহ খাদ্যসংকটের ঝুঁকি
কয়েক বছর শান্ত থাকার পর, গত মাসে ইয়েমেন আবারও গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছে। একদিকে রয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী, যারা সানা-সহ উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে; অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার।
এডেন শহরভিত্তিক এই সরকার দেশের দক্ষিণ ও পূর্বের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। অঞ্চলটি আয়তনে বড় হলেও জনসংখ্যায় বেশ কম।
চার বছর ধরে চলা এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত নতুন করে দানা শুরু হয়, যখন ইরান সানায় হুতি প্রতিনিধিদলকে বহনকারী একটি বিমান পাঠায়।
গত এক দশক ধরে যে নিয়ম চলে আসছিল, তা উপেক্ষা করে ফ্লাইটটি সৌদি আরবের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি।
এর জবাবে রিয়াদ সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালায়।
এরপর থেকেই সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। হুতিরা বিদ্যুৎগতিতে অভিযান চালিয়ে বাব আল-মানদেব প্রণালির উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।
তারা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। সেই সঙ্গে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নৌ-অবরোধেরও ঘোষণা দিয়েছে।
নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইয়েমেনের মানবিক সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
গত শুক্রবার বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে জানিয়েছে, দেশটির তিন-চতুর্থাংশ মানুষ এখন তাদের মৌলিক খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারছে না।
তাইজ শহরকে কেন্দ্র করে সংঘাত
গত কয়েক দিনে ইয়েমেনের তাইজ শহরকে কেন্দ্র করে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। শুক্রবার উভয় পক্ষের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, এই সংঘাতে বহু যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
হুতিরা জানিয়েছে, তাদের ৫৫ যোদ্ধা নিহত হয়েছে; অন্যদিকে সরকারি সূত্রগুলো এএফপিকে জানিয়েছে, তাদের ২৬ জন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে।
তাইজ শহর ঘিরে সংঘাত এখন বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সেই সব পাহাড়ি এলাকা, যেখান থেকে হুতিদের সদ্য দখল করা উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর ওপর নজর রাখা যায়।
হুতিরা ইয়েমেনের বিশাল এলাকা দখল করে নিলেও, সানা ও এডেনের পর দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
শুক্রবার হুতিরা আরও দাবি করেছে, সৌদি আরব আগের ২৪ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে ৯৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে নাজরান শহরে হুতিদের ছোড়া একটি প্রজেক্টাইল একটি স্কুলে আঘাত হেনেছে এবং এতে স্কুলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, রিয়াদ এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চেয়েছে, তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সেই অনুরোধে সাড়া দেননি।
শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিও তিন মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা শুক্রবার বৈঠক করেছেন।
সেখানে ইয়েমেন পরিস্থিতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এই বৈঠকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

