মানসিক ধাক্কা আর নেপালের কঠিন চ্যালেঞ্জ— দুইটি বড় বাধা টপকে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার গোয়ায় অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে অবশ্য লাল-সবুজ জার্সিধারীদের পারফরম্যান্স তাদের স্বাভাবিক মানদণ্ডের চেয়ে কিছুটা নিচেই ছিল।
গত ২০২২ ও ২০২৪ সালে টানা দুবার শিরোপা উঁচিয়ে ধরার পথে বাংলাদেশ যে আগুনে ফর্ম দেখিয়েছিল, এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে মেয়েদের। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে স্বাগতিক ভারতের কাছে হতাশাজনক হারের পর সেমিফাইনালে তাদের মুখোমুখি হতে হয় ছয়বারের রানার্সআপ নেপালের। সেখানে সিংহভাগ সময় আধিপত্য বিস্তার করে বেশ কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করেছিল নেপালি মেয়েরা।
মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও যেন বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা ছিল দলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শিউলি আজিমের অনুপস্থিতি। নেপালের মুখোমুখি হওয়ার আগের দিন শিউলির মা মারা যান। এই আকস্মিক শোকে পুরো দল এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে, সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের আগের দিনের অনুশীলন সেশনটি পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হয় তারা।
সাবেক অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার দলে ফেরায় রক্ষণভাগে কিছুটা স্থিতি এলেও মাঝমাঠের সমন্বয়হীনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বর্তমান অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা আগের দুই ম্যাচের মতো মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে সেই চিরচেনা দাপট দেখাতে পারেননি।
তবে নেপালের কাছে শুরুতে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পর ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের সময়োপযোগী ও কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আক্রমণভাগে গতি বাড়াতে তিনি মাঠে নামান শামসুন্নাহার জুনিয়র ও তহুরা খাতুনকে। দ্বিতীয়ার্ধে মনিকা চাকমা, শাহেদা আক্তার রিপা ও মোসাম্মৎ সাগরিকার মতো খেলোয়াড়দের বদলি হিসেবে নামানো হলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসে।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বাটলার বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা বদলি খেলোয়াড়দের খুব ভালোভাবে ব্যবহার করেছি। এটাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘আমি জানতাম যে, মনিকা পুরো ম্যাচ খেলতে পারবে না। কারণ, ও আবার চোট পেয়েছিল। তাই ওকে শুরু থেকে খেলাইনি। পরিস্থিতি ও মাঠের পরিবেশ সামলানোর পাশাপাশি এই প্রচণ্ড গরমে সঠিক সময়ে সঠিক বদলি নামানোর সিদ্ধান্তটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
মাঝমাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনার জবাবে দলের লড়াকু মানসিকতার ঢাল হয়ে দাঁড়ান বাটলার, ‘আমাদের আসলেই জানপ্রাণ দিয়ে লড়তে হয়েছে… কামড়ে পড়ে থাকতে হয়েছে। মারিয়া ছিল আমাদের মূল চালিকাশক্তি, আর মাঠে নেমে রিপাও দারুণ করেছে। দুর্ভাগ্যবশত মনিকা আবার চোট পেয়েছে। তবে এই ম্যাচে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল দলের চরিত্র ও ঘুরে দাঁড়ানোর জেদ।’
ম্যাচ শেষে নেপালের কোচ নবীন নিউপানে বাংলাদেশের এই জয়কে ‘ভাগ্যপ্রসূত’ বলে দাবি করেন। বেশ কিছু সুযোগ তৈরির পাশাপাশি দুবার তাদের নেওয়া শটে বল পোস্টে বাধা পায়। এর জবাবে কড়া ভাষায় বাটলার বলেন, ‘আপনি যত বেশি পরিশ্রম করবেন, ভাগ্য তত বেশি আপনার সহায় হবে। এই কথাটা মনে রাখবেন, আর প্রয়োজনে নিজের সমাধি স্তম্ভেও এটা লিখে রাখতে পারেন।’
শিউলির ব্যক্তিগত বেদনা সামলে মাঠে নামার বিষয়ে অধিনায়ক মারিয়া বলেন, ‘শিউলি যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, আমরাও ঠিক একই কষ্ট অনুভব করছিলাম। তবে আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিয়েছিলাম যে, এটাই আমাদের শেষ সুযোগ। এই সুযোগ যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি, তবেই ফাইনালে যেতে পারব।’
বাংলাদেশ দল এই জয় উৎসর্গ করেছে শিউলির প্রয়াত মায়ের উদ্দেশ্যে।
এদিনও নিজের চেনা ফর্মে না থাকলেও এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা। কর্নার কিক থেকে সরাসরি করা অলিম্পিক গোলের সুবাদে ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।
টিম বাসে ওঠার সময় ঋতুপর্ণা বলেন, ‘এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি কীভাবে গোলটা করে ফেললাম, তা আমি নিজেও জানি না। আমার মনে হয়, এটা সৃষ্টিকর্তার উপহার ছিল। প্রতিটি গোলই স্পেশাল, তবে আজকের গোলটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।’

