যেভাবে লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত দখলে নিলো ইসরায়েল

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়ে লিতানি নদী পর্যন্ত দখলে নেওয়ার দাবি করেছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সপ্তম সাঁজোয়া ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাউল ইসরায়েলি।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তার বাহিনী শুধু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পথই দখল করেনি, বরং গত দুই দশকে হিজবুল্লাহ নির্মিত বিশাল ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার নেটওয়ার্কও নিষ্ক্রিয় করেছে।

কর্নেল ইসরায়েলির বর্ণনা অনুযায়ী, লিতানি নদীর দিকে অগ্রসর হওয়ার অভিযান ছিল দক্ষিণ লেবাননে পরিচালিত স্থল অভিযানের সবচেয়ে কঠিন প্রকৌশলগত মিশনগুলোর একটি।

খাড়া পাহাড়ি পথ, বিস্ফোরক ফাঁদ, অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং মর্টার গোলার হুমকির মধ্য দিয়ে সেনাদের অগ্রসর হতে হয়েছে। সামনের সারিতে থাকা ডি-৯ বুলডোজারগুলো নতুন পথ তৈরি করে ট্যাংকগুলোর অগ্রযাত্রার সুযোগ করে দেয়।

তিনি বলেন, কোনো ভুল সিদ্ধান্ত পুরো বাহিনীকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারত।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিতানি ও সালুকি উপত্যকা এলাকায় একযোগে অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা।

তিনি বিশেষভাবে ৬০৩তম ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সদস্যদের প্রশংসা করে বলেন, তাদের অবদান ছাড়া এই অভিযান সম্ভব হতো না। প্রকৌশল ইউনিটের সদস্যরা এমন সব কাজ সম্পন্ন করেছেন, যেগুলো আগে প্রায় অসম্ভব বলে বিবেচিত হতো।

ইসরায়েলি কমান্ডার জানান, যুদ্ধবিরতির পর সপ্তম ব্রিগেডই প্রথম লড়াইয়ে অংশ নেয়। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল তাইবে, মারকাবা ও রাব এল-থালাথিনে গ্রামের মতো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দখল করে উত্তর ইসরায়েলে হামলার ঝুঁকি কমানো। পরে গোলানি ব্রিগেড তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর শুরু হয় কান্তারা এলাকায় হিজবুল্লাহর কথিত ‘সিটি অব রিফিউজ’ বা ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র দখলের অভিযান।

কর্নেল ইসরায়েলির দাবি, কান্তারায় যে অবকাঠামো পাওয়া গেছে তা প্রায় ২০ বছর ধরে ইরান ও হিজবুল্লাহর সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে অস্ত্রভান্ডার, টানেল, অ্যান্টি-ট্যাংকের অবস্থান এবং ইসরায়েলে অনুপ্রবেশের প্রস্তুতির জন্য বিশেষ ঘাঁটি ছিল।

তার মতে, এই অবস্থানটি লিতানি নদীর দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করত।

অভিযানের একপর্যায়ে তার বাহিনী শত শত আত্মঘাতী ড্রোনের হামলার মুখে পড়ে বলে দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে বিউফোর্ট ও গান্দুরিয়েহ অঞ্চলেও হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের সামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।

তার ভাষায়, সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে পুরো এলাকা ‘জ্বলছিল’। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেখানে বহু হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে শাউল ইসরায়েলি বলেন, হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননকে বহুস্তরবিশিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। একটি অংশ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলার জন্য, একটি অংশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের জন্য, আরেকটি অংশ ইসরায়েলি স্থল অভিযান বিলম্বিত করার জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। এসব অবকাঠামোর বড় অংশই ছিল ভূগর্ভে, যা বিমান হামলা থেকেও সুরক্ষিত থাকার মতো করে নির্মাণ করা হয়েছিল।

কর্নেল ইসরায়েলির দাবি, কান্তারা ও বিউফোর্ট এলাকায় পাওয়া ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কগুলোর কিছু কিছু ১ দশমিক ২ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ। এসব স্থাপনায় অসংখ্য কক্ষ, অস্ত্র মজুতের স্থান এবং যোদ্ধাদের অবস্থানের ব্যবস্থা ছিল।

তার মতে, গাজার তুলনায় লেবাননের এসব টানেল শনাক্ত করা সহজ ছিল, কারণ সেগুলো আকারে বড় এবং একবার প্রবেশপথ শনাক্ত করা গেলে পুরো নেটওয়ার্কের মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়।

সাক্ষাৎকারে ড্রোন যুদ্ধের বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, বিস্ফোরকবাহী ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যতম বড় হুমকি হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে এদের বিস্ফোরণ ক্ষমতা ও পাল্লা আরও বাড়বে।

তিনি বলেন, ড্রোনের কারণে সামরিক কৌশল বদলাতে বাধ্য হচ্ছে সেনাবাহিনী। তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এই হুমকির কার্যকর মোকাবিলা সম্ভব বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।

আধুনিক যুদ্ধে ট্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কর্নেল ইসরায়েলি বলেন, বর্তমানের ট্যাংক আর শুধু একটি সাঁজোয়া যান নয়; এটি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং ড্রোন পরিচালনাসহ বিভিন্ন সক্ষমতাসম্পন্ন একটি সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থা।

তার মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রেও ট্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে সেনা কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে, প্রায় তিন বছরের টানা সংঘাতের ফলে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডারদের দায়িত্বের চাপ কমাতে দায়িত্বকালের মেয়াদ পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন তিনি।

সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডারদের স্ত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন বোঝা বহন করছেন তারাই।

Related Articles

Latest Posts