বেবেতোর ‘রক দ্য বেবি’ উদযাপন

রণক্ষেত্রের দামামার মাঝে হঠাৎ যদি বেজে ওঠে কোনো রাখালিয়া বাঁশি? গ্যালারির গগনবিদারী চিৎকার যেখানে আছড়ে পড়ছে সবুজ ঘাসে, সেখানে একজন যোদ্ধা হঠাৎ যদি ভুলে যান তার যুদ্ধ! তার দুহাত আর শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হলো না, বরং নেমে এলো বুকের কাছে, পরম আদরে। যেন সেই উত্তাল রণাঙ্গন মুহূর্তেই হয়ে গেল এক স্নিগ্ধ, নিভৃত আঁতুড়ঘর। ঘামের গন্ধে ভারী হয়ে থাকা বাতাসে যেন ছড়িয়ে পড়ল সদ্যোজাত এক শিশুর গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ।

সময়টা ১৯৯৪ সালের ৯ জুলাই। ডালাসের কটন বোল স্টেডিয়ামের ওপর তখন আগুনের হলকা ছড়াচ্ছে টেক্সাসের গনগনে সূর্য। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হলুদ জার্সির ব্রাজিল আর কমলা দুর্গের নেদারল্যান্ডস। প্রতিটি স্নায়ুতে তখন টানটান উত্তেজনা, খেলোয়াড়দের নিঃশ্বাসে বারুদের আঁচ।

ম্যাচের ঠিক ৫৩ মিনিট। ডাচদের নিপুণ অফসাইড ফাঁদকে এক জাদুকরী সুতোয় ছিন্ন করে বেরিয়ে গেলেন এক ছিপছিপে, দেবদূত-দর্শন ব্রাজিলিয়ান।

তার সেই দৌড় ছিল যেন অরণ্য চিরে ছুটে চলা কোনো হাওয়ার ঝাপটা। সামনে কেবল একা ডাচ গোলরক্ষক এড ডি গুই, যেন এক বিশাল প্রাচীর। কিন্তু সেই প্রাচীরকেও নিপুণ শিল্পীর মতো পাশ কাটালেন তিনি। তারপর, এক চিলতে হাসির মতো বলটিকে আলতো করে পাঠিয়ে দিলেন ফাঁকা জালের আশ্রয়ে। ডাচদের কফিনে দ্বিতীয় পেরেকটি ঠুকে দিলেন ব্রাজিলের নম্বর সেভেন বেবেতো।

তবে জালের ভেতর বলের সেই লুটোপুটি খাওয়ার দৃশ্যটি খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে গেল এক অকল্পনীয় জাদুকরী দৃশ্যের কাছে।

গোল করার পর বেবেতোর চোখ-মুখ চিরে বেরিয়ে এল না কোনো আগ্রাসী হুঙ্কার। তিনি ছুটলেন সাইডলাইনের দিকে, কিন্তু তার দুই হাত ততক্ষণে বুকের কাছে এসে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য দোলনা।

মাত্র দুদিন আগে, হাজার মাইল দূরে তার স্ত্রী জন্ম দিয়েছেন এক পুত্রসন্তান। দেশের হয়ে লড়তে আসা এক পিতা তার সদ্যোজাত সন্তানকে দুচোখ ভরে দেখতে পারেননি। ছুঁয়ে দেখতে পারেননি সেই নরম হাত। বুকের গহিনে জমে থাকা সেই আক্ষেপ, সেই অসীম পিতৃস্নেহ যেন ডালাসের তপ্ত দুপুরে আছড়ে পড়ল।

বেবেতো তার শূন্য বাহুতে অদৃশ্য এক শিশুকে পরম মমতায় দোল খাওয়াতে লাগলেন। তার চোখেমুখে তখন কোনো ফুটবলারের ছাপ নেই, তিনি কেবলই একজন বাবা, যিনি সুদূর আমেরিকা থেকে কল্পনার সুতোয় দোল দিচ্ছেন তার নাড়িছেঁড়া ধনকে। আর বলছেন, ‘এই গোল, এই উল্লাস, সবকিছুর ওপরে তুমি আছো।’

জাদুবাস্তবতার সেই মুহূর্তটি যেন পূর্ণতা পেল পরের কয়েক সেকেন্ডে। বেবেতোর সেই ঘোরলাগা একাকী উদযাপনে আচমকাই ছুটে এলেন আরও দুই মহারথী রোমারিও ও মাজিনহো। তারা শুধু এলেনই না, বেবেতোর দুই পাশে দাঁড়িয়ে ঠিক একই ভঙ্গিমায় শূন্যে হাত দোলাতে শুরু করলেন। তিনজন পরিণত পুরুষ, বিশ্বমঞ্চের ভয়ংকর তিনজন যোদ্ধা, এক সারিতে দাঁড়িয়ে একই ছন্দে, একই তালে ঘুম পাড়াচ্ছেন এক অদৃশ্য মানবসন্তানকে!

গ্যালারিতে বসা হাজারো দর্শক আর টেলিভিশনের পর্দায় আটকে থাকা কোটি কোটি চোখ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের সামনে।

বিশ্বকাপের মতো এক নিষ্ঠুর রণাঙ্গন, যেখানে প্রতিটি ইঞ্চি ঘাসের জন্য চলে রক্তক্ষয়ী লড়াই, সেখানে এমন এক বিশুদ্ধ, স্নিগ্ধ পারিবারিক মায়া নেমে আসতে পারে, তা ছিল মানুষের কল্পনারও অতীত। সেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য কটন বোল স্টেডিয়াম ভুলে গিয়েছিল এটা কোনো ফুটবল ম্যাচ। মনে হচ্ছিল, পুরো বিশ্ব যেন থমকে দাঁড়িয়ে এক নতুন অতিথির আগমনী গানে সুর মেলাচ্ছে।

এটাই হয়তো ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। এখানে এক মুহূর্তেই একজন খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারেন একজন কবি, একজন যোদ্ধা, কিংবা একজন স্নেহময় বাবা। ডালাসের সেই দুপুরে শূন্য বাহুর ওই দোলানি আসলে ঘাসের ওপর লেখা এক অমর কবিতা, যেখানে একজন পিতা তার হৃদয়ের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে পৃথিবীকে জানিয়েছিলেন, ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো জয় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নেই।
 

Related Articles

Latest Posts