বাঘ রক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চোরাশিকার: ড. মনিরুল এইচ খান

বাঘ ও এর আবাসস্থল সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২৯ জুলাই পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চোরাশিকারের মতো বহুমুখী সংকটে হুমকির মুখে এখন বাংলাদেশের জাতীয় পশু।

বাঘের বর্তমান অবস্থা, লোকালয়ে আসার কারণ এবং সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ৪০-৫০ বছর আগের তুলনায় বাঘ নিঃসন্দেহে কমেছে। তবে ২০০৪ সালে শুধু পায়ের ছাপ দেখে গণনা করা ৪৪০টি বাঘের হিসাবটি বিজ্ঞানসম্মত ছিল না। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে ‘ক্যামেরা ট্র্যাপিং’ পদ্ধতিতে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানসম্মত জরিপে ১০৬টি বাঘ পাওয়া যায়। আর ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫-এ। তাই আগের ৪৪০-এর সঙ্গে বর্তমান সংখ্যার তুলনা করাটা যৌক্তিক হবে না।

বাঘ কেন লোকালয়ে আসে?

বন ছেড়ে বাঘের লোকালয়ে আসার পেছনের দুটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ড. মনিরুল। প্রথমত, বয়স্ক বাঘ যখন অন্য শক্তিশালী বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে নিজের এলাকা ধরে রাখতে পারে না, তখন বাধ্য হয়ে গ্রামের দিকে চলে আসে। দ্বিতীয়ত, সাড়ে তিন বা চার বছর বয়সের তরুণ বাঘ মায়ের সঙ্গ ছেড়ে নিজের নতুন সীমানা খুঁজতে বের হয়ে অনেক সময় পথ ভুল করে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘গ্রামে ঢুকে পড়া বাঘ সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না, বড়জোর গবাদিপশু মারে। মানুষ যখন আতঙ্কিত হয়ে বাঘটিকে ঘিরে ফেলে বা মারার চেষ্টা করে, তখনই আত্মরক্ষার্থে সেটি আক্রমণাত্মক হয়। মানুষের ওপর বেশির ভাগ আক্রমণের ঘটনাই ঘটে গহিন বনের ভেতর। মৌয়াল বা জেলেরা দলছুট হয়ে একা হয়ে গেলে বাঘার আক্রমণের মুখে পড়তে পারেন।’

বাঘকে টিকে থাকতে হলে শিকারের বড় প্রাণী অবশ্যই লাগবে বলে জানান অধ্যাপক মনিরুল। তিনি বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনের বাঘের খাদ্যের প্রায় ৮০ ভাগ জোগান দেয় চিত্রা হরিণ। অর্থাৎ, হরিণ ছাড়া বাঘ টিকতে পারবে না। এর পাশাপাশি বুনো শূকর, বানর বা মায়া হরিণও এরা শিকার করে।

বাঘের আবাসস্থলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সম্পর্কে তিনি বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় সুন্দরবনের দক্ষিণাংশের বিস্তীর্ণ ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বনের আয়তন কমলে স্থলচর প্রাণী হিসেবে বাঘ বা হরিণের টিকে থাকাও কঠিন হবে।

এ ছাড়া লবণাক্ততা বাড়ায় কৃষিজমির ফসল কমছে। এতে মানুষের দারিদ্র্য বাড়বে এবং অভাবের মুখে মানুষ জীবিকার তাগিদে বনে অবৈধভাবে গাছ কাটা বা হরিণ শিকারের মতো অপরাধে বেশি জড়িয়ে পড়বে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘চোরাশিকার’

ড. মনিরুল জানান, বাঘ রক্ষায় দেশের কঠোর আইন রয়েছে এবং বন বিভাগের টহল জোরদার করায় প্রচুর হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো চোরাশিকার এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, হরিণ ধরার ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘও মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছে। কয়েক মাস আগেও এমন একটি বাঘ উদ্ধার করে ৬ মাস চিকিৎসার পর বনে ফেরানো হয়েছে। আবার বিষটোপ দিয়ে হরিণ মারা হয়, সেই বিষাক্ত মাংস খেয়ে বাঘও মারা পড়ে।

বাঘ বাঁচাতে হলে সবার আগে চোরাশিকার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার তাগিদ দেন এই গবেষক। 

বাঘ রক্ষায় বননির্ভর মানুষের জন্য বনের বাইরে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts