বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন পুঁতছে কারা?

গত সপ্তাহে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন মাথিংচিং তঞ্চঙ্গ্যা। তবে শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখার প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই তার বাবা মারা যান।

মাথিংয়ের স্বামী, ৩২ বছর বয়সী শৈফুচিং তঞ্চঙ্গ্যা, ২৪ মে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন জুমচাষের জমিতে কাজ করার সময় স্থলমাইন বিস্ফোরণে নিহত হন। একই ঘটনায় আরও দুজন নিহত হন—অক্যমং তঞ্চঙ্গ্যা (৪০) ও চিক্যং তঞ্চঙ্গ্যা (৩৪)। পাহাড়ের ঢালে থাকা একটি কলাবাগানের পরিচর্যা করতে গিয়েছিলেন তারা।

নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে গত শনিবার দ্য ডেইলি স্টারের এই প্রতিবেদক যান বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের ফাত্রাঝিরিতে। দুর্গম এই এলাকায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পর্যন্ত নেই। সেখান থেকে আরও ভেতরে ভালুকিয়া পাড়ায় গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় মাথিংয়ের বাড়ি।

বাঁশের খুঁটির ওপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ভেতরে দোলনায় ঘুমাচ্ছিল তার নবজাতক শিশু। ঘটনার কথা জানতে চাইলে মাথিং কথা শুরু করলেও কিছুক্ষণ পর কান্নায় ভেঙে পড়েন।

‘এখন এই তিন সন্তান নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব? কী করব?’—অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন তিনি। বারবার প্রশ্ন করছিলেন, বাংলাদেশের ভেতরে নিজের জুমে কাজ করতে গিয়ে কেন তার স্বামীকে প্রাণ দিতে হলো।

শোকে কথা বলতে না পারায় প্রতিবেশী উলাচিং এগিয়ে আসেন। তিনি জানান, তাদের গ্রাম থেকে জুমে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটতে হয়। সেখান থেকে মিয়ানমার সীমান্ত আরও এক ঘণ্টার পথ। শৈফুচিং ও অন্য দুই নিহত সেখানে তাদের কলাবাগানে কাজ করতে গিয়েছিলেন।

উলাচিংয়ের ভাষ্য, বাগানে কাজ করার সময় প্রথম বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন শৈফুচিং। তাকে উদ্ধার করতে গেলে দ্বিতীয় বিস্ফোরণে আহত হন অন্য দুজনও। পরে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। গ্রামবাসীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন।

মাথিংয়ের বাড়ি থেকে অল্প দূরেই অক্যমং এর বাড়ি। তার স্ত্রী দুখমালা তখন গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সাংবাদিক এসেছেন শুনে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে যে তার স্বামী ও অন্যরা মিয়ানমারে প্রবেশ করার পর নিহত হয়েছেন, কিন্তু তিনি এই দাবি মানেন না। তিন সন্তানকে নিয়ে কীভাবে জীবন চালাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

উলাচিং জানান, এলাকায় প্রায় ৪০০ তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারের জুমের জমি রয়েছে সেইসব এলাকায়, যেখানে স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে অনেকেই আর জমিতে যেতে পারছেন না।

‘প্রায় সবারই এনজিওর ঋণ আছে। আমাকে প্রতি মাসে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। কিন্তু আমি এখন এতটাই ভয় পাচ্ছি যে কলাবাগানে যেতে পারছি না। বাগানে কলা পেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জীবিকা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশের ভেতরে কারা স্থলমাইন পুঁতছে?

শৈফুচিং, অক্যমং ও চিক্যং এর মৃত্যুর কয়েকদিন পর, ৯ জুন ঘুমধুম ইউনিয়নেরই রেজু আমতলী এলাকার একটি কলাবাগানে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে। সেখানে কাজ করার সময় ৩০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শ্রমিক আবদুল খালেক নিহত হন।

স্থানীয়দের দাবি, বিস্ফোরণগুলো সীমান্তরেখা দূরে বাংলাদেশের ভেতরে ঘটেছে। ফলে মিয়ানমারের ভেতর থেকে আরাকান আর্মি এসে এসব মাইন পুঁতেছে—এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মি বাংলাদেশের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের বিপরীত পাশের পুরো অঞ্চলই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, তারা এলাকায় একটি সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখেছেন। তাদের অভিযোগ, ওই গোষ্ঠী স্থানীয়দের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে চায় না এবং সে কারণেই তারা মাইন পুঁতে থাকতে পারে।

স্থানীয়দের আরও দাবি, কাউকে ওই এলাকায় দেখা গেলে অনেক সময় তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

‘তারা যদি আমাদের ধরতে পারে, তাহলে ওই এলাকাতেই মেরে ফেলবে,’ বলেন তারা।

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে একই সম্প্রদায়ের দুই পাহাড়ি বাসিন্দা ওই এলাকায় গবাদিপশু চরাতে গিয়ে পৃথক ঘটনায় নিখোঁজ হন। তারা হলেন ভালুকিয়া পাড়ার ওয়াইমং তঞ্চঙ্গ্যা এবং পাশের রেজু গর্জনবুনিয়া এলাকার সুমন তঞ্চঙ্গ্যা।

এ সময় ভাগ্যক্রমে পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা কাঁঠাল বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় দেখা হয় ওয়াইমংয়ের স্ত্রী উসাচিংয়ের (৫৫) সঙ্গে।

তিনি জানান, সাত থেকে আট মাস আগে গরু চরাতে গিয়ে তার স্বামী নিখোঁজ হন এবং আর ফিরে আসেননি। পরে গ্রামবাসীরা এমন কিছু চিহ্ন খুঁজে পান, যা থেকে ধারণা করা হয় তাকে টেনে হিছড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সুমনও তখন থেকে নিখোঁজ রয়েছেন।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য বাবুল কান্তি চাকমা জানান, গত বছরের সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ওয়াইমং নিখোঁজ হন, আর সুমন হারিয়ে যান ৮ অক্টোবর। গত সাত থেকে আট মাস ধরে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, যার ফলে অনেকেই জুমের জমিতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।

নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে পরিবারগুলো নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার তদন্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, নিখোঁজ হওয়ার দুটি ঘটনাই এখনো তদন্তাধীন। তবে গভীর জঙ্গলে ঘেরা দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে তদন্তের অগ্রগতি ধীরগতির।

তিনি বলেন, তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় স্থলমাইন বিস্ফোরণের খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক স্থলমাইন বিস্ফোরণের বিষয়ে বিজিবি ব্যাটালিয়ন-৩৪-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, প্রাথমিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে যে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সময় উভয় পক্ষের সদস্যরা কখনো কখনো বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং তখন মাইন পুঁতে গেছে বা ফেলে গেছে।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

তিনি বলেন, বিজিবি ইতোমধ্যে লিফলেট বিতরণ ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে এবং সন্দেহজনক কোনো বস্তু বা তৎপরতা দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে স্থানীয়দের আহ্বান জানাচ্ছে। আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাইন শনাক্ত ও অপসারণ অভিযানের জন্য বিজিবিকে অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।

সীমান্ত এলাকার ভূপ্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল খায়রুল বলেন, যেসব পাহাড়ি এলাকায় জুমচাষ হয়, সেখানে অনেক সময় ‘জিরো লাইন’ চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক একটি বিস্ফোরণ মিয়ানমারের ভেতরে প্রায় ২০ গজ দূরে ঘটেছিল।

তিনি বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে যায় কেউ বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আছে, নাকি মিয়ানমারে।’

বিভ্রান্তি ও ঝুঁকি এড়াতে স্থানীয়দের জিরো লাইনের কাছাকাছি এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসন এবং সীমান্তবাসীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি কৃষক, পাহাড়ি শ্রমিক, রোহিঙ্গা শরণার্থী, কাঠ সংগ্রহকারী এমনকি বিজিবি সদস্যও। আগে সীমান্তের ওপারে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও, সম্প্রতি বাংলাদেশের ভেতরে এসব বিস্ফোরণের ঘটনা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

Related Articles

Latest Posts