ভাগ্য আবারও দুয়ার খুলে দিয়েছে সরফরাজ খানের সামনে। সাই সুদর্শন ইনজুরিতে ছিটকে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে তার স্থলাভিস্থিক্ত করা হয়েছে মুম্বাইয়ের এই ব্যাটারকে। ২০২৪ সালের পর এই প্রথম জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে ফেরার সুযোগ এলো তার সামনে। তবে ভারতীয় ক্রিকেটের সাম্প্রতিক ইতিহাস তাকে এক কড়া বার্তা দিচ্ছে—সুযোগ পাওয়া যতটা কঠিন, তা আঁকড়ে ধরা তার চেয়েও কঠিন।
ক্রিকেটবিশ্বে কিছু ব্যাটারের ভাগ্য এক অদ্ভুত চক্রে আটকে থাকে। ঘরোয়া ক্রিকেটে পাহাড়সম রান তোলায় তাদের উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, অথচ জাতীয় দলে শক্তভাবে নিজের জায়গা কখনই থিতু করতে পারেন না তারা। সরফরাজ সেই গোত্রেরই একজন। গত দুই বছর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটার পর অবশেষে বন্ধ দুয়ার খুলেছে। তবে এই প্রত্যাবর্তন স্রেফ একটি বিশেষ ইনিংসের ফসল নয়; বরং তার দীর্ঘ ও একাকী লড়াইয়ের ফল।
যে সেঞ্চুরি বদলে দিতে পারত সবই
২০২৪ সালের শেষের দিকে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে ভারত যখন লজ্জাজনক ধবলধোলাইয়ের মুখে, তখন বেঙ্গালুরুতে প্রথম টেস্টে ১৫০ রানের এক রোশনাই ছড়িয়েছিলেন সরফরাজ। মনে করা হয়েছিল, এই ইনিংস তার ক্যারিয়ারকে পাকাপোক্ত করবে। কিন্তু এরপর বাকি সিরিজে সর্বোচ্চ রান ছিল মাত্র ১১। ফলস্বরূপ বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে একাদশে ঠাঁই হয়নি, পরবর্তীতে ইংল্যান্ড সফরেও বাদ পড়েন তিনি।
অথচ ৬ টেস্টে ৩৭১ রান (১ সেঞ্চুরি, ৩ ফিফটি) এবং প্রথম শ্রেণিতে ৬৪.৭৩-এর অবিশ্বাস্য গড় থাকা সত্ত্বেও তার এভাবে বাদ পড়া ছিল বিস্ময়কর। তবুও থামেননি সরফরাজ। ২০২৫ রঞ্জিতে ৪২৯ রান করার পাশাপাশি ব্যাটের বাইরের সমালোচনা বন্ধ করতে কঠোর ডায়েটে মাত্র ছ’সপ্তাহে প্রায় ১৭ কেজি ওজন কমান তিনি। এরপর ২০২৬ আইপিএলে সিএসকের হয়ে ১৬৯.৪৭ স্ট্রাইক রেটে ১৬১ রান করে নিজেকে আলোচনায় রাখেন। ড্রেসিংরুমে ফেরার আগে তেলেগু সিনেমা ‘জার্সি’র একটি সংলাপ পোস্ট করে নিজের মনোভাব পরিষ্কার জানান—‘আমি হয়তো খাপ খাইয়ে নিতে পারছি না, কিন্তু লড়াইটা আমি ছাড়ব না।’
করুণ নায়ারের গল্প থেকে সতর্কতা
তবে সরফরাজের এই প্রত্যাবর্তনের রোমাঞ্চের আড়ালে লুকিয়ে আছে করুণ নায়ারের ট্র্যাজিক গল্প। ২০২২ সালে ‘প্রিয় ক্রিকেট, আমাকে আর একটা সুযোগ দাও’ লিখে আকুতি জানিয়েছিলেন ভারতের হয়ে ত্রিশতক হাঁকানো নায়ার। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৪-২৫ মৌসুমে রঞ্জিতে ৮৬৩ রান ও বিজয় হাজারে ট্রফিতে ৭৭৯ রান তুলে জাতীয় দলের দুয়ার আবার খুলেছিলেন তিনি।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রূপকথাটা বাস্তবতার জমিনে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ৮ ইনিংসে ২৫.৬২ গড়ে মাত্র ২০৫ রান করেন নায়ার। উইকেটে সেট হওয়া কিংবা কিছু নজরকাড়া ড্রাইভ—কোনোটাই তার ওপর সাঁটানো ট্যাগ বদলাতে পারেনি। ঘরোয়া ক্রিকেটের আধিপত্য জাতীয় দলের দরজা খুলে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নির্মম বাস্তবতা তাকে ধরে রাখেনি।
দ্বিতীয় সুযোগে বাজিমাত করতেই হবে
নায়ারের এই পরিণতিই এখন সরফরাজের পুনর্জন্মের সামনে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। ২৮ বছর বয়সী সরফরাজের হাতে হয়তো সময় কিছুটা বেশি আছে, তবে তিনি দলে এসেছেন ইনজুরিজনিত বদলি হিসেবে, প্রথম পছন্দ হিসেবে নয়। ফলে তার অবস্থান মোটেও সুরক্ষিত নয়।
শ্রীলঙ্কার মাটিতে কেবল ক্রিজে টিকে থাকা বা ভালো লাগার মতো কিছু শট খেলাই যথেষ্ট হবে না। নায়ারের মতো শুরু পেয়ে আউট হয়ে গেলে চলবে না; সরফরাজকে এমন বড় রান করতে হবে যেন নির্বাচকদের পক্ষে তাকে বাদ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। জাতীয় দলের বন্ধ দুয়ার হয়তো আবার খুলেছে, কিন্তু সেই দুয়ার যেন আর বন্ধ না হয়—সেই পথটা এখন সরফরাজকেই তৈরি করতে হবে।

