প্রমাণিত সিটির আর্থিক কেলেঙ্কারি, আনুষ্ঠানিকভাবে দোষী সিটি

প্রায় এক দশক ধরে চলা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মঙ্গলবার প্রিমিয়ার লিগের নিয়োগ করা স্বাধীন কমিশন জানিয়েছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত গুরুতর আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের সব অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে ইংলিশ ক্লাবটির বিরুদ্ধে। তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগেও চারটির মধ্যে তিনটিতে দোষী হয়েছে সিটি।

তবে এখানেই শেষ নয়, রায়ের পর এখন সামনে আরও বড় প্রশ্ন, এত গুরুতর অপরাধের জন্য কী শাস্তি পেতে পারে ম্যানচেস্টার সিটি?

স্বাধীন কমিশনের দীর্ঘ তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় এক দশক ধরে নিজেদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র আড়াল করতে নানা ধরনের কৃত্রিম বাণিজ্যিক চুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়েছিল সিটি। কয়েকটি বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে এমন চুক্তি করা হয়েছিল, যেখানে প্রকৃত সমঝোতার চিত্র সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে আবার চুক্তিগুলোকে কমিশন পুরোপুরিই কৃত্রিম বলে চিহ্নিত করেছে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কাগজে ক্লাবের আয় বাড়িয়ে দেখানো এবং ব্যয় কম দেখানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এর পেছনে ছিল ম্যানচেস্টার সিটির মালিক আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (এডিইউজি)।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু স্পন্সর চুক্তিতে উল্লেখ করা অর্থের পুরোটা নিজেরা পরিশোধ করেনি। অর্থের একটি অংশ এসেছে এডিইউজি থেকে। ফলে হিসাবের খাতায় স্পনসরশিপ থেকে যতটা আয় দেখানো হচ্ছিল, বাস্তবে তার পুরোটা স্পন্সরদের কাছ থেকে আসেনি।

শুধু আয় বাড়িয়ে দেখানোতেই বিষয়টি থেমে থাকেনি। এডিইউজির অর্থায়নে আরও কিছু কৃত্রিম চুক্তি করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে ক্লাবের প্রকৃত পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় হিসাবের খাতায় কম খরচ দেখানো সম্ভব হয়েছে। খেলোয়াড়দের ভাবমূর্তি-স্বত্ব নিয়েও ফোর্ডহ্যাম নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমন একটি কৃত্রিম চুক্তি করা হয়েছিল। সেই চুক্তির অর্থও শেষ পর্যন্ত এডিইউজি থেকে এসেছে বলে জানিয়েছে কমিশন।

কমিশনের হিসাবে, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত সিটি তাদের আয় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়েছে এবং ব্যয় কম দেখিয়েছে ৯০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি। এর ফলে আর্থিক বিধি মেনে চলা ক্লাব হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব সামনে এলে প্রিমিয়ার লিগের মুনাফা ও টেকসইতা-সংক্রান্ত বিধি এবং উয়েফার ক্লাব লাইসেন্স ও আর্থিক ন্যায্যতা বিধি, দুটিই বড় ব্যবধানে লঙ্ঘন হতো বলে সিদ্ধান্তে জানিয়েছে কমিশন।

এ কারণে ম্যানচেস্টার সিটি শুধু প্রিমিয়ার লিগের কাছেই নয়, নিজেদের নিরীক্ষক এবং ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছেও প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তথ্য গোপন করেছে বলে সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য, ক্লাবটির কর্মকাণ্ডে প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার ‘স্পষ্ট উদ্দেশ্য’ ছিল।  

তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগেও সিটির বিরুদ্ধে গেছে রায়। প্রিমিয়ার লিগের তদন্ত চলেছে চার বছর। এই সময়ে তদন্তে সহযোগিতা এবং সর্বোচ্চ সদিচ্ছা দেখানোর দায়িত্ব একাধিকবার লঙ্ঘন করেছে ক্লাবটি বলে জানিয়েছে কমিশন। এমনকি তদন্তকে বাধাগ্রস্ত ও বিলম্বিত করতে সমন্বিতভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে। সহযোগিতা না করার চার অভিযোগের মধ্যে তিনটিই তাই প্রমাণিত হয়েছে।

রায়ের পর প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড মাস্টার্স বলেছেন, ‘এই মূল সিদ্ধান্তে ওই সময়ে ম্যানচেস্টার সিটিতে কী ঘটেছিল, তার বাস্তব চিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রায় এক দশক ধরে ক্লাবটির ধারাবাহিকভাবে প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এই মামলা চালিয়ে যাওয়ার প্রিমিয়ার লিগের সিদ্ধান্তও এর মাধ্যমে যথার্থতা পেয়েছে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও কঠিন ছিল, কিন্তু তথ্য ও সত্য স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে লিগ তার অবস্থানে অটল ছিল।’

মাস্টার্সের মতে, ক্লাবগুলো নিয়ম মেনে চলছে কি না নিশ্চিত করা প্রিমিয়ার লিগের মৌলিক দায়িত্ব। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিযোগিতার সততা রক্ষা এবং সব ক্লাব ও সমর্থকের জন্য প্রতিযোগিতাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও ন্যায্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই দায়িত্বকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখি।’

তবে এত বড় রায়ের পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি এখনো আসেনি। ম্যানচেস্টার সিটিকে ঠিক কী শাস্তি দেওয়া হবে, সেটি এখনো নির্ধারণ করেনি প্রিমিয়ার লিগ। কমিশনের সিদ্ধান্ত হাতে পাওয়ার পর দ্রুত পরবর্তী প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে চায় লিগ কর্তৃপক্ষ। তাদের লক্ষ্য, ক্লাব, অন্য দল ও সমর্থকদের জন্য তৈরি হওয়া আইনি অনিশ্চয়তার যত দ্রুত সম্ভব অবসান ঘটানো।

প্রিমিয়ার লিগের ভাষায়, ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক মামলা এবং মঙ্গলবারের সিদ্ধান্ত তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। ফলে এখন সবার নজর শাস্তি নির্ধারণের দিকে। প্রায় এক দশকের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর সিটির সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেটিই এখন ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি।

তবে তার আগে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে ম্যানচেস্টার সিটির। আগামী ২ অক্টোবর পর্যন্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুরু করার সময় রয়েছে ক্লাবটির। অর্থাৎ, দীর্ঘ তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও এই লড়াইয়ের শেষ এখনো হয়নি। আইনি লড়াইয়ের শেষ বাঁশি বাজতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

Related Articles

Latest Posts