প্রায় ১২ বছর ধরে সক্রিয় মানবপাচার চক্রের মূল হোতাদের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরজু রহমান (৪৭) বিদেশে লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে অনুমোদনহীন এজেন্সির নাম ব্যবহার করতেন।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৪) গতকাল সোমবার তাকে গ্রেপ্তার করে।
আজ মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসআরবি জানায়, এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১-এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর বনানীর সি ব্লক থেকে আরজুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়া ভুক্তভোগীদের একজন কামরুন নাহার গত ১৬ জুলাই এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। ওই তদন্তের ধারাবাহিকতায় এই অভিযান চালানো হয়।
এসআরবি জানায়, গ্রেপ্তার আরজু চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায় করতেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাত।
এনএসআই ও এসআরবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কামরুন নাহার, ফাতেমা, আনজুমান আরা, পারভেজ, ফিরোজ ও মেহেদী হাসান সম্প্রতি এই চক্রের খপ্পরে পড়েছিল। তাদের সার্বিয়া ও বেলারুশের মাধ্যমে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
এসআরবি জানায়, ভুক্তভোগীদের প্রথমে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। নেপাল বা শ্রীলঙ্কা হয়ে তাদের মিশর কিংবা লিবিয়ায় নেওয়া হতো। সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো।
সংস্থাটি জানায়, তিন ভুক্তভোগী বিদেশে কঠিন পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতে পারলেও এখনো দুজন বিদেশে আটকা পড়ে আছেন।
কামরুন নাহারকে মিশরে পাঠানো হয়েছিল এবং আনজুমান আরা শ্রীলঙ্কায় আটকে ছিলেন। পরে দুজনই সহায়তার জন্য এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আরজুর গ্রেপ্তারের পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৩০-৩৫ জন ভুক্তভোগী এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তাদের অনেকেই বিদেশে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানানো হয়।
এসআরবি আরও জানায়, তারা আরও প্রায় ৩০০ সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
বিভিন্ন ঘটনা, মামলা, অভিযোগ ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের প্রাথমিক ধারণা—এই চক্রের হাতে পড়ে ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরজু স্বীকার করেছেন যে, তিনি প্রায় ১২ বছর ধরে অবৈধ মানবপাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিদেশ লোক পাঠানোর জন্য বিভিন্ন অনুমোদনহীন এজেন্সির নাম ব্যবহার করতেন। তদন্তকারীরা ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ এবং ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’-এর নাম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন।
চক্রটি মূলত দেশের বেকার যুবক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিত।
এসআরবি জানায়, আরজুর একটি ব্যাংক হিসাবে গত এক বছরে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ভুয়া ভিসা ও কাগজপত্র ব্যবহার করে নারীদের বিদেশে পাচার করা এবং প্রলোভন দেখিয়ে নেওয়ার পর তাদের নিপীড়নের শিকার হতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক নারীকে বন্দি করে রাখা হতো, শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো এবং সিগারেটের ছ্যাঁকাসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হতো।
লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মিশরে থেকে কামরুন নাহার ও আনজুমান আক্তার পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং পরে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানান।
বেশ কয়েকজন নারী এখনো মিশরে আটকা পড়েছেন বা বন্দি অবস্থায় আছেন জানিয়ে এসআরবি বলছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানবপাচার মামলায় সারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আরজু রহমানকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এসআরবি। তার সহযোগী ও পাচার চক্রের অন্যান্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

