ঈদুল আজহার পরদিন সকাল। চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর ও আতুরার ডিপো এলাকায় সড়কের পাশে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে শত শত কাঁচা গরুর চামড়া।
এসব চামড়ায় কোনো লবণ দেওয়া হয়নি, ফলে পচতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় রাস্তায়, ড্রেনের পাশে ফেলে রাখায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ভনভন করছে মাছি। এলাকাবাসী বলছেন, রাতভর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সেগুলো ফেলে চলে গেছেন।
আজ শুক্রবার সকাল থেকে আতুরার ডিপো ও মুরাদপুর এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গভীর রাত পর্যন্ত আড়তগুলোতে চামড়া বিক্রির চেষ্টা চলে। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে অনেকে চামড়া রাস্তায় ফেলে রেখে যান। কিছু চামড়া আবার আড়তের সামনে স্তূপ করে রাখা হয়।
আতুরার ডিপো এলাকায় কথা হয় হাটহাজারি থেকে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী এনামুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ২৩০টির মতো গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। প্রতিটির পেছনে গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু গতকাল রাত পর্যন্ত আড়তগুলো ৫০ থেকে ১০০ টাকার বেশি দাম দিতে রাজি হয়নি।
এনামুল বলেন, এ দাম দিয়ে গাড়িভাড়াও উঠবে না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে চামড়া ফেলে যেতে হয়েছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মুরাদপুরে চামড়া নিয়ে আসা কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী। তাদের অভিযোগ, আড়তদারদের একটি অংশ সমন্বিতভাবে কম দাম বলায় বাজারে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ছোট ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
মোহাম্মদ রহিম মিয়া নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ৬০০-এর বেশি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। বড় আকারের চামড়াও ছিল অনেক।
তিনি বলেন, প্রতিটি চামড়ার গড় ক্রয়মূল্য ছিল সাড়ে ৩০০ টাকার মতো। কিন্তু রাতে ১০০ টাকা করে ২৫৫টি চামড়া বিক্রি করেছি। আজ সকালে এসেও বাকিগুলো বিক্রি করতে পারিনি। কোনো ক্রেতাই আসছে না, দামও কেউ বলছে না। এখন ফেলে চলে যাব।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ফেলে রাখা চামড়াগুলো দ্রুত অপসারণ না করলে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সকালে বের হয়ে দেখি রাস্তার পাশে চামড়ার স্তূপ। দুর্গন্ধে দাঁড়ানো যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের এক কর্মী আসমা বেগম বলেন, আতুরার ডিপোর কয়েকটি আড়তের সামনে অন্তত ৩০-৩৫টি চামড়ার স্তূপ রাস্তায় পড়ে রয়েছে৷ এর মধ্যে ১২-১৫ টি স্তূপের চামড়া দেখে মনে হয়েছে ভালো চামড়ার সংখ্যা বেশি। কিন্তু কেন তা ফেলে রেখেছে তা বুঝতে পারছি না।
তিনি বলেন, যেসব চামড়ার স্তূপ দেখে মনে হচ্ছে ফেলে চেলে গেছে, সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, চট্টগ্রামে একসময় দুই ডজন ট্যানারি থাকলেও এখন মাত্র একটি সচল আছে। তারাও এক লাখ থেকে দুই লাখ চামড়া কেনে। ফলে আমাদের ঢাকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়। ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বাকিতে চামড়া কেনায় আমাদের হাতে নগদ টাকা থাকে না।
তিনি আরও বলেন, অনেক আড়তদার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দামেও চামড়া কিনেছে। তবে যেসব চামড়া কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, সেগুলো কেউ কিনছে না। ফলে নিম্নমানের চামড়া ফেলে গেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
চলতি বছর সরকার ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে মাঠপর্যায়ে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। তাদের দাবি, ট্যানারি ও আড়ত পর্যায়ে কম দামের কারণে পুরো বাজার-ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে।

