ট্রাফিক জরিমানার ভুয়া মেসেজ: যেভাবে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন গাড়ি মালিকরা

হঠাৎ দেখলেন আপনার মোবাইল ফোনে মেসেজ এসেছে, বলা হচ্ছে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো অবস্থায় আপনাকে শনাক্ত করেছে এআই-ট্রাফিক ক্যামেরা।

মেসেজে ঘটনার তারিখ, জরিমানার অঙ্ক ও পরিশোধের সময়সীমা উল্লেখ আছে। পাশাপাশি কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানার টাকা পরিশোধ না করলে আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাভাবিকভাবেই এতে আপনি কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন। পরবর্তী ঝামেলা এড়াতে জরিমানা পরিশোধের জন্য ভাবছেন কী করবেন। দেখলেন ওই মেসেজেই আছে জরিমানা পরিশোধের ওয়েবসাইটের লিংক।

আপনি যদি ওই লিংকে গিয়ে জরিমানা পরিশোধ করে এবারের মতো বেঁচে যাওয়ার কথা চিন্তা করেন, তাহলে এখনই থেমে যান। এটি আসলে প্রতারণার একটি ফাঁদ।

সম্প্রতি ঢাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে এআই-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পর একটি সুসংগঠিত অনলাইন অপরাধী চক্র সারাদেশে প্রতারণার জাল বিস্তার শুরু করেছে।

তাদের পাঠানো মেসেজে থাকা লিংকটি গাড়ির মালিকদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পোর্টালের মতো দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যাচ্ছে। আর এসব ভুয়া ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য দিলে প্রতারকরা ভুক্তভোগীদের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।

সম্প্রতি এমন মেসেজ এসেছিল বেসরকারি চাকরিজীবী আতাউর রহমানের ফোনেও। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে আমি খুব একটা গাড়ি ব্যবহার করি না। তাই হঠাৎ করে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার একটি মেসেজ পেয়ে খুব অবাক হই। সৌভাগ্যবশত, এর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাফিক ও গাড়িপ্রেমীদের বিভিন্ন গ্রুপে এ ধরনের প্রতারণামূলক বার্তা সম্পর্কে সতর্কতা দেখেছিলাম।’

‘একই ধরনের কৌশল বুঝতে পেরে আমি লিংকে ক্লিক করিনি কিংবা বার্তা প্রেরকের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগও করিনি,’ বলেন তিনি।

রাজধানীর বাসিন্দা আমজাদ হোসেন তুহিনও এমন একটি মেসেজ পেয়েছিলেন। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ফিলিপাইনের ডায়ালিং কোডযুক্ত একটি নম্বর থেকে অতিরিক্ত গতির অভিযোগে একটি মেসেজ পাই। পরে শুনলাম, আমার অনেক বন্ধুও একই ধরনের প্রতারণামূলক মেসেজ পেয়েছে। ভুয়া মামলার এসএমএসে থাকা লিংকে ক্লিক করার আগে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

এ বিষয়ে বিআরটিএ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) উভয়ই জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ব্যক্তিগত বা সাধারণ মোবাইল নম্বর থেকে কখনোই জরিমানা পরিশোধের লিংকসহ এসএমএস পাঠানো হয় না।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ট্রাফিক জরিমানার নোটিশ আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকযোগে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কর্মকর্তার সই দেওয়া এই নোটিশ সরাসরি গাড়ির মালিকের নিবন্ধিত ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

খুব বিশেষ ক্ষেত্রে ডিএমপি যদি কোনো এসএমএস পাঠায়, তবে তা শুধুমাত্র দুটি নির্ধারিত নম্বর—০১৩২০-০৪২২০৭ এবং ০১৩২০-০৪২২২৭ থেকেই পাঠানো হয়।

কোনো সরকারি সংস্থা কখনোই ব্যাংকের পাসওয়ার্ড, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) পিন নম্বর বা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) চায় না।

সন্দেহজনক বার্তা পেলে তাতে থাকা লিংকে ক্লিক না করতে এবং যাচাই ছাড়া কোনো অর্থ পরিশোধ না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনগণকে পরামর্শ দিয়েছে।

এর পরিবর্তে, সংশ্লিষ্ট সরকারি হটলাইন অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করে নোটিশটির সত্যতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, নতুন প্রযুক্তি ও সরকারি সেবার বিষয়ে মানুষের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রতারণার কৌশল ব্যবহার করছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে উদ্যোগী প্রতিষ্ঠান দ্য টিম ফিনিক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম শামীম রেজা বলেন, ‘ভয় ও জরুরি প্রয়োজনকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে ক্রমেই মানুষকে চিন্তা করার আগেই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে প্রতারকরা। এসএমএস, ই-মেইল বা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো ট্রাফিক জরিমানার নোটিশ সরকারি আনুষ্ঠানিক মাধ্যম থেকে না এলে তা সন্দেহের চোখে দেখা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বার্তায় থাকা লিংকে কখনোই ক্লিক করা উচিত নয়। একইসঙ্গে সেই লিংকের মাধ্যমে খোলা ওয়েবসাইটে ব্যাংকিং তথ্য, কার্ড নম্বর, ওটিপি বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।’

বার্তায় পাঠানো লিংক ব্যবহার না করে সরাসরি বিআরটিএর আনুষ্ঠানিক মাধ্যম থেকে জরিমানার তথ্য যাচাই করুন।

ওয়েবসাইটের ঠিকানা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করুন। প্রতারকরা প্রায়ই সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া ডোমেইন ব্যবহার করে।

জরিমানার নোটিশের জবাবে কখনোই ওটিপি, কার্ডের তথ্য, পিন নম্বর বা এমএফএসের গোপন তথ্য শেয়ার করবেন না।

যেসব বার্তায় তাড়াহুড়ো সৃষ্টি করা হয়, শাস্তির ভয় দেখানো হয় বা দ্রুত টাকা পরিশোধের চাপ দেওয়া হয়, সেগুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।

স্ক্যাম হতে পারে—সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান।

ইতোমধ্যে কোনো তথ্য দিয়ে ফেললে দ্রুত আপনার ব্যাংক বা এমএফএস সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

Related Articles

Latest Posts